জ্বলছে গাজা পদদলিত মানবতা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৪, ২০:৩৫
রমজানের তৃতীয় শুক্রবার প্রত্যুষ। পাঁচ মাস বয়সী ফারিস জুমা আল-মাহমুদ মায়ের কোলে র্স্বগ-সুখে ঘুমাচ্ছে। মা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সকালের প্রার্থনার। আচমকা মর্টারশেলের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় ফারিসের আদুরে তুলতুলে দেহ। নিহত হয় ১৮ বছরের আরো এক কিশোর। ফারিসের মাসহ মারাত্মক আহত হয়েছেন অনেকে। এর আগে সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ছিল কয়েকজন শিশু। ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজের মর্টারশেল সৈকতের সাদা বালি রঞ্জিত করে এ নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে। এভাবেই নিত্যদিন নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে গাজাবাসীদের। যা শুরু হয়েছে ৮ জুলাই থেকে। অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে গাজা নগরীকে। মিশর ও ইসরাইলের সীমান্ত বন্ধ। আর ভূমধ্যসাগর? সেটা তো শান্তি প্রতিষ্ঠার সময়েই ফিলিস্তিনিদের জন্য ছিল মৃত্যুফাঁদ! হামলা হচ্ছে তিন দিক থেকে—স্থল, জল ও আকাশপথে। তাই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার গাজাবাসী। নিহতদের আশি শতাংশই বেসামরিক লোকজন এবং এক-চর্তুথাংশ কোমলমতি শিশু। যাদের কেউই জানে না, কেন জীবন দিতে হচ্ছে তাদের? কেন বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন করে রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে মারা হচ্ছে মানুষ? গাজাকে পরিণত করা হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। এবারই প্রথম নয় বরং বলা যায় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ নতুন সংস্করণ ৮ জুলাইর হামলা। আর এ সংস্করণ খুব কার্যকরও বটে। কেননা বোধ করি এবারই প্রথম মুসলিম দেশসহ অন্য কোনো দেশের জোরালো কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলের আগ্রাসন। কিন্তু কেন এই হামলা? কেন এত রক্ত? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমেন সাম্রাজ্যের পতনের পর ফিলিস্তিনসহ আরবের বিশাল অংশ ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ম্যান্ডেটে চলে আসে। ১৯১৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী আর্থার জেমস ব্যালফ্যুর ইহুদিদের লেখা এক চিঠিতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ’ব্যালফ্যুর ঘোষণা’র পর ইহুদিরা ইউরোপ থেকে পাড়ি জমায় ফিলিস্তিনে। দিনে দিনে বাড়তে থাকে সংখ্যা। ১৯১৮ সালে ব্রিটেনের সহযোগিতায় ইহুদিদের গুপ্ত বাহিনী ‘হাগানাহ’ গঠন করা হয়। ‘হাগানাহ’র কাজ ছিল ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও খেতখামারে হামলা করে তাদের বিতাড়িত করা। তখন হাগানাহ কাজটি ভালোভাবেই করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করতে ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। ফিলিস্তিনকে ৪৫ শতাংশ ও ইসরাইলকে ৫৫ শতাংশ ভূখণ্ড দিয়ে জাতিসংঘ প্রস্তাবটি পাস করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন হয় ইসরাইল। আর নিজ ভূখণ্ডে পরাধীনই রয়ে গেলো ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু স্বাধীনতার পরও ইসরাইল অবৈধভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখে। প্রতিনিয়ত লংঘন করে চলছে মানবাধিকার। আর যখনি ফিলিস্তিনের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে হামাস সোচ্চার হয়ে ওঠে নিজের ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে; নিশ্চিত করতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা—তখনই পশ্চিমা বিশ্ব হামাসকে আখ্যা দেয় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে! ইসরাইলের চলমান আগ্রাসনকে যাঁরা সমর্থন করেন তাঁরা বলছেন—‘নিজেকে রক্ষার অধিকার ইসরাইলের আছে’। এ ধরনের মন্তব্য মানবাধিকারের জন্যও হুমকিস্বরূপ। যদি তাই হয়, তবে কি এক শতাব্দী ধরে আগ্রাসনের শিকার ফিলিস্তিনের উচিত না নিজেকে রক্ষা করা? যাই হোক, এ জাতীয় মন্তব্য পরিহার করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে মানবাধিকার নিশ্চিত করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায় বিশ্ব শান্তি হুমকির মুখে পড়বে। ঢাকা