রাজশাহী অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আমনের জমি শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। ফলে আমন নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক কৃষক রোপা আমন রোপণ করতে পারেনি। রোপণের সময় পার হওয়ায় অনেক কৃষক স্যালো মেশিনের সাহায্যে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করেছে। তবে সেচের জন্য রোপা আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের বাড়তি খরচ গুণতে হয়েছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, রাজশাহীতে জুলাই মাসে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৪০ দশমিক ৫ মিলিমিটার। জুন মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৮৯ দশমিক ১ মিলিমিটার। কৃষি বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, রোপা আমনের চারা রোপণের জন্য জুন-জুলাই মাসে সাধারণত ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। কিন্তু উক্ত সময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে তিনভাগের এক ভাগেরমত। এ দুই মাসে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪২৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার। পাশাপাশি রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর জুনে ২৫৪ দশমিক ৫ এবং জুলাইয়ে আরো কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টিপাত নির্ভর রোপা আমন আবাদে হতাশার মধ্যে পড়েছে রাজশাহী বিভাগের কৃষক।
রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠ পবা উপজেলার মদনহাটি গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, তিনি প্রতি বছর ৪ বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ করেন। এবারো একই জমিতে রোপার চারা রোপণে তাকে অনেক কষ্ট ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। ৪ বিঘা জমিতেই তিনি সেচ দিয়েই রোপার চারা রোপণ করেছেন। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আইহাই গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন জানালেন, তিনি ২৩ বিঘা জমিতে রোপা আমনের আবাদ করার জন্য বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। সেচ দিয়ে অনেক কষ্টে ১৭ বিঘা জমিতে রোপার চারা লাগিয়েছেন। তার আরো ৬ বিঘা জমি এখনো ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ৬৮ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উক্ত জমিতে রোপা আমন আবাদের জন্য এপ্রিল-মে মাসের মধ্যেই বীজতলা তৈরি এবং জুন-জুলাই মাসে চারা রোপণ করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চারা এখনো বীজতলায় রয়েছে। জমিতে রোপার চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহের (জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে) মধ্যে যেখানে ৯০ ভাগ জমিতে আমন লাগানোর কথা, সেখানে শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এখন পর্যন্ত টার্গেটের মাত্র ৭০ ভাগ পূরণ হয়েছে। তারা আরো জানান, সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সের রোপা আমন চারা সেচ দিয়ে রোপণ করতে হয়। এর বেশি বয়সের চারা রোপণ করলে এবং সেচ দিতে না পারলে ফলন কমে যাবে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় গত শনিবার পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে রোপার চারা রোপণ সম্ভব হয়েছে। এখনো সময় আছে, কৃষকরা সেচ দিয়ে টার্গেট পূরণ করবে আশা করি।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বর্ষার ভরা মৌসুমেও আশানুরুপ বৃষ্টি নেই। ফলে বৃষ্টির পানির অভাবে বগুড়া জেলার আমন চাষীদের সেচপাম্পের পানিই এখন একমাত্র ভরসা। আমন চাষের আশায় জমি তৈরি করে বৃষ্টির পানিতে চারা রোপণের আশায় থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে পানি নেই। ফলে এখন অগভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি তুলে সেচ দিয়ে আমন চারা রোপণ করতে বাধ্য হচ্ছেন জেলার কৃষকরা। এতে করে শুরুতেই আমন চাষের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কৃষকদের। এদিকে জেলা কৃষি বিভাগ কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় আমন চারা রোপণ ব্যাহত এবং উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাবার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আশা প্রকাশ করছে যে শ্রাবণের শেষ নাগাদ বৃষ্টি হলে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।
জেলার সদর, শাজাহানপুর, নন্দীগ্রাম, কাহালু, শেরপুর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে জমিতে হাল চাষ দেয়ার মতো পানি না থাকায় কৃষকরা সেচ পাম্প থেকে পানি নিয়ে জমি তৈরি করছেন।
কাহালু উপজেলার মালঞ্চা জামগ্রাম এলাকার কৃষক আজিজার রহমান জানান, আষাঢ় মাস থেকে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেছে সবাই। কিন্তু এপর্যন্ত জমিতে হাল চাষ দেয়ার মতো পানি জমেনি। ফলে বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন (অগভীর নলকূপ) থেকে পানি সেচ দিয়ে জমি চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে সকলেই। জমিতে একবার পানি দেয়ার জন্য বিঘা প্রতি পাম্প মালিককে দিতে হচ্ছে দেড়শ‘ টাকা করে। যা বাড়তি খরচ। বেড়ে যাচ্ছে চাষের ব্যয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৩৯ হেক্টর জমিতে আমন রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উপজেলা ভিত্তিক প্রস্তুতির পরিসংখ্যানে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষ ব্যাহত হওয়ার আশংকা করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
