সে সময় দেশের বড় শহর থেকে মফস্বল শহরের জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষজন ঘোড়ার গাড়িকে প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ঘোড়া গাড়ি নিয়ে নানা রসালো গল্পকথাও চালু ছিল বলে জানান চার পুরুষ ধরে ঘোড়ার সাথে জীবনযাপন করা নাজির হোসেন। নাজির দাদির কাছে শোনেন জমিদাররা বুড়িগঙ্গা দিয়ে এসে মিরপুর যাওয়ার জন্য গাড়ির ভাড়া মনপুত না হওয়ায় গাড়োয়ান রসাল প্রতিউত্তর ‘আপনের ভাড়া হুন্নয়াতো ঘোড়ায় বি হাসবার লাগছে’। যা পরে ঢাকার কৌতুক হিসেবে স্থান করে নেয়।
এতিহ্যবাহী ঢাকার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে যে কতক অনুসঙ্গ তার মধ্যে অন্যতম একটি ঘোড়ার গাড়ি। যা শত বছর পার করে দিয়ে যাত্রীদের আজও রাজা-বাদশাদের ভ্রমণের আবহ উপভোগ করার সুযোগ দেয়। তাইতো আজও শত যান্ত্রিক আর দ্রুতগামী যানের সাথে বেঁচে আছে রাজা-জমিদারের সেই বাহন। মানুষ আজও নতুন প্রজন্মকে ঢাকার ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে ছুটে আসেন ঘোড়ার গাড়ির কাছে। প্রতিদিন পুরান ঢাকার রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি এই গাড়িগুলো ঈদ, পয়লা বৈশাখ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, বিয়েসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে আজও কদর পায়। এই কদরের জোরেই বেঁচে আছে কয়েক পুরুষ ধরে চালিয়ে যাওয়া টমটমের মহাজনরা। তাদের সাথে যোগ হচ্ছেন নতুনরাও।
নাগালের মধ্যে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
জিনজিরা থেকে ছেলেমেয়েকে ঈদ উপলক্ষে শিশুপার্ক দেখাতে এসে আজমল হোসেন সদরঘাটে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠেন। আজমল জানান, এর জন্য তাকে জনপ্রতি ১৫ টাকা বেশি ভাড়া গুণতে হবে। বর্তমানে সদরঘাট ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে থেকে গুলিস্থান পর্যন্ত জনপতি ২০ টাকায় প্রায় ২৫টি গাড়ি চলে বলে জানান নয় বছর ধরে টমটম চালানো গাড়োয়ান জমসেদ। জমসেদ বলেন, ঈদে মানুষ কম বলে তারা জনপতি ৩০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছেন। ঢাকা লোকসমাগম হয়ে গেলেই আবার ২০ টাকা করে ভাড়া নেয়া হবে। যেখানে বাসে পাঁচ টাকায় যাওয়া যায় সেখানে বেশি টাকা দিয়েও সন্তানদের রাজা-বাদশাদের গাড়িতে চড়াতে পেরে আনন্দ পান বাবা। ছেলের খাত্নায় এই গাড়িতে করে এলাকা ঘুরিয়েছেন মালিটোলার আকবর আলী।
৩০ বছর যাবত্ ঘোড়া গাড়ি ব্যবসার সাথে জড়িত বঙ্গবাজারের মহাজন মোঃ রহিম বলেন, আজও এই সকল টমটমের (টমটম নামেই পরিচিত) চাহিদা বেশি থাকে বিয়ে বাড়িতে। রাজকীয় বিয়ের আবহ চায় পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ডাক পান তারা। জায়গা ও সময়ভেদে ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০/ ৪০ হাজার টাকাও তারা ভাড়া পান। তাছাড়া ঈদ শোভাযাত্রা, পয়লা বৈশাখ মেলা, বিজয় দিবস কিংবা স্বাধীনতা দিবসে সংসদ ভবন চত্বর, বিশেষ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সংবর্ধনা দেয়া, সিনেমার শুটিংয়ে এই ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার হয় বলে জানান ভাওয়াল রাজার টমটম পাওয়া মোঃ নাজির হোসেন। নাজির তত্কালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের মেয়ে জামাইয়ের কাজ থেকে চেয়ে এই গাড়ি নেন। নাজির জানান, বর্তমানে বঙ্গবাজার, ফায়ার সার্ভিস, পশু হাসপাতাল, বকশীবাজার, নারিন্দা, সিদ্দিক বাজার, কেরানীগঞ্জ এলাকায় মোট ৪০টি ঘোড়ার গাড়ি চলে। তার মধ্যে বঙ্গবাজারেই আছে প্রায় ২৫টি গাড়ি।
কবে থেকে ঘোড়াগাড়ি
ছেলে বেলায় আমরা এ গাড়িগুলোতেই যাতায়াত করতাম বলে জানান ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন। তিনি বলেন, ষাটের দশকে এগুলোকে ঠিকা গাড়ি বা ঘোড়ারগাড়ি বলা হত। টমটম সাধারণত উত্তরবঙ্গে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির গাড়ি। এই গাড়িগুলো ফুলবাড়িয়া কেন্দ্রীক ছিল। ১৮৪৪ সালের ‘ক্যালকাটা রিভিউতে’ উল্লেখ আছে নানা ধরনের ঘোড়ার গাড়ির। এই বিভিন্ন ধরনের ঘোড়ার গাড়িগুলো সেইসব দিনে কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি শহরে দেখা যেত। ৪ চাকাবিশিষ্ট গাড়ি, তবে বসার আসন কেবল একটি, তাকে বলা হত ব্রিডজকাস। আবার চার আসনবিশিষ্ট, পেছনে ফুটম্যানের দাঁড়াবার জায়গা থাকত। শক্ত ছাদ। গাড়িটি অনেকটা বাক্সের মত। দুধারে চারটি জানালা এবং দুই ঘোড়া জুড়ে চালানো হত। তাকে বলা হত ক্রাহানচি। আবার দুই আসনবিশিষ্ট গাড়িকে বলা হত ব্রাউনবেড়ী। ঢাকার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইংরেজ শাসনামলে বৃটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা থেকে প্রথম ঢাকার রাস্তায় ঘোড়ারগাড়ি আসে। আর আর্মেনীয় বণিক সি.এম. সিরকোর নামই যুক্ত এই এলাকায় ঘোড়াগাড়ির আমদানির সাথে। এই ঠিকাগাড়িই একসময় ঢাকা শহরের প্রধান যানবাহনে পরিণত হয়। যা বর্তমানে টমটম নামে পরিচিত।
যে সমস্যায় আছে তারা
একটি গাড়ি দিয়ে সারাদিনে ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানায় কোচোয়ান মাসুদ। ঘোড়ার পেছনে খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে ছোলা, গম ও ভূষি বুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে। ভূষি আর ঘাষ দিয়ে এক জোড়া ঘোড়ার পিছনে তাদের খরচ হয় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয়’শ টাকা। তাই লাভও আগের মতো হচ্ছে না। দুই চাকা বিশিষ্ট একটা টমটমে চড়তে পারেন ৮ জন যাত্রী। তিনি জানান, একটা গাড়ি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৬ বার সদরঘাট থেকে গুলিস্থান আসা-যাওয়া করতে পারে। তিনি আরো জানান, ১৫ বছর আগেও এই রুটে ৮০ থেকে ১০০শ’র মতো টমটম চলাচল করতো। তখন যাত্রীর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। বিক্রমপুর, দোহার, মানিকগঞ্জ হাট থেকে তারা ঘোড়া কিনে আনেন। ৫০/৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩/৪ লাখ টাকা ঘোড়ার দাম হয়। মাঝে মধ্যে ট্রাফিক পুলিশ তাদের গাড়ি আটকে বাড়তি সমস্যা করে বলে অভিযোগ করেন তারা।
নায়কের সিডিউল আছে ঘোড়ার সিডিউল নাই
১৯৭৬ সালে নাজির রূপার অলংকৃত এই গাড়ি পেয়ে আলোচনায় চলে আসেন। সে সময় পোশাকীয় সব ছবিতে তিনি তার ঘোড়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে জনপ্রিয় নায়করা সিডিউল দিতে পারলেও সিডিউল থাকতো না নাজিরের ঘোড়ার। নিশানা, শাহী দরবার, রাজকন্যা, মধুমিতা, ডাকু-মনসুর, রাজদুলারী প্রভৃতি অনেক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তার ঘোড়া। শুধু তাই নয় বিখ্যাত নায়ক দিলীপ কুমার, সুনীল দত্ত ও জিদানের মতো ফুটবল খেলোয়ার এবং নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসও তার গাড়ির সোয়ারি হন বলে জানান নাজির। স্মৃতি হাতরে নাজির বলেন, সুপারস্টার নায়ক ওয়াসিমের সাথে আমার সিডিউল নিয়ে ঝগরা হতো। পরিচালক ওয়াসিমকে বলতেন ওর সাথে ঝগরা করো না, তুমি যেমন আমার আর্টিস্ট তেমনি ওর ঘোড়াও। ঘোড়া ছাড়া তোমাকে দিয়ে শুটিং শেষ হবে না। সে এক অন্য ইতিহাস। সেই ইতিহাসের হাতছানি আজও পিছু ডাকে নাজিরকে। তাই গত শতকের আশির দশকে ভাওয়ালের রাজার ঘোড়া জোড়ার দাম বিশ লাখ হওয়ায়ও সে তা বিক্রি করেনি।
আজও তিনি বিয়ে ও বিশেষ অনুষ্ঠানে ঘোড়া ভাড়া দেন। অনেক বিখ্যাত মানুষের বিয়েতে তার ঘোড়ার ডাক আসে। ঐতিহ্যের এই হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে নাজিরের মতো এই ব্যবসায় আছেন হেলাল মিয়া, নিজাম মিয়া, মাসুদসহ অনেকে। যত দ্রুতগামী যানই আসুক না কেন এখনও ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা রয়েছে অনেকের কাছে। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠান, নাটক বা চলচ্চিত্রের শুটিং, কোনো উত্সব বা শোভাযাত্রাতেও বর্তমানে ঘোড়াগাড়ির ব্যবহার হয়ে থাকে।
