রাজশাহীতে ওলন্দাজ ‘বড়কুঠি’ জাদুঘর করা হয়নি

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৪
রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক, ওলন্দাজ বণিকদের নির্মিত প্রাচীন দালান পদ্মাপাড়ের ‘বড়কুঠি’তে মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই বড়কুঠিকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। সেখানেই স্থানান্তরিত হচ্ছে মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি। নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি এসএম আবদুস সোবহান বলেন, মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়িটি বড়কুঠিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে ওই ভবনটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্লাব রয়েছে। এরপর স্থানান্তরিত হবে পুলিশ ফাঁড়ি। বড়কুঠিতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, ‘হেরিটেজ রাজশাহী’র প্রতিষ্ঠাতা এসএম মাহবুবুল কুদ্দুছ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্য হিসেবে এই স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ছাড়া কারও কাছে হস্তান্তর করা উচিত নয়। যে কোন মূল্যে এটা ঠেকানো উচিত।’ অন্যদিকে ‘বড়কুঠির (নীলকুঠি)’ ঐতিহ্য রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। গত রবিবার বড়কুঠিতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের খবর প্রাপ্তির পর ঐতিহ্য বহনকারী ভবনটিতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত স্থগিতের অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। চিঠিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মিত পদ্মাপাড়ের বড়কুঠি (নীলকুঠি) রাজশাহী নগরীর সবচেয়ে প্রাচীন দালান। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে ওলান্দাজ বা ডাচদের নির্মিত যতগুলো ভবন রয়েছে তার মধ্যে বড়কুঠিই সবচেয়ে প্রাচীন। সম্প্রতি এ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভবন বড়কুঠিতেই রাজশাহীর মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে প্রাচীন স্থাপত্যের বিলুপ্তি ঘটবে, গবেষণা ও পর্যটন শিল্পে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বড়কুঠিতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান তিনি। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, নগরীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন, পর্যটন এবং গবেষণায় সহায়তার অংশ হিসেবে বড়কুঠি সংস্কারের পর হেরিটেজ ঘোষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তরও করতে চেয়েছিল। ডাচ আর্কিভিস্টরা তখনই নেদারল্যান্ডসের রোটারি ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ওলন্দাজ ডাচদের নির্মিত যতগুলো পাকা দালান বা ভবন রয়েছে তার মধ্যে বড়কুঠিই সবচেয়ে প্রাচীন। ওই ভবনে পুলিশ ফাঁড়ি স্থানান্তর উচিত হবে না।’ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘বড়কুঠি গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তারা হেরিটেজ ঘোষণা করে বড়কুঠিটি নগর জাদুঘর করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন; কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটি শেষ পর্যন্ত হস্তান্তরে রাজি না হওয়ায় এটিকে হেরিটেজ ঘোষণার কাজ আর এগোয়নি।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মিজানউদ্দিন বলেন, মালোপাড়া ফাঁড়ি সংস্কারের কাজ চলছে। সেজন্য অস্থায়ীভাবে পুলিশকে এটা ব্যবহার করতে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংস্কার কাজ শেষ হলেই পুলিশ সেটি ছেড়ে দেবে। স্থায়ীভাবে ভবনটি ব্যবহারের জন্য পুলিশকে দেয়া হচ্ছে না বলে জানান তিনি। প্রসঙ্গত, ওলন্দাজদের আমলে যেমন ছিল- অট্টালিকাটি এখনো অবিকল তেমনই আছে। কারণ নির্মাণ-উত্তরকালে অট্টালিকাটিতে যেটুকু সম্প্রসারণ কাজ হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলতে হয়। ফলে কেবল আদি অট্টালিকাটিই থেকে যায়। এর দেয়ালের প্রস্থ এবং নীচতলার কক্ষগুলোতে অন্ধকারের মাত্রা দেখে কোন দর্শকই অবাক না হয়ে পারেন না। এসব কক্ষ রেশম রাখার গুদাম ঘর হিসেবে ব্যবহূত হতো। ওলন্দাজ বণিকদের অধিকারে থাকার সময় বড়কুঠি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। অট্টালিকাটির চারপাশের বুরুজের প্রত্যেকটিতে বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়ার উপযোগী ফোকর রয়েছে যেগুলো থেকে নিচের আক্রমণকারী শত্রুকে গুলি করা সম্ভব। অট্টালিকাটিতে কয়েকটি কামানও স্থাপিত ছিল। মেদেনীপুরের জমিদার কোম্পানি কামানগুলি নদীয়া (ভারতের পশ্চিম বাংলা) জেলার শিকারপুরে সরিয়ে নেয়। ওলন্দাজ বণিকগণ চলে যাবার পর এ ভবনটি ছিল বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি। ১৮৩৩ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক তত্পরতা বন্ধের পূর্ব পর্যন্ত এটি তাদের বাণিজ্য কেন্দ ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় এ ভবনকে ইউরোপীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর দফতরে রূপান্তর করা হয়েছিল। তারপর ভবনটি মেদিনীপুরের জমিদার কোম্পানির হাতে চলে যায়। তারা এর একটি অংশকে ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশন কোম্পানির কাছে ভাড়া দেয়। উক্ত কোম্পানি তাদের এক স্থানীয় এজেন্টের আবাসগৃহ ও অফিস হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৪৭ সালে উপ-মহাদেশের স্বাধীনতা লাভ ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান ও ভারতের অভ্যুদয়ের পর এ ভবনটি খাদ্য বিভাগের গুদাম ঘরে পরিণত হয় এবং ১৯৫৩ সালে এ ভবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন ও প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তর করা হয়। অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগে ওলন্দাজদের বাণিজ্যিক কুঠিরূপে ‘বড়কুঠি’ ১২ কামরা বিশিষ্ট দ্বিতলাকারে স্থাপিত হয়। মূল ভবনের দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট, প্রস্থ ৬৭ ফুট। একটি সভাকক্ষবিশিষ্ট উপর তলায় ৬টি কামরা আছে। এর দরজা ও জানালা অধিকাংশই সুপ্রশস্ত ও প্রায় একই মাপের। নিচের কামরাগুলো বর্তমানে বহু কামরায় বিভক্ত করা হয়েছে। উপরে উঠা-নামার জন্য পশ্চিম পাশ দিয়ে একটি প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। ইংরেজ আমলে এই সুবৃহত্ কুঠির সাথে আরো কতগুলো কামরা তৈরি করে কুঠির আকার বড় করা হয়েছিল, যা এখন আর নেই। বর্তমানে ‘বড়কুঠি’ বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।