চাই বিশ্বাস, সততা, স্বচ্ছতা...

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৫৩
মনের মাঝে রোপিত হয় ভালোবাসার বীজ, সেই মন নিয়ে আমরা কতটা সচেতন? বুঝতে কী পারি তার ভাষা? ভালোবাসার নানা দিক, সম্পর্কের আদবকেতা এবং তার প্রথম প্রেমের গল্প জানিয়েছেন দেশের খ্যাতিমান একজন মনোচিকিত্সক এবং কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র শুরু খুব শৈশব থেকেই খুব শৈশবে যখন বুদ্ধিদীপ্তির অনুষঙ্গগুলো পাখা মেলে, তখন থেকেই এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয় আমাদের মাঝে। সেটা হতে পারে বাবা-মায়ের সাথে, হতে পারে সমবয়েসীদের প্রতি। এই সময়টা ৭ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যেই হয়ে থাকে। এরপর ছেলেমেয়েদের মাঝে হঠাত্ করেই একটা দৈহিক এবং মনোজাগতিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আমাদের দেহের হরমোন গ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়, আর ভালোবাসা, ভালোলাগার আবেগগুলো আমাদের মাঝে সক্রিয় হয়। সবে কৈশোরে পা দেওয়া সেই বয়সটাতে সবকিছুতেই রাজ্যের আগ্রহ জন্মে, অজানাকে জানার জন্য, কল্পনার রাজ্যে ঘুরে বেড়ানোর জন্য মন থাকে উন্মুখ হয়ে। কৈশোর, আবেগ যখন উত্তাল ঢেউয়ের মতো কিশোর বয়সের এই ভালোবাসার পেছনে কোনো যুক্তি দাঁড় করানো যায় না আদৌ। একজন ছেলের যেকোনো কিছুতে একটা মেয়ে আকৃষ্ট হতে পারে, তেমনি মেয়েদের ক্ষেত্রেও! শুধু দৈহিক সৌন্দর্যই নয়, যেকোনো দক্ষতার বিষয় এখানে চলে আসে। দেখা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে, বাইরে গিয়ে দেখা করতে ইচ্ছে হয়, কখন এই সময়টা চলে যায় তাও টের পাওয়া যায় না। আর এই সময়ে এই অস্থিরতাই আমাদের গ্রাস করে ফেলে। বাবা মায়ের শাসনে বাঁধা পড়ল যখন একটা পর্যায়ে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের খবরাখবর বাবা-মায়ের কানে যায়। তারা কিছুতেই মেনে নিতে চান না সন্তানের এই চালচলন। তারা তখন বাধা দেয়, মেয়েকে ঘরে আটকে রাখে, ছেলের উপরেও আসে কঠোর অনুশাসন। ছেলেমেয়েদের তখন অতি কাছের বাবা-মাকেও নিষ্ঠুর মনে হয়। তারা মনে করে, বাবা-মা তাদের পছন্দের মানুষটা থেকে দূরে রাখতে চায়। বাবা-মায়েরাও বুঝতে চান না, তার ছেলেমেয়ের এই যে ভালোলাগা ভালোবাসা, সেটাতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই, এটা তারা ইচ্ছে করেই জড়িয়ে যায়নি, প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে একের প্রতি অন্যের এই মুগ্ধতা। হুট করে ঘরে আটকে রেখে উত্তাল সাগরে বাধ দিতে যাওয়ার বোকামির মতো কোনো মানে নেই। তাদেরকে সময় দিতে হবে, বুঝতে দিতে হবে সে কী করছে, ছেলে বা মেয়েটা ভালো না মন্দ, আপনার কথাতে তারা মানবে না, তাদেরকে সময় দিন বুঝতে, প্রয়োজনে নিজেরাই কথা বলুন তাদের সাথে। তখনই বাবা-মাকে আপন মনে করে ছেলেমেয়েরা। ভালোবাসায় চাই বিশ্বাস, সততা, স্বচ্ছতা কৈশোরের এই ভালোবাসা দেখা যায় খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যে কোনো কারণেই হোক পরিবর্তন হতে পারে মনের মানুষের। সেটা বয়স বাড়ার পরেও হতে পারে। আগেই বলেছি, শুরুতে প্রেম মানেই তীব্র আবেগ, উত্তাল ঢেউ, কাজেই সেই জোয়ারে ভাটা আসবেই, তার মানে এই নয়, সব প্রেম আবেগ হারিয়ে যায়, আগের সেই উচ্ছ্বাসটা হয়তো কমে যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত, প্রিয়জনের সাথে প্রথম চার বছর যে ভালোলাগা বা তীব্র আবেগ থাকে, এরপর অতটা থাকে না। বিশ্বাস হারালে, মিথ্যা বলে কিছু এড়িয়ে গেলে কখনোই সেই সম্পর্কে পূর্ণতা আসে না। হতাশা নয়, চাই নিজের উপর বিশ্বাস আপনি কাউকে সত্যিই ভালোবাসেন, আর তাকে সম্মানটুকু দেবেন না? তার অন্য ভালোলাগা থাকতে পারে, নিজেকে জাহির না করে বরং তার পছন্দকে সম্মান দিন, দেখুন এতেই আপনার উদারতা প্রমাণ হবে তার কাছে। জোর করে তো আর ভালোবাসা হয় না, হয়তো অন্য কেউ আপনাকে ভালোবাসে, তাকে সম্মান দিন, সে-ই এই পৃথিবীতে আপনাকে সবচেয়ে বেশি সুখী করতে পারে। আর ঠিক একই কথা প্রযোজ্য সম্পর্কের ভাঙ্গনের বেলায়। যদি কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করে, দেখুন আপনার দোষ আছে কি না, যদি খুঁজে পান, সেটা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করুন, সে ফিরে আসবেই। আর যদি না পান, ধরে নেবেন, আপনিই বেঁচে গেছেন তার কাছ থেকে, সে আসলে আপনাকে ভালোবাসত না! নিজের উপর বিশ্বাস আনুন, হতাশা নয়, নিজেকে ভালোবাসার মানুষটির জন্য যোগ্য করে তুলুন, দেখেন, সে নিশ্চয়ই একদিন আসবে... আমার প্রথম প্রেম ক্লাস ফোরে থাকতে এক মেয়েকে খুব ভালো লাগত, তার জন্য দেখা যেত স্কুল শেষে অপেক্ষা করতাম, এক সাথে বাড়ি ফেরা... অনেক কিছুই মনে আছে আমার। তবে সেটা হয়তো নিছক ভালোলাগাই ছিল। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর আর যোগাযোগ হয়নি। এরপর মেডিকেল কলেজে পড়তে এসে নিচের ব্যাচের এক মেয়ের সাথে সখ্যতা ল্যাবে বসেই, আরেক বন্ধুর মাধ্যমে। পরে সে অন্য মেডিকেলে চলে গেলেও সেই সময়ের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগটা ছিলই। কে জানত? লাবের শ্যাম বর্ণের চশমাপরা যেই মেয়েটার সাথে সেদিন চোখে চোখে কথা হয়েছিল, তারাই ভালোবসে ঘর বেঁধেছেন, সততা, স্বচ্ছতা, আর বিশ্বাস আমাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে গেছে, দিয়েছে পূর্ণতা।