রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত রংপুর জাদুঘরে পবিত্র ঈদের দিন থেকেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ঈদের ছুটি শেষ হলেও সেখানে দর্শনার্থীদের সমাগম কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঈদ করতে আসা রংপুর অঞ্চলের নারী-পুরুষ ও শিশুদের পদচারণায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখরিত থাকছে রংপুর জাদুঘর এলাকা। ঐতিহাসিক এই তাজহাট জমিদার বাড়ির জাদুঘর দেখতে ছুটে আসছে মানুষ। জাদুঘরের আয়ও যথেষ্ট বেড়েছে। গত বছর শুধু প্রবেশ ফি থেকেই জাদুঘরের আয় হয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এ বছর তাও ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। তবে জাদুঘরে লোকবল ও নিরাপত্তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে জমিদার বাড়িটিকে মনোরম সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে তৈরি করা হয়েছে ফুলের বাগান ও রাস্তা। দর্শনার্থীদের বসানোর জন্য জাদুঘর চত্বর জুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে আসন। খোলা হয়েছে মন্তব্য বই। দেশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি ১০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ১শ টাকা। ২০০৭ সালে এ জাদুঘরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী এসেছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৭শ ৮ জন, ২০০৮ সালে প্রায় দেড় লাখ, ২০০৯ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ১শ ৬০ জন, ২০১০ সালে ২ লাখ ১০ হাজার, ২০১১ সালে প্রায় আড়াই লাখ এবং ২০১২ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ৫২০ জনে। দিন দিন বেড়েই চলেছে দর্শনার্থীদের সংখ্যা।
রবিবার দুপুরে সরেজমিনে তাজহাট জমিদার বাড়িতে গেলে দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের বেশকিছু নিদর্শন রয়েছে। তবে জাদুঘরের সংগ্রহ আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। অনেকে আবার জাদুঘরের পাশাপাশি এখানে পর্যটন ও পিকনিক স্পট গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মত ব্যক্ত করেন। এতে করে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তারা তাজহাট জমিদার বাড়িতে ক্যান্টিন, গ্যারেজ, পর্যাপ্ত আলো, টয়লেট ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দাবি জানান।
জমিদার গোপাল লাল রায়ের এই বাড়িটি প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। রংপুর মহানগরীর উপকণ্ঠে মাহিগঞ্জ এলাকায় অনেকটা নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয় ১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে।
১৯৪৭ সালে জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন ৫৫ একর জমিসহ মূল ভবনটি এগ্রিকালচার ইন্সটিটিউটকে দেয়া হয়। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে জমিদার বাড়ির মূল ভবনসহ ১৫ একর জায়গা দেয়া হয় হাইকোর্ট ডিভিশনকে। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ উঠে গেলে ১৯৯৫ সালে তাজহাট জমিদার বাড়িকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে ন্যস্ত করা হয়। ২০০৫ সালে নগরীর কেন্দ্রস্থল স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরী চত্বর থেকে শহরের একমাত্র জাদুঘরটি স্থানান্তর করা হয় মাহিগঞ্জ তাজহাট জমিদার বাড়িতে। পরে এই জমিদার বাড়িকে রূপান্তর করা হয় জাদুঘরে।
জাদুঘরের উদ্বোধন করেন তত্কালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান। সে সময় তিনি ঘোষণা দেন, তাজহাট জাদুঘরসহ ওই এলাকাকে একটি আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এজন্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণা কেবল ঘোষণাই থেকে গেছে, বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন ঘটেনি।
জাদুঘরে দর্শনার্থী বৃদ্ধির সাথে সাথে সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি জাদুঘরের লোকবলসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। একটি সূত্র জানায়, জাদুঘরে নিরাপত্তার জন্য মাত্র ১০ জন আনসার সদস্য রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। এছাড়াও মাত্র ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে চলছে জাদুঘরের কার্যক্রম। নিরাপত্তা প্রহরীর সংকট থাকায় মহামূল্যবান প্রত্নসম্পদ রক্ষায় রীতিমত শঙ্কিত থাকতে হয় কর্তৃপক্ষকে।
