পাহাড়ে আবারও আনন্দ। শূন্যতা হলো পূরণ। রাজা পেলো নতুন রানি। সেই সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর পর নতুন রানি বান্দরবানের মেয়ে ইয়ান ইয়ান পেলো চাকমারা। চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় এবং রানি ইয়ান ইয়ানের এই রাজবিয়ে নিয়ে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। আর তাই এই প্রজন্মের জন্য রাজা, রানি এবং রাজবিয়ের গল্প তুলে ধরেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি
স্ত্রী বিয়োগের দেড় দশক পর আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। আর নতুন রানি হলেন বান্দরবান শহরের উজানীপাড়ার মেয়ে ইয়ান ইয়ান। ইয়ানের বাবা দীর্ঘদিন ইন্দোনেশিয়া দূতাবাসে চাকরি করেছেন, সেই সূত্রে ইয়ানের পড়াশোনাও ঢাকায়। হলিক্রস কলেজের মেধাবী এই ছাত্রী হূদয় জয় করে নিলেন রাজা দেবাশীষ রায়ের। বান্দরবানের মেয়ে হিসেবে বোমাং রাজ্যের বাসিন্দা ইয়ান এবার রাজ্য বদল করে চাকমা রাজ্যে প্রবেশ করেছেন তাও আবার রাজবধূ হিসেবে। নতুন রানি হলিক্রস কলেজ থেকে পাস করার পর স্কলারশিপ নিয়ে ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া যান, সেখানে ভালো ফলাফল করায় পিএইচডির সুযোগ পান। বর্তমানে সেখানেই অধ্যয়নরত আছেন। এক সঙ্গে কাজ করার সুযোগে দুজন দুজনের কাছাকাছি আসেন। এবং রাজার একাকী জীবনে নতুন খুশির বার্তা নিয়ে আসেন রানি ইয়ান ইয়ান। প্রথম ফেসবুকের মাধ্যমে রাজার নতুন বিয়ে সম্পর্কে জানতে পেরে গোটা পাহাড়ি মানুষজনের মাঝে উত্ফুল্ল ভাব ছড়িয়ে পড়ে। অভিনন্দনের জোয়ারে তখন থেকেই ভাসছিল দুজনেরই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।
চাকমা রাজ ঐতিহ্য
চাকমা সমাজের প্রধানতম ব্যক্তি হলেন রাজা। প্রাচীনতম রাজা হলেন অতীতবাহন, তিনি ১১৯৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা ছিলেন। ইতিহাস মতে, যাদের পদবি ধামেই বা ধাবেং, চেগে এবং খীসা থাকত, তাদের মধ্যে থেকেই কেউ একজন রাজা নির্বাচিত হতেন। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে ধবেং বা ধামেই ও চেগে পদবি দুটিকে বাদ দিয়ে সৃষ্টি করা হয় দেওয়ান পদবি। পরবর্তীতে দেওয়ান ও খীসা পদবির মর্যাদাবান ব্যক্তিরা রাজা হতেন। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে রাজা ধরমবক্স খানের মৃত্যুর পর প্রথম স্ত্রী রানি কালিন্দী রাজত্বের অধিকারী হলে দেওয়ান পদবি বাদ দিয়ে তালুকদার পদবি চালু করেন। কালিন্দীর মৃত্যুর পরে ধরমবক্সের তৃতীয় স্ত্রী হারি বিবির সন্তান হরিশচন্দ্র রায় বাহাদুর রাজা হন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার তাকেই রাজা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। বর্তমান রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় তাদেরই উত্তরসূরি। দেবাশীষ রায়ের পিতা ৫০তম চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়, মাতা আরতি রায়। দেবাশীষ রায় চাকমা সার্কেলের ৫১তম রাজা। ১৯৭১ সালেই রাজার দায়িত্ব পান দেবাশীষ রায়। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি বর্তমানে চাকমা সার্কেলের দায়িত্বের পাশাপাশি জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী সদস্যের দায়িত্বে আছেন। এ ছাড়া আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, আদিবাসীদের সমাজ-সংস্কৃতি, প্রথা, রীতি-নীতি, আদিবাসীবিষয়ক আইন নিয়ে গবেষণার কাজ করে যাচ্ছেন। এ সংক্রান্ত তার বহু বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রেমের পরিণতি
গত ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার এডিলেডে বিয়ের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতার কাজ শেষ করেন রাজা-রানি। আর এ সংবাদটি রাজা নিজেই সবাইকে জানান ফেসবুকের মাধ্যমে। রানি ঢাকার হলিক্রস কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বর্তমানে এডিলেডে অবস্থান করতেন। সেখানেই কাজের মাধ্যমে পরস্পরের কাছাকাছি আসা। দীর্ঘদিন প্রেমের এক পর্যায়ে স্মরণীয় করে রাখতে ১২ ডিসেম্বর তারিখটি বেছে নেন তারা। বিগত সময়ে প্রায়ই সুন্দর মুহূর্তগুলো ফেসবুকে আপলোড করতেন রাজা-রানি। আর সময় পেলেই রাজা অস্ট্রেলিয়ায় ছুটে যেতেন ইয়ানের কাছে। প্রিয়তমকে দেখতে ইয়ানও মাঝে মাঝে চলে আসতেন রাঙামাটিতে। সুযোগ পেলে কাপ্তাই হ্রদে দু’জনে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতেন। আর এ বেড়ানের সুন্দর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাতে বন্দি করে ফেসবুকে আপলোড করতেন। বিয়ে অনুষ্ঠানে রাজার ড্রেস ছিল কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট ও কালো কোট। আর রানির পোশাক ছিল ফুল বসানো বিয়ের গাউন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজা-রানি চার দেয়ালের বাইরের অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি উপভোগ করেন। ঘুরে বেড়ান পুকুরপাড়। ফেসবুকে এ খুশির খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজা-রানির হাজারো বন্ধু, সহকর্মী ও ভক্তরা নতুন দম্পতিকে অভিনন্দন জানান।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা
অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত ৪ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজবাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারেন রাজা দেবাশীষ। রাজা দেবাশীষ রায়ের বিবাহ উপলক্ষে রাজবাড়ি এলাকা সাজে বর্ণাঢ্য সাজে। বিয়ের আনন্দে মেতে উঠে পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালিরা। বিয়ে উপলক্ষে রাজবাড়িতে নামতে শুরু করে হাজারো মানুষের ঢল। সকালে বান্দরবান শহরের উজানী পাড়ায় কনে ইয়েন ইয়েনের বাসায় রাজকীয়ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়। চাকমা রাজা সকালে বর যাত্রী নিয়ে রাঙামাটি থেকে বান্দরবানে যান। বিয়ের প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর গুরুজনদের উপস্থিতিতে কন্যা সম্প্রদান করা হয়। বিকেলে কনে ইয়েন ইয়েন তার বাবা মহেশখালীর বাসিন্দা উমং রী এবং মা বান্দরবানের বাসিন্দা দপু ম্যা খাইনসহ কনের পক্ষের লোকজন রাঙামাটির রাজার নিজ বাড়িতে আসেন। এর পর সন্ধ্যায় চাকমা রাজ দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। রাঙামাটি শহরের রাজদ্বীপ এলাকার রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে বিশেষভাবে নির্মিত একটি যদনঘরে (বিবাহমঞ্চ) সন্ধ্যা ৭টা ৪২ মিনিট থেকে ৮টা ১৫ মিনিট সময়ের শুভক্ষণে আদিবাসী চাকমা সামাজিক রীতিতে রাজা দেবাশীষ রায় ও রানি ইয়ান ইয়ানের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। রাজা দেবাশীষ রায় এবং নতুন রানি ইয়ান ইয়ান মঞ্চে আসন গ্রহণের পর চাকমা ‘ওঝা’ উপস্থিত সবার অনুমতি নিয়ে ‘চুমলং’ বা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। বর ও কনে পরস্পরকে ডিম ও পান খাইয়ে দেন এবং রাজা রানির হাতে আংটি পরিয়ে দেন। এ সময় ঐতিহ্যবাহী রীতিতে উপস্থিত স্বজন ও প্রজাদের অনুমতি নিয়ে একটি কাপড় দিয়ে রাজা দেবাশীষ রায় ও রানি ইয়ান ইয়ানকে একসঙ্গে কোমর বেঁধে হয় দেওয়া হয়। বর ও কনেকে জোড় বেঁধে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলে যদনবানা। তারপর আবারও সবার অনুমতি নিয়ে দুজনের কোমরে বাঁধা কাপড় খুলে দেওয়া হয়। এভাবে বর ও কনে সংসার জীবন শুরুর সামাজিক অনুমতি লাভ করেন। চাকমা রাজার বিয়ে উপলক্ষে দেশি-বিদেশ প্রায় ৪ হাজার আমন্ত্রিত অতিথি আপ্যায়িত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত চাকমা রাজার বিয়ের অনুষ্ঠানে গণ্যমান্য ব্যক্তি ও প্রজা ছাড়াও বিদেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরাও যোগ দেন। রাত ৮টা থেকে শুরু হয় আমন্ত্রিতদের প্রীতিভোজ। রাঙামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, জেলা প্রশাসক মো. মোস্তফা কামাল, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, হেডম্যান, কারবারিসহ পাহাড়ের বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন বিয়েতে।
বর্তমান রাজপরিবার যেমন
রানিহীন সঙ্গ আর রাজার এত বড় সংসার দেখে অবাক হতেন পাহাড়ের মানুষ। তারা একজন রানির প্রয়োজন অনুভব করতেন। কিন্তু রাজা দীর্ঘ ১৫ বছরেও রানির শূন্যতা অনুভব করেননি। ১৯৯৮ সালে ১৫ নভেম্বর প্রথম স্ত্রী রানি তাতু রায়ের মৃত্যু হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রাজা। নতুন রানির কথা চিন্তা না করে ১৫টি বছর পুত্র যুবরাজ ত্রিভুবন আর্যদেব রায় ও রাজকুমারী আরাধনা আয়ত্রী রায়কে মানুষ করতে মনোযোগী ছিলেন তিনি। সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সার্কেলের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পৃথিবীর অনেক দেশ, অঞ্চল ও দুর্গম পার্বত্য এলাকা সফর করা চাকমা রাজা ভ্রমণপিপাসু হিসেবে পরিচিত। ব্রিটেন থেকে বার এট ল ডিগ্রি নেওয়া রাজা আইনপেশায়ও নিয়োজিত। দুই সন্তানকে কোনোদিন মায়ের শূন্যতা বুঝতে দেননি রাজা। তাদের আগলে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন। বর্তমানে আর্যদেব কানাডার সেন্ট মেরি ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচলর অব আর্ট প্রোগ্রামে অধ্যয়ন করছেন আর আয়ত্রী ভারতের তামিল নাডু’র কোডানিক্যাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে এইচএসসি সমমান ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে অপেক্ষা করছেন। ২০০৩ সালে রাজ পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্যদেবকে যুবরাজ এবং আয়ত্রীকে রাজকুমারী ঘোষণা করেন রাজা দেবাশীষ রায়। কিন্তু ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বরে এসে রানির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন রাজা। তাই আবদ্ধ হলেন বিবাহে। পূরণ করলেন শূন্যতা। এ শূন্যতা পূরণের মাঝে রাজা পেলেন নতুন স্ত্রী আর পাহাড়ের মানুষ পেলো এক নতুন রানি।
