১৯৮৮ সালের কথা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে একটি সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়ি ফিরছি। প্রায় দেড় কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথ। এর মধ্যে আর কোনো স্কুল নেই। মাঝ রাস্তায় এলাকার এক বড়ভাই থামিয়ে জানালেন তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে একটি হাইস্কুল গড়ে তুলছেন, কারণ পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো হাইস্কুল নেই। তিনি চান আমি যেন তাঁদের স্কুলে ভর্তি হই। দরকার অনেক ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং স্কুল-ঘর। শুরু হলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী সংগ্রহ। আশেপাশের অনেক বেকার যুবক শিক্ষকতায় আগ্রহী। সুযোগ বুঝে তাঁদের কাছে স্কুল-ঘর নির্মাণের অনুদান চাওয়া হলো। যাঁরা অনুদান দিলেন তাঁরা চাকরি পেলেন। শুরু হলো এক স্কুলের অগ্রযাত্রা। এখন এই স্কুলটি এলাকার মধ্যে প্রসিদ্ধ স্কুল। শতভাগ পাসের রেকর্ডেও এই স্কুল আছে। এখন সেই এলাকার বড়ভাই যিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তাঁর সেই হাইস্কুল গড়ার পদ্ধতিতেই একটি কলেজও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথে।
দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাইস্কুল আর কলেজের ইতিহাস প্রায় একই রকম। শুরুতে অনুদাননির্ভর প্রচেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি এমপিও। অনুদানের মাধ্যমে যে স্কুল বা কলেজের শুরু সেটা পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীলতা পেলেও অনুদান আর থামে না। বরং প্রতিষ্ঠার ধরন বুঝে অনুদানও ভিন্ন হয়। খুব ভালো প্রতিষ্ঠা পাওয়া প্রতিষ্ঠানের অনুদানও বিপুল পরিমাণ হয়ে থাকে।
প্রাথমিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো যায়, যদিও সেখানে জবরদস্তি থাকে, সেটা সময়ের প্রয়োজনে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান যখন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও অনুদানের বিনিময়ে চাকরি দেয়, সেটা অবশ্যই ঘুষ এবং অপরাধ। অথচ এটাই এখন চরম সত্য। ওপেন সিক্রেট। কোনো বেসরকারি স্কুল বা কলেজে শূন্য বা সৃষ্ট পদে চাকরি পেতে হলে অনুদানের নামে ঘুষ দিতে হয়। অনুদানের পরিমাণও অনেকটা নির্ধারিত হয়ে গেছে। হাইস্কুলের জন্য তিন থেকে পাঁচ লাখ আর কলেজের জন্য পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা। আর অনুদান দিয়ে চুক্তি হলে লোক দেখানো নিয়ম রক্ষার এক পাতানো নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই অনুদান বা ঘুষ দিয়ে যোগদান করা শিক্ষককেই শেখাতে হয় নীতিকথা। শেখাতে হয় ‘সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা’।
প্রশ্ন হলো— এই অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় প্রবেশ কতটা সততা আর মানসম্মতার পরিচয় বহন করে! যার কর্মজীবন শুরু হলো অসততা আর ঘুষ দিয়ে, তিনি কতটা সত্ থাকতে পারবেন! সিলেবাস অনুযায়ী পড়িয়ে একজন শিক্ষার্থীকে হয়তো ভালো নম্বরসহ পাস করানো অনেক শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু সৃজনশীল শিক্ষা কি মেধাবী এবং সৃজনশীল শিক্ষক ছাড়া সম্ভব! এই অনুদান নিয়ে যে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় সেখানে কতজন প্রকৃত সৃজনশীল এবং মেধাবী শিক্ষক জাতি পাবে! আর এই অনুদান নির্ভর শিক্ষক নিয়োগ যদি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় তাহলে শিক্ষকতা একটি মহান পেশা— এই সত্য প্রবাদটি মিথ্যে হয়ে যাবে আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ মেধাবী, সৃজনশীল এবং সত্ শিক্ষক শূন্য হবে।
নাটোর
