বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাটকল কমছে উত্পাদন

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২২:৩৫
কমছে পাটের উত্পাদন, বন্ধ হচ্ছে একের পর এক পাটকল। সেইসাথে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে চলতি মৌসুমে পাটের মন্দা বাজার। দেশের হাটবাজারে আগাম জাতের যে পাট উঠেছে তার নায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। গত তিন/চার মৌসুম ধরে একই অবস্থা। তবে কি সোনালী আঁশ পাট আবার কৃষকের গলার ফাঁস হলো? পাট খাতের এই করুণ দশার জন্য সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক পাটের বাজারে সংকটের পাশাপাশি দেশীয় বাজারে পাটের ব্যবহার না বাড়ানোকে দায়ী করেছেন। পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন করা হলেও খোদ সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানই এ আইন মানছে না। তবে গত মঙ্গলবার চালে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সরকারি প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয়া হাইকোর্টের আদেশের উপর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত স্থগিতাদেশ দেয়ায় এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আর. সি. বর্মন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, যেভাবেই হোক- পাট খাতকে বাঁচাতে হবে। বিদেশে পাটের নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি দেশে পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই পাটের মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট মাঠে নামবে। আগাম জাতের পাট, হাসি নেই কৃষকের... দেশের হাট-বাজারে উঠেছে আগাম জাতের পাট। চলতি মাসেই পুরোদমে পাট কাটা শুরু হবে; কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বর্তমানে আগাম জাতের সাধারণ মানের পাট প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১১০০ থেকে ১২৫০ টাকা দরে। এ দরে পাট বিক্রি করে মহাজনের দেনা শোধ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সিমলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, পাটে গত কয়েক বছর ধরে লোকসান হওয়ায় তিনি এবার কম পরিমাণ জমিতে পাট চাষ করেছেন। বাকি জমিতে অন্য ফসল চাষ করেছেন। এই উপজেলার পাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস সরকার শামীম জানান, প্রতিমণ তোষা পাট বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। মেছতা (আসমান তারা) ১১৫০-১৭০০ টাকা। প্রতি বছর এ মৌসুমে চান্দাইকোনা পাট ক্রয় কেন্দ্রে ৬ থেকে ৭ হাজার মণ পাট আমদানি হয়। এবার আমদানি হচ্ছে ৪ থেকে ৬শ মণ। বড় বড়ব্যবসায়ীরা পাট কিনতে পারছেন না। কারণ, সিরাজগঞ্জের জাতীয় (কওমী) জুট মিলের নিকট স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বকেয়া পাওনা প্রায় ১ কোটি টাকা এখনো পাওয়া যায়নি। সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পাটকলগুলোর কাছে পাট ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। কমছে উত্পাদন, কমছে রপ্তানি... নায্যমূল্য না পাওয়ায় প্রতি বছরই পাটের উত্পাদন কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ৭৪ লাখ ৩৬ হাজার বেল পাট উত্পাদিত হবে যা আগের অর্থ বছরের চেয়ে এক লাখ ১৪ হাজার বেল কম। উত্পাদনের পাশাপাশি কমছে জমির পরিমাণও। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ৬ লাখ ৬৫ হাজার একর জমিতে পাট চাষ হয়েছে; কিন্তু আগের অর্থ বছরে পাট চাষ হয় ৬ লাখ ৮৩ হাজার একর জমিতে। এছাড়া ২০১২-১৩ মৌসুমে ৭ লাখ হেক্টর, ১১-১২ মৌসুমে ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ও ২০১০-১১ অর্থ বছরে সাত লাখ আট হাজার হেক্টর জমিতে ৮৪ লাখ বেল পাট হয়। উত্পাদন কমার পাশাপাশি রপ্তানিও কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে পাটের চাহিদা কমে গেছে। বাংলাদেশের পাটের বড় ক্রেতা সিরিয়া, মিসর, ইরান, ইরাক ও লিবিয়া পাটের আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে অনেক জায়গায় বাজার পুরোপুরি বন্ধ। এর প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয়ে। ২০১০-১১ অর্থ বছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৮ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। এরপর ধীরে ধীরে রপ্তানি আয় কমতে থাকে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে পাঁচ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। এছাড়া কাঁচা পাট রফতানিও কমেছে। বন্ধ হচ্ছে পাটকল... বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শুরুতে পাটখাতে নতুন করে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কৃষকের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে ফিরে এসেছিল সোনালী আঁশ। সে সময় প্রতি মণ পাট সাড়ে ৩ হাজার টাকাও বিক্রি হয়েছে। রাতারাতি অনেক বন্ধ পাটকল চালুর পাশাপাশি নতুন অনেক পাটকলও চালু হয়; কিন্তু ২০১১ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কবলে পড়ে দেশের পাটখাত। একদিকে আন্তজার্তিক বাজার মন্দা, অন্যদিকে দেশে বাজারে পাটপণ্যের ব্যবহার না বাড়াসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ হচ্ছে একের পর এক পাটকল। গত তিন বছরে ৪০টির বেশি বেসরকারি পাটকল ও পাট সুতাকল বন্ধ হয়েছে। এরমধ্যে গত চার/পাঁচ মাসেই বন্ধ হয়েছে ১৪/১৫টি পাটকল। এছাড়া অনেক পাটকল তাদের উত্পাদন অর্ধেকে নামিয়েছে। ফলে এসব কারখানায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে। বন্ধ হওয়া পাটকলগুলোর মধ্যে রয়েছে পূবালী জুট মিলস, সালেহ জুট মিলস, এ আর হাওলাদার জুট মিলস, এলাইড জুট মিলস, চিটাগাং জুট কোম্পানি, দি ঢাকা জুট মিলস, ফৌজি চটকল, নিশাত জুট মিলস, সুলতানা জুট মিলস, ন্যাশনাল জুট মিলস, তাজ জুট মিলস, প্রিতম জুট জুটেক্স, সালেহ কার্পেট, কোহিনূর জুট মিলস, এজাক্স জুট মিলস খানসনস জুটেক্স, ইসমাইল কার্পেটস, বেঙ্গল কার্পেটস, একেডব্লিউ বারলেপ অ্যান্ড ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রি, নওয়াব আসকারী জুট মিলস, পূবালী জুট মিলস, মহসিন জুট মিলস, জব্বার জুট মিলস ইত্যাদি। সরকারি প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার করছে না... পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন করা হলেও বেসরকারির খাতের পাশাপাশি খোদ সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই তা মানছে না। অথচ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যদি পাট পণ্য ব্যবহার করতো তাহলে দেশে উত্পাদিত পাটের অর্ধেকের বেশি এখানেই ব্যবহূত হতো। বর্তমানে বাংলাদেশ জুট মিলস্ কর্পোরেশন (বিজেএমসি ) উত্পাদিত পাটের ১৬ শতাংশ ক্রয় করে। এই হিসাবে প্রায় ২০ লাখ বেল পাট ক্রয় করা হয়। পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন কার্যকর হলে পাট ক্রয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ পরিচালিত ‘জুট অ্যান্ড বাংলাদেশ ইকোনমি’ শীর্ষক সমীক্ষায় বলা হয়, পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে বার্ষিক পাটের ব্যাগের চাহিদা ৯০ হাজার পিস থেকে বেড়ে ৮৪ কোটি পিসে উন্নীত হবে। এ প্রসঙ্গে পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ইত্তেফাককে বলেছেন, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি প্যাকেটজাতের ক্ষেত্রে অবশ্যই পাটের মোড়ক ব্যবহার করতে হবে। ইতিমধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের সাথে চুক্তি হয়েছে। তারা ১০০ শতাংশ পাটের বস্তা ব্যবহার করবে। তবে চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন ও বেসরকারি চিনি মিল ৫০ শতাংশ পাটের বস্তা ব্যবহার করবে। তিনি বলেন, দেশেই যদি আমরা পাটের সর্বোচ্চ ব্যবহার করি তাহলে কৃষকরা নায্যমূল্য পাবে। পাট কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি পাটের সুদিন ফেরাতে পাট কমিশনের দেয়া সুপারিশ গত তিন বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১১ সালে পাট কমিশনের চেয়ারম্যান ড. খলিকুজ্জমান আহমেদ তত্কালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর হাতে এ প্রতিবেদন তুলে দেন। প্রতিবেদনে দেশে এবং বিশ্ব পর্যায়ে পাটের ব্যবহারের প্রসারমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পাট খাতকে পুনর্গঠন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় আনতে সুপারিশ করা হয়। কমিশনের দেয়া প্রতিবেদন বলা হয়, পাটখাত সংকুচিত হওয়ার ফলে অনেক কৃষক, দক্ষ ব্যবস্থাপক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী এই খাত ছেড়ে চলে গেছে। ফলে খাতটিতে সংকট বিরাজ করছে। প্রতিবেদনে উন্নত পাট চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং অর্থ সংকটের কারণে তাদের যেন কম দামে পাট বিক্রি করতে না হয় সে জন্য সাময়িক ঋণের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। কিন্তু এখন এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক রায়গঞ্জ সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, দেহের ঘাম ঝরিয়ে আবাদ করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ায় সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক। অনেকেই এবার পাটের আবাদ করেনি। উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের তেলিজানা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম জানান, এবছর তিনি পাটের আবাদ করেননি। গত বছর ২বিঘা জমিতে পাট চাষ করে তিনি সব খরচ বাদে প্রায় আড়াই হাজার লোকসান গুণতে হয়েছে। তিনি জানান-হাল-চাষ, বীজ সার কীটনাশক, পাট জাগ দেয়া, ধোয়া ও শুকিয়ে বাজারে পাঠানো পর্যন্ত কৃষাণ মজুরিসহ বিঘাপ্রতি পাট চাষে খরচ হয় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি ভাল উত্পাদন হলে পাট হয় ৭ থেকে ৯ মণ। পাইকারদের থেকে দাম পাওয়া যায় ১১০০-১২৫০ টাকা। নিজের পরিশ্রমেরও একটা মজুরি আছে। তা আর থাকে না। উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সিমলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্দুস সাত্তার জানান, ধারদেনা করে তার বর্গা নেয়া দেড় বিঘা জমিতে এবার মেছতা (বিদেশি জাতের আসমান তারা) পাট চাষ করেছেন। মোট উত্পাদন হয়েছে সাড়ে ১০ মণ। আবাদে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। মঙ্গলবার চান্দাইকোনা হাটে তিনি একমণ পাট বিক্রি করেছেন ১২০০ টাকা। এভাবে আবাদ করে মহাজনের দেনা শোধ করা যাবে না। আর তিনি পাটের আবাদ করবেন না বলে জানান। গতবারের চেয়ে এবার এই এলাকায় পাট চাষ কম হয়েছে।