এ বছরও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের আশা ছেড়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এজন্য চলতি অর্থ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য কোন অর্থও বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে নির্বাচন না হওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ এনেছে ইসি। কমিশন বলছে, তিনদফা তাগাদা দেয়ার পরও দুই ডিসিসির সীমানা নির্ধারণ করছে না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
নির্বাচনের ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, দুই ডিসিসির নির্বাচনের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও বিদ্যমান সীমানা জটিলতার কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না। জটিলতা নিরসনে কমিশনের পক্ষ থেকে তিনদফা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে (এলজিআরডি) তাগিদ দিলেও ইতিবাচক সাড়া মিলেনি।
ইসি সূত্র জানায়, ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কমিশন আগ্রহী হলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ তাতে সাড়া দিচ্ছে না। যখনই নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয় তখনই সীমানা জটিলতা তৈরি হয়। ফলে এ বছরও ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশা দেখছে না কমিশন। নির্বাচন করতে না পারার জন্য কমিশন সভায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা। স্থানীয় সরকারের অসহযোগিতার কারণে এখনো পর্যন্ত কমিশন দুই ডিসিসির পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকাও করতে পারেনি। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শেষ হলে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। তবে ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী আগামী ৩১ জানুয়ারির আগে এই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করতে পারবে না ইসি।
সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন কবে হবে তা বলা যাচ্ছে না। এটা অনেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আশা করছি সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত কেটে যাবে।
নির্বাচন আয়োজনে অন্তরায় প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ আরো বলেন, ডিসিসি’র দক্ষিণের সীমানা নিয়ে কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ এই তিনটি ওয়ার্ডকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার পরও সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। দক্ষিণে সীমানা জটিলতার কারণে নির্বাচন হচ্ছে না, কিন্তু উত্তরে নির্বাচন কেন হচ্ছে না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উত্তরেও সীমানা জটিলতা রয়েছে। ওখানে কিছু সীমানা বর্ধিত হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বারবার চিঠি দেয়া হলেও তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি।’
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ৫৬টি ওয়ার্ড নিয়ে দক্ষিণ ও ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে উত্তর নামে দুই ভাগ হয় ডিসিসি। এরপর এ পর্যন্ত পঞ্চম দফা অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে চলছে ডিসিসি। যদিও স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছে বিভিন্ন মহল।
২০০২ সালের এপ্রিলে ভোটের পর ২০০৭ সালের মে মাসে অবিভক্ত ডিসিসির নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময় দুইবার নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়া হলেও আইনি জটিলতায় সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের ইসি তফসিল ঘোষণা করলেও আইনি জটিলতায় তা স্থগিত হয়ে যায়। গত বছরের ১৩ মে ডিসিসি’র দুই ভাগে নির্বাচন নিয়ে করা রিট আবেদন খারিজ করে ভোট আয়োজনের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ তুলে নেয়। নতুন করে তফসিল ঘোষণার উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। তবে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে একটি নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় সীমানা জটিলতায় নির্বাচন আবারো ঝুলে যায়।
ইসির বাজেটেও নেই ডিসিসি: মেয়াদ শেষ হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য বাজেট বরাদ্দও রাখা হয়নি। অন্যদিকে মেয়াদ শেষ না হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ সংসদ ও স্থানীয় সরকারের কিছু নির্বাচনের জন্য প্রায় ৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইসির বাজেট শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিসিসি’র বিষয়ে কোনো বাজেট প্রস্তাব নেই। দুই ভাগে ভোট করতে অন্তত ৪০ কোটি টাকার দরকার পড়বে। তবে কমিশন বলছে, যখন ভোট হবে তখন অর্থ পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।
বিভক্তির সুফল পায়নি নগরবাসী: নগরবাসীকে উন্নত সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আড়াই বছর আগে ডিসিসিকে দুই ভাগ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সেবার দেখা মেলেনি। বরং আগের সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। দীর্ঘদিনেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেয়ায় নাগরিক সেবা পেতে তাদের পড়তে হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে। ওয়ার্ডভিত্তিক সেবাকে আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রদান করায় এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
রাজধানীর কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা আজগর আলী কাঞ্চন জানান, গত জানুয়ারি মাসে তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করতে জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য গিয়েছিলেন আজিমপুরের হাজী আবদুল গনি কমিউনিটি সেন্টারে অবস্থিত সিটি করপোরেশন দক্ষিণ অঞ্চল-৩ এর অফিসে। সেখানে ব্যাপক হয়রানি পোহাতে হয় তাকে। কারণ মাত্র এই একটি অফিসের মাধ্যমে ১১টি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় সিটি করপোরেশনের ফুটপাথসহ অন্যান্য সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেলেও তা দেখার কেউ নেই বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
