ইটভাটা :বিকল্প খোঁজার সময় এখনই

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৪, ২০:৩৬
গত দশকের গোড়া থেকেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনজীবনের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। হাড় জিরজিরে বলদ ছেড়ে মানুষ কলের লাঙ্গল ধরছে। চাষ করছে নিত্য নতুন উন্নত জাতের লাভজনক ফসল। ফসলের জন্য প্রকৃতি নির্ভরতাও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বৃষ্টির জন্য আর ব্যাঙ বিয়ে দিতে হয় না। রোদ না থাকলে মেশিনেই ভেজা ধান থেকে চাল করা যায়। অর্থের জোগানের জন্য আর মহাজনের কাছে হাটু গেড়ে বসে হাত কচলাতে হয় না। হাজারও এনজিওর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্যাংক কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের অজ্ঞতাতে ফসল নষ্ট হয় না বললেই চলে। টেলিভিশন-বেতারের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের বোতাম চেপেই পাওয়া যায় ফসল রক্ষার অনেক বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ। আর এসব সুফল দৃষ্টিগোচর হবে গ্রামে ঢুকলেই। গ্রামের সেই কাঁচা রাস্তা ইট বিছিয়ে বা ইট-পাথর-পিচ মিশিয়ে পাকা হতে শুরু করেছে। গ্রামের বাঁশ কাঠ আর খড়ের কাঁচা বাড়ি বিলুপ্তির পথে, সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ইটের পাকা বাড়ি। অনেক শহরতলির গ্রামে এখন কল-কারখানা গড়ে উঠছে। আর এইসব উন্নয়নের জন্য দরকার হচ্ছে মাটি পুড়িয়ে বানানো ইটের। এই সুযোগে শহর থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে গড়ে উঠছে অসংখ্য ইটভাটা। এর মধ্যে অনেক ভাটা আছে যেগুলো সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত এবং অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। আবার কিছু আছে পরিকল্পিত এবং বৈধভাবে গড়ে ওঠা। রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলে যাবার পথে গাবতলি পার হলেই চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ জুড়ে সবুজ ফসলের পরিবর্তে চিমনির ধোঁয়া, ধুলো আর কাঁচা-পাকা ইটের সারি। এভাবে সামনে এগুতে থাকলে চোখে পড়বে অসংখ্য ইটভাটা। এটা তো শুধু বড় রাস্তার পাশে যেটা সহজে চোখে পড়ছে। এছাড়াও আছে আরো বিপুল পরিমাণ ইটভাটা মফঃস্বলের ছোট রাস্তার পাশে। আগের মতো বর্ষা নেই বললেই চলে, তাই ইটভাটার ব্যবসার ঝুঁকি কমে গেছে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু তার সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রস্তাব করলো। ইটভাটার ব্যবসা শুনে জোরাজুরি এড়ানোর জন্য বললাম, বন্ধু আমার কাছে এখন এত টাকা নেই। বন্ধু আমাকে লোভ দেখাতে শুরু করলো, এক বছরেই টাকা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমি এই লাভের চমকে লোভী না হলেও এমন লাভজনক ব্যবসার লোভ সামলানো বেশ কঠিন সেটা যত দোষেই দোষী হোক না কেন। ইটভাটা যেভাবেই গড়ে উঠুক না কেন পরিবেশের ক্ষতি করবেই। সেটা কম অথবা বেশি। ২০০৩ সাল থেকে এক আইনের মাধ্যমে ইটভাটার চিমনি ১২০ ফুট উঁচু করার সিদ্ধান্ত করা হয়েছে। এতে ক্ষতি কিছুটা কম হলেও সবাই যে এই আইন মানছেন এমনটা নয়। আবার মানলেও ধোঁয়া আর তাপ ওজোন স্তরের ক্ষতি ঠিকই করছে। প্রতিটি ইটভাটার এলাকাতেই বাতাসে ব্যাপক ধুলো পরিলক্ষিত হয়। এই ধুলো-বালি যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি ক্ষতিকর ফসল ও গাছপালার জন্য। গাছ এবং ফসলের সবুজ পাতায় ধুলোর আবরণ পড়ে উদ্ভিদের সাধারণ খাদ্য প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায় এবং ফসলের ধ্বংস ডেকে আনে। ইটভাটার জন্য ব্যাপক হারে ফসলি জমি কমছে, এছাড়া ভাটার কারণে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। যে জমিতে একবার ইট পোড়ানো হয় সেখানে দীর্ঘদিন ফসল হয় না। ভাটার জন্য যে মাটি ব্যবহার করা হয় তার বেশিরভাগ মাটিই এখন আসছে কৃষকের ফসলের মাঠ থেকে। টাকার লোভে পড়ে কৃষক তার উর্বর মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এই মাটি আসছে গ্রামের মাঠ থেকে। গ্রামের সেই সরু পাকা, আধা-পাকা বা কাঁচা রাস্তা মাটি ভরা ভারি ট্রাক/ট্রাক্টর চলায় রাস্তা ভেঙে চলার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ইটভাটার শত দুর্নাম করলেও ইটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নাগরিক সভ্যতার পদে পদে ইটের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তাই ইটের বিকল্প খোঁজার সময় এখনই। ইটের পরিবর্তে হলো-ব্লক, পাথর, আধুনিক বিভিন্ন পার্টিসান বোর্ড প্রভৃতি ব্যবহার করে ইটের ওপর চাপ কমাতে হবে। আবাসন বিজ্ঞানীদেরও ইটের বিকল্প খুঁজতে হবে। সেইসঙ্গে ইটভাটাকে পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা করতে হবে। ফিলিপাইন