একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে অবহেলিত কৃষিশিক্ষা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৮
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন আইএলওর তথ্যমতে বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্বের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৫ সালে এ সংখ্যা প্রায় ছয় কোটিতে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। তারা কাজ না পেয়ে আয়-রোজগারের পথ না পেয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, সন্ত্রাসী, মাস্তানি, মাদকাসক্তসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িয়ে দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে। এই বেকারদের কৃষি উত্পাদনের সাথে জড়িত করতে পারলে বেকারত্ব, দরিদ্রতা, অসামাজিক কার্যকলাপ দূর হবে ও দেশে কৃষি উত্পাদন বাড়বে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে শিক্ষিত বেকারদের কৃষিপণ্যের উত্পাদনমুখী করার নির্দেশ দেন এবং কৃষিশিক্ষার গুরুত্ব দেন। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির কৃষিশিক্ষা বিষয়ের কারিকুলামে কৃষি উত্পাদনের মাধ্যমে আয় উপার্জনের উপর শিক্ষা গ্রহণের অনেক সুযোগ রয়েছে। অথচ গত ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষা চতুর্থ বিষয়ের (ঐচ্ছিক) কাঠামোতে দেয়া হয়েছে। আবার ব্যবহারিক নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫ করা হয়েছে। এতে ছাত্রছাত্রীরা কৃষিশিক্ষা বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হচ্ছে না। দেশে প্রতিবছর প্রায় নয় লাখ ছাত্রছাত্রী একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। এদের মধ্য থেকে এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত শতকরা ২৫-৩০ ভাগ ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া বাদ দিয়ে বেকার হয়। অনেকে স্নাতক অথবা মাস্টার্স পাস করেও বেকার হয়। প্রতিবছর নয় লাখ ছাত্রছাত্রী একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষা পড়ার সুযোগ পেলে অনেকে বিভিন্ন কৃষি খামার বা কৃষিপণ্য উত্পাদনে আগ্রহী হবে। বর্তমানে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষা পড়লে যেগুলো শিখতে পারবে ও আগ্রহী হবে সেগুলো হলো:ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খামার করা, ডেইরী ফার্ম করা, গরু মোটাতাজাকরণ, মাশরুম চাষ, মৌচাষ, জৈবসার উত্পাদন, জীবাণুসার উত্পাদন, বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ, ফুল-ফল-মসলা ফসল উত্পাদন, নার্সারী করা, রেশম চাষ, বীজ উত্পাদন, ফল সবজি দিয়ে সংরক্ষিত খাদ্য তৈরি, মাছ চাষ, চিংড়ি চাষ, ইনকিউবেটরে মুরগির বাচ্চা উত্পাদন, কোয়েল পালন, হাঁস পালন, কবুতর পালন, গরু-মহিষ-ছাগল পালন ইত্যাদি। বেকার যুবক-যুবতীরা ঋণ গ্রহণ করে এসব কৃষিপণ্য সহজেই উত্পাদন করে বেকারত্ব ও দরিদ্রতা দূর করতে পারে। এতে বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাড়বে ও খাদ্যদ্রব্যের দাম কমবে। দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলো কৃষি। কৃষিপণ্যের উত্পাদন বাড়লে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। গতবছর থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কৃষিশিক্ষা চতুর্থ বিষয় করে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের কৃষিশিক্ষা পড়ার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে কৃষিশিক্ষা বই লেখা হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতিতে কিন্তু প্রশ্ন পদ্ধতি করেছে সনাতন পদ্ধতি (সংক্ষিপ্ত ও রচনামূলক প্রশ্ন)। এতেও ছাত্রছাত্রীরা সমস্যায় পড়েছে। কেউ কেউ মনে করছে এটা বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র। গতবছর কৃষিশিক্ষাকে চতুর্থ বিষয় করার খবর পেয়েই কৃষিশিক্ষা বিষয়ের কলেজের শিক্ষক নেতৃবৃন্দ এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও শিক্ষাসচিবের সাথে দেখা করে কৃষিশিক্ষা আবশ্যিক/নৈর্বাচনিক রাখার দাবি জানান। তারা এ ব্যাপারে আশ্বাস দিলেও তা কার্যকরী করেনি। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সারা দেশের কলেজের কৃষিশিক্ষকরা সংগঠিত হচ্ছে। কৃষিশিক্ষা প্রায়োগিক ও কারিগরি হওয়ায় কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এজন্য কৃষির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির জন্য ৫ম শ্রেণি থেকে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত কৃষিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষিশিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইতিপূর্বে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষিশিক্ষা বিভাগ ছিল। এরপর বিভাগ বাদ দিয়ে শিক্ষাক্রমে নৈর্বাচনিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এখন চতুর্থ বিষয় (ঐচ্ছিক) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষামন্ত্রণালয় অবহেলিত করেছে। ফলে কৃষিপণ্য উত্পাদন ব্যাহত হবে। উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হবে। বর্তমান সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে। দেশের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে কৃষি শিক্ষা আবশ্যিক/নৈর্বাচনিক করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। টাঙ্গাইল