রোগটির নাম ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ (ইভিডি)। সাধারণ ভাইরাসঘটিত জ্বরের মতো প্রাথমিক উপসর্গে রোগটির প্রকাশ দেখা দিলেও তাহার মারণরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চমকাইয়া দিয়াছে। রোগের সূত্রপাত জ্বর দিয়া হইলেও পর্যায়ক্রমে চোখ নাক ও মুখ দিয়া রক্তক্ষরণ, সারা দেহে প্রচণ্ড ব্যথা, পেট খারাপ—এই ধারা কয়েক সপ্তাহ চলিবার পর রোগীর মৃত্যু প্রায় অবধারিত। ইবোলার সংক্রমণ গত দুই মাসে পশ্চিম আফ্রিকার লাইবেরিয়া, গিনি ও সিয়েরা লিয়নে ছড়াইয়া পড়িবার পর সমপ্রতি নাইজিরিয়াতেও রোগটি হানা দেয়। রোগটি এক্ষণে আফ্রিকার নানা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকিলেও বিশ্বায়নের যুগে মহাদেশটি এখন আর সুদূর নহে। বলা যায়, ভাইরাসটির সহজ উপায়ে ছড়াইয়া পড়া ও তাহার মারণরূপের কারণেই বিশ্বব্যাপী ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করিতে বাধ্য হইয়াছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। অতীতে সার্স ও মার্স রোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ‘সতর্কতা’ জারি করা হইয়াছিল বটে, কিন্তু একেবারে ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা’ জারির নজির খুব বেশি নাই। হু মনে করিতেছে, আফ্রিকায় এই মহামারী যেরকম দ্রুত ছড়াইতেছে তাহা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। হু তাই এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝাইতে এবং তাহা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার গোচরে আনিতেই জারি করিয়াছে ‘জরুরি অবস্থা’।
চিকিত্সা বিজ্ঞানের দীর্ঘ ইতিহাসে ইবোলা ভাইরাসের এহেন সংক্রমণের নজির আর নাই। ভাইরাসটি প্রথম ধরা পড়িয়াছিল ১৯৭৬ সালে, কঙ্গো ও সুদানে। সেইসময় প্রায় সাতশত মানুষের মৃত্যু হইয়াছিল ইবোলার আক্রমণে। কিন্তু এবার মৃত্যুর সেই সংখ্যাটি ছাড়াইয়া গিয়াছে বহু আগেই। হাজারের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু ছাড়াও সংক্রমণের সংখ্যা পৌনে দুই হাজার। গিনিতে গত মার্চে প্রথম ইবোলা ধরা পড়িবার পর দ্রুতই পাশের দেশগুলিতেও ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ভাইরাসটির মূল বাহক ফলখেকো বাদুড়, যাহার অভাব নাই আমাদের দেশেও। বাদুড় ভাইরাসটির বাহক মাত্র, নিজেরা আক্রান্ত হয় না। কিন্তু ওই বাদুড় হইতেই বিভিন্ন প্রাণীর দেহে রোগটি সংক্রমিত হয়। তাহার পর আক্রান্ত প্রাণী বা মানুষের রক্ত বা দেহরস (যেমন হাঁচি, কাশি) হইতে ভাইরাসটি ছড়াইয়া পড়ে অন্য মানুষের শরীরে। ভয়াবহ কথা হইল, হু বলিতেছে—ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ। যেহেতু প্রতিকারের ব্যবস্থা নাই, তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থাই একমাত্র উপায়। কিন্তু বিপদ আরও রহিয়াছে। আক্রান্ত ব্যক্তি হইতে সংক্রমণ রুখিতে রোগীদের আলাদা করিয়া রাখিবার (আইসোলেশন) ব্যবস্থা আবশ্যক। সেই আইসোলেশন চেম্বার হইতে হইবে অত্যন্ত উঁচু স্তরের। তাহা আমাদের নাই।
আফ্রিকার যেসব দেশে এই ঘাতক ভাইরাসটি প্রায় হাজার জীবন কাড়িয়া লইয়াছে সেসব দেশের অনেকেই নিয়মিত আমাদের দেশে যাতায়াত করেন। সেসব দেশে বাংলাদেশের নাগরিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী কর্মরত রহিয়াছেন। অথচ ইবোলা ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে সামান্য হাঁচি-কাশি ছাড়াও সংক্রমণের ভয় থাকে আক্রান্তের মৃতদেহ হইতেও। এই কারণেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি সমপর্কে জানা এবং ইহার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্বের সুযোগ নাই। বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে এই ভাইরাসটি প্রতিরোধের যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগও গ্রহণ করিতে হইবে অতিসত্বর।
