সুঁই থেকে জাহাজ সবই হচ্ছে যেখানে

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫১
রাজধানীর প্রাণভোমরা বুড়িগঙ্গা মরতে বসলেও তার ওপার জুড়ে নাগরিক চোখের আবডালে ঘটে চলেছে এক অভাবনীয় বিপ্ল¬ব। সেখানে বদলে গেছে দৃশ্যপট। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি দেশের ভেতর এ যেন আরেক দেশ। বাঙ্গালির আলস্য জীবনের ছবি সেখানে অকল্পনীয়। চারদিকে অফুরান শশব্যস্ততা। ফিরে তাকানোর ফুরসতটুকুও নেই যেন কারো। ইঞ্জিনের ধস্ ধস্, কারিগরের আওয়াজ-শ্রমিকের হাঁকাহাঁকি। চলছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। সোনামুখি সুই থেকে সমুদ্রগামী জাহাজ, নাটবল্টু থেকে রেলগাড়ি-বিমানের যন্ত্রাংশ, ফ্লাস্ক থেকে মোবাইল ফোনসেট, সবই তৈরি হচ্ছে এখানে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মালামাল তৈরি করছেন লেখাপড়া না জানা ‘ইঞ্জিনিয়ার’রা। জিঞ্জিরা হয়ে শুভাড্যা; হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, আগানগর, মান্দাইল, কালিন্দি, বরিশুর, তাওয়াপট্টি, টিনপট্টি, বাঁশপট্টি, কাঠপট্টি, মিরেরবাগ, চর-মিরেরবাগ, খেজুরবাগ, চর-খেজুরবাগ, কালীগঞ্জ, চরকালিগঞ্জ, কৈবর্ত্যপাড়া, চরকুতুব, চুনকুটিয়া, বাঘাবাড়ি, ইস্পাহানি, নতুন শুভাঢ্যা, আমবাগিচা, ইমামবাড়ি, কদমতলী গোলচত্বর, খোলামোড়া অবধি কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে শিল্প-পল্লীর বিস্তার। দুই হাজারের বেশী ক্ষুদ্র এবং হালকা শিল্প কারখানা। ১২ লাখ কারিগর-শ্রমিকের উদয়াস্ত পরিশ্রম। বাবুবাজার ব্রিজ পেরিয়ে বাম দিকে একটু এগুলেই চোখে পড়বে অসামান্য এই কাণ্ড। অন্য এক আবহ। ছোট ছোট টিনের ঘর। চারদিকে অবিরল খুটখাট, টুংটাঙ, ঢং-ঢং। যতই ভেতরে যাওয়া যাবে বিস্মিত হতে হবে পথিককে। এখানকার মানুষ তাদের এই এলাকাকে নিয়ে একটু বেশি রকমের গর্বিত। সরল অহমিকায় তারা বলে ’বাংলার চীন’, ’বাংলার জাপান’, ’মেইড ইন জিনজিরা’। এখানকার কারিগররা এতটাই দক্ষ, হুবহু বানিয়ে দিতে পারেন যে কোনো যন্ত্রাংশের নমুনা দিলেই। তাদের তৈরি এই যন্ত্রাংশ টেকসই এবং মানে তা আসল পণ্যের চেয়ে কম নয়। আর এগুলো তৈরিতে যে যন্ত্র বা মেশিন দরকার হয়, তা নিজেরাই বানিয়ে নেন কারিগররা। এখানে বড় বিপ্ল¬ব ঘটেছে পোশাক শিল্পে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পোশাকের ৬০ ভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে এই পল্লী। এখানে দিনে বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার পোশাক। বিশেষ করে জিন্স প্যান্ট তৈরিতে সুনাম অর্জন করেছে। দেশীয় বাজারের জিন্সের প্রায় ৮৫ ভাগ চাহিদা কালিগঞ্জ থেকে পূরণ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ ৩৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে এখানে তৈরি পোশাক। তৈরি হচ্ছে নাট-বল্টু, ওয়াশার, সিপ্রং, দরজার কবজা, ছিটকিনি, বার্নার, ক্লাম, টোপ ওয়াশার, পে¬নজার, কলের বাকেট, হ্যাশবল তালা, শাটার সিপ্রং, স্ক্রু, রিপিট, সব ধরনের হার্ডওয়্যার সামগ্রী, গাড়ির পার্টস, তারকাটা, জিআই তার, আলতালা, হ্যাসবোল্ট, কব্জা, দা-বটি, শাবল, বালতি, চাপাতি, কুড়াল, কোদাল, কুন্নি, বিবিধ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ডেকোরেটর সরঞ্জাম, ওয়াশিং টব, পিতলের বার্নার, কেরোসিন চুলা, পিতলের ডেগ, কলসি, তামার ডেগ, ক্রোকারিজ, তাওয়া, টিফিন ক্যারিয়ার, সাইলেন্সার, আশকল ডুম্বরি, নিক্তিকাঁটা, সাটার, কলাপসিবল গেট, লোহার জানালা, দরজা, অ্যালুমিনিয়ামের জগ-মগ। জাহাজ নির্মাণে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্মিত হচ্ছে যাত্রী ভ্যাসেল, এমপিসি ভ্যাসেল, পাইলট ভ্যাসেল, ফেরি, ট্যাঙ্কার, পন্টুন, কার্গো, ট্যাংকার শিপ, কার্গো শিপ, প্যাসেঞ্জার শিপ, ক্যাটামেরিন শিপ, ওয়াটার বাস, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, ড্রেজারসহ বিভিন্ন শিপ তৈরি হয় এখানে। দুটি প্রতিষ্ঠানে রেলওয়ের গেজ ও ব্রড গেজ তৈরি হচ্ছে। রেল যন্ত্রাংশের মধ্যে আছে ওয়েলবাথ ফিল্টার, এয়ারকার্ড ফিল্টার, লুব ওয়েলপুলার, ইন্টারকুলার, পুশরড, বার্নারিহেড, উইকএক্সেল ক্যাপ লুব্রিক্যান্ট, ফুলট্যাঙ্কগেজ, স্টেইনার অ্যাসেম্বলি, ইনলেট ফুয়েল, ইনজেক্টর পাম্প, উইক অ্যাসেম্বলি, লুব্রিকেশন প্যাড, ফ্রিকশনএয়ার, উইথভোল্ট স্যাপ এবং ফিক্সডওনার। প্রসাধনসামগ্রী থেকে শুরু করে বাইসাইকেল, হাজারো খেলনা, চামড়া-প্ল¬াস্টিকের জুতা-স্যান্ডেল, সিরামিকের তৈজসপত্র, আলকাতরা, নারিকেল, তেল, শাড়ি-লুঙ্গির জন্যও এখন প্রসিদ্ধ। এখানকার কারিগরেরা মাত্র ২০/৩০ হাজার টাকা মূল্যের যন্ত্রে প্লেনশিট থেকে যে মানের ঢেউ টিন তৈরি করেন গুণগত মানে তা কোনও অংশে খারাপ নয়। যে ভাবে বদলে যায় দৃশ্যপট- কেরানীগঞ্জের এই শিল্প বিপ্লবের প্রাণকেন্দ ঢাকার দক্ষিণ উপকণ্ঠের দ্বীপ-জনপদ জিনজিরা। জিনজিরা এখন ইতিহাস। বিকশিত হয়ে জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু সম্ভাবনাময় শিল্পের। বিকশিত এসব শিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যেভাবে আজকের জিঞ্জিরা বাংলাপিডিয়াসহ ইতিহাসগ্রন্থগুলো জানাচ্ছে, বাংলায় নবাবি আমল থেকে ঢাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ হিসেবে জিঞ্জিরা প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। নৌপথে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পণ্য বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে এখানকার ‘হাটে’ তোলা হতো। ব্রিটিশ আমলে জিঞ্জিরা হাট কাঁচাপাট, পাটজাত, টিনজাত সামগ্রী, মসলা, গজারি লাকরি (খুঁটি), মৃিশল্প, লৌহ সামগ্রী, বিভিন্ন প্রকারের সাইজ কাঠ, বাঁশ ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত ছিল। এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে জিঞ্জিরা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেশ কিছু শিল্প গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা পরবর্তী কেমিক্যাল নির্ভর ভোগ্যপণ্য, মেলামাইনসহ আরও অনেক পণ্যের কারখানা গড়ে ওঠে এবং ক্রমেই এর প্রসার বাড়তে থাকে। এসময়ে প্রায় সব ধরনের হার্ডওয়্যার সামগ্রী, মেলামাইন, প্রসাধনী ইত্যাদি তৈরিতে জিঞ্জিরা রীতিমত অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ঠিক একই সময় জিঞ্জিরার কারিগররা নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্য হুবহু নকল করছে বলে দুর্নামেরও সূচনা ঘটে। এ বিষয়ে স্থানীয়দের দাবি, অন্য এলাকার কারিগররা নকল করে জিঞ্জিরার নাম ভাঙ্গিয়েছে। কিন্তু তারপরও নকলের দুর্নাম এখনো ঘুচাতে পারেনি জিঞ্জিরাবাসী। জিঞ্জিরা সম্পর্কে বলা হয়, যে কোনো পণ্যের হুবহু নকলে এ এলাকার কারিগরদের দক্ষতা বিস্ময়ের দাবিদার। দেশে মেড ইন জাপান ও মেড ইন চায়না তকমা লাগানো যেসব পণ্য বিক্রি হয়, তার একাংশ জিঞ্জিরা বা সন্নিহিত শিল্পাঞ্চলে তৈরি। একজন ব্যবসায়ী জানালেন, কোনো কোনো পণ্য মানে-গুণে আসলের চেয়েও ভালো। ১০ কোটি মানুষের দেশ জাপান মাত্র ক’বছর আগেও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় শিল্পসমৃদ্ধ দেশ। তিন দশক আগেও শিল্প খাতে চীনের অবস্থান ছিল তাইওয়ানের পেছনে। সেই চীন এখন জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় শিল্পসমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। চীন ও জাপান শিল্প খাতে তাদের যাত্রা শুরু করেছে অন্যসব উন্নত দেশের পণ্য নকল করে। সস্তায় পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে তারা এতটাই দক্ষ যে, যেসব দেশের পণ্য তারা অনুকরণ করত সেসব দেশের বাজারও তাদের দখলে চলে যায়। চীন, জাপান প্রভৃতি উন্নত দেশের অনুকরণে হুবহু একই ধরনের পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে জিঞ্জিরাসহ কেরানীগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের কারিগরদের দক্ষতা যে কোনো বিবেচনায় ঈর্ষণীয়। জিঞ্জিরার কারিগররা বললেন, জাপানে এক সময় যারা অন্যের অনুকরণ করে বানাতেন সেসব জিনিস। তাদের দক্ষতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেদেশের সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার ফলেই ক্রমশ তারা বিকাশ লাভ করে আজকের পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে। জিঞ্জিরার কারিগরদের দাবি, সরকার যদি জিঞ্জিরার কারিগরদের দক্ষতার স্বীকৃতি দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা এখানকার ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতো, তাহলে তাচ্ছিল্য ভরে ডাকা ‘মেড ইন জিঞ্জিরা’র পণ্যই জাপানা কোরিয়ার পণ্যের সমকক্ষ ’বাংলার জাপান’ মেড ইন জিঞ্জিরা বিশেষণ এক সময় বাস্তবে পরিণত হতো। এলাকার প্রবীণরা জানান, স্বাধীনতার পরে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘নকলের রাজ্যে কিছুক্ষণ’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে জিঞ্জিরার কারিগরদের দ্বারা নকল পণ্য তৈরির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। নামিদামি দেশি ও বিদেশি ব্র্যান্ডের সাবান, কসমেটিক্স প্রভৃতি নকল করে সেসব ব্র্যান্ডের নামেই চালিয়ে দেয়ার যে অভিযোগ করা হয় তার বেশির ভাগ পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার, চকবাজার ও বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী বিভিন্ন চরে তৈরি হতো বলে জানা যায়। তৈরি হচ্ছে থেকে শুরু করে প্লাস্টিক পণ্য কেরানীগঞ্জে আটিবাজারের দেশসেবা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানাটিতে ৩২ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। সারা দেশে রেলওয়ের তালিকাভুক্ত প্রায় ৪০টি যন্ত্রাংশ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি একটি। এ তালিকায় পদ্মা ইঞ্জিনিয়ারিং নামে আরও একটি কারখানা রয়েছে এখানে। ওয়েলবাথ ফিল্টার, এয়ারকার্ড ফিল্টার, লুব অয়েল কুলার, ইন্টার কুলার, পুশরড, বার্নার হেড, উইক এক্সেল ক্যাপ লুব্রিক্যান্ট, ফুলট্যাঙ্কগেজ, স্টেইনার অ্যাসেম্বলি, ইনলেট ফুয়েল, ইনজেক্টর পাম্প, উইক অ্যাসেম্বলি, লুব্রিকেশন প্যাড, ফ্রিকশন এয়ার উইথ ভোল্ট স্যাপ, ফিক্সডওনারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এসব কারখানায়। সেবা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল জলিল জানান, ১৯৮১ সালে রেলওয়ের তালিকাভুক্ত হয়ে যন্ত্রাংশ তৈরি করে আসছে কারখানাটি। তিনি বলেন, দেশে মেধা আছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্পকে আরও গতিশীল করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এ দেশে উত্পাদিত যন্ত্রাংশের স্থায়িত্বকাল বেশি। অন্তরায় হচ্ছে প্রয়োজনীয় কাঁচা মালের অভাব। সরকার কাঁচা মাল সরবরাহ করলে বাংলাদেশে শিল্প বিপ্ল¬ব ঘটানো সম্ভব। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে এখন নিয়মিত রেলওয়ের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন অর্থ সাশ্রয়ী হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা হচ্ছেন উদ্বুদ্ধ। এই যন্ত্রাংশগুলো আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে দেশে এই শিল্পের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লি¬ষ্টরা। জাহাজ-লঞ্চ নির্মাণ শিল্পে নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বা খুলনার সঙ্গে সমানতালে আছে কেরানীগঞ্জ। বুড়িগঙ্গা পাড়ে তাকালে তার গর্বিত চিত্র মেলে। এখানে নির্মিত জাহাজ, যাত্রীবাহী ভ্যাসেল, এমপিসি ভ্যাসেল, পাইলট ভ্যাসেল, ফেরি চলছে নদী-সাগরে। কার্যাদেশ আসছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। কয়েক বছর আগেও জাহাজ কেনার জন্য ধনী দেশগুলো ছুটে গেছে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায়। কিন্তু এখন তাদের অন্যতম পছন্দ বাংলাদেশ। তাওয়াপট্টির কথা তাওয়াপট্টিতে গড়ে উঠেছে নাট-বল্টু, ওয়াশার, দরজার কবজা, ছিটকিনি, বার্নার, ক্লাম, টোপ ওয়াশার, পে¬নজার, কলের বাকেট, সব ধরনের হার্ডওয়্যার সামগ্রী, গাড়ির পার্টসসহ সব ধরনের যন্ত্রাংশই তৈরির টিনের ছোট ছোট কারখানা। সারাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে এখানে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, দৈনিক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বেচাকেনা হয় এখানে। স্থানীয় যন্ত্রাংশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র এ শিল্পে উল্লে¬খযোগ্য কোনো সহযোগিতা নেই সরকার বা সরকারের বাইরের তরফ থেকে। এখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে নিচ্ছেন সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে। জাহাজ ভাঙা-স্ক্র্যাপ, বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, রোলিং মিল, নির্মাণাধীন স্থাপনার পরিত্যক্ত লোহা ও শিট সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে নানা যন্ত্রপাতি তৈরি করছেন এখানকার কারিগররা। এ এলাকায় ঢুকলে সারাক্ষণই শোনা যাবে ঠুক ঠুক শব্দ। ছোট ছোট টিনের ছাপড়ায় কারিগররা ব্যস্ত নিজেদের তৈরি মেশিনে যন্ত্রপাতি প্রস্তুতে। এখানকার কারিগরদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। কাজ করতে করতে এক সময়ে পরিণত হন দক্ষ কারিগরে। দীর্ঘদিন অন্যের কারখানায় কাজ করার পর বেশিরভাগ কারিগর নিজেই খুলে বসেন কারখানা। প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি সহযোগী দিনমজুর ও কারিগর কাজ করেন এখানকার শতাধিক কারখানায়। বেশিরভাগ কারখানাই ছোট। চার-পাঁচজনের শ্রমেই চলে একটি কারখানা। একেক কারখানায় আবার তৈরি হয় একেক যন্ত্র। কেউ ওয়াশার বানান, কেউ বার্নার, আবার কেউ তৈরি করেন রিপিট। এর বাইরে কোনো যন্ত্রাংশের নমুনা দিলে তারা বানিয়ে দিতে পারেন হুবহু। এখানকার কারিগর আবদুল বাতেন জানান, ছোট ও মাঝারি সাইজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি হয়। আবার এসব যন্ত্রপাতি তৈরি করতে যে মেশিন দরকার, তা প্রস্তুত করে নেন এখানকারই কারিগর। তিনি বলেন, ‘রিপিট তৈরির একটি অটো মেশিন জাপান থেকে আনতে খরচ হয় ১৭ লাখ টাকা। চীন থেকে আনায় খরচ পড়ে ১২ লাখ। অথচ একই মেশিন তারা তৈরি করে দেন মাত্র তিন লাখ টাকায়। সিপ্রং তৈরির একটি মেশিন ইন্ডিয়া থেকে আনতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। এখানে তা তৈরিতে খরচ পড়ে মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তার দাবি, এখানকার তৈরি যন্ত্রপাতি ও মেশিন বিদেশি পণ্যের চেয়ে মানে ও গুণে কোনো দিক দিয়েই কম নয়। এখানে এমন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী আছেন, যারা চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, পোস্তগোলাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রড, লোহার পাত ইত্যাদি সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন।’ কারিগরদের দাবি-সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সংযোগসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানে তৈরি যন্ত্রাংশ অদূর ভবিষ্যতে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। জিঞ্জিরার তাওয়াপট্টির ব্যবসায়ী মালিক সমিতির একজন নেতা জানান, জিঞ্জিরায় ২ শতাধিক বিভিন্ন লৌহ সামগ্রী তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা দেশের হার্ডওয়্যার পণ্যের বিশাল চাহিদা পূরণ করছে। এসব সামগ্রী তৈরিতে স্থানীয় কারিগররা দক্ষতা অর্জন করেছেন মূলত ‘দেখে দেখে’। আগানগরের পণ্য যাচ্ছে বিদেশে আগানগরে আছে ৫৫টি প্লাস্টিক কারখানা। আমরা ব্যবহারের পর যে বোতল ফেলে দেই তা যায় ঐ কারখানাগুলোতে। অতঃপর তৈরি হচ্ছে নানা পণ্য। আবার তা রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ ২৩টি দেশে। এখানে আছে শতাধিক ফার্নিচার কারখানা। এই ফার্নিচার দেশের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে বিদেশেও। কেরানীগঞ্জে ১৮টি ঢালাই কারখানা গড়ে উঠেছে। ওয়াশিং কারখানা আছে শতাধিক। আছে দুটি মেলামাইন কারখানা। শিলপাটা, ডায়িং, প্রিন্টিংসহ এক বিশাল শিল্পরাজ্য। উদ্যোক্তারা চান নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ কেরানীগঞ্জের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিপ্ল¬বের পেছনে যাদের অবদান আছে এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এসব শিল্প বিকাশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও কোনো সরকারই এর উন্নয়নে উল্লে¬খযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ৮০’র দশকে বিসিক জিঞ্জিরার ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে ১শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু কিছু ঋণ বিতরণের পর বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পের কার্যক্রম। বর্তমানে কেবল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য উত্পাদন চালিয়ে যাচ্ছে। জিঞ্জিরা ও সন্নিহিত এলাকাতে বহু শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও গ্যাস এবং বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় তা সম্ভব হয়ে উঠছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। স্থানীয়রা মনে করেন, এখানকার কারিগরদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিলে দুর্নাম কাটিয়ে নিকট ভবিষ্যতেই স্থানটি সত্যিকারের দ্বিতীয় জাপান হয়ে উঠবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় খাতের বিকাশ ঘটাবে।