প্রেমের সেকাল, একাল

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৫৩
সাহস রতন নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিলো পায়ে, প্রেমের কী সাধ আছে বলো? কিংবা, প্রেমের মরা জলে ডোবে না। অথবা প্রেমময় প্রেম সাগরে প্রেমের মানুষ ভেসে যায়। বা পেয়ার কে লিয়ে সালা কুছ ভি কারেগা। প্রেম নিয়ে এমন হাজারো কথামালা ছড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক জীবনে। কিংবা অন্যভাবে বলা যায় প্রেম বিষয়ক এমন সব রূপক কথামালা জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনের সাথে, সেই অনাদিকাল থেকে। প্রেম ছাড়া মানবজীবন নিরর্থক, অসম্পূর্ণ। হিন্দি একটি ছবি দেখেছিলাম— ‘পেয়ার তো হোনা হি থা’। এ কথাটা মনে হয় সবার জীবনেই সত্য। জীবনের বিশেষ একটা মুহূর্তে প্রেম আসেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি এমন কাউকে পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে তিনি অসম্পূর্ণ মানবসন্তান। প্রেমের নানা প্রকারভেদ রয়েছে। রয়েছে স্থান-কাল-পাত্র ভেদাভেদ। গ্রামীণ বা শহুরে প্রেমেরও রয়েছে আলাদা আবেদন। প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে প্রেম আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম যেমন এক নয়। তেমনি সন্তানের জন্য বাবা-মার প্রেমের সাথে শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের প্রেমের তুলনা চলে না। কিশোর বয়সের প্রেম আর পরকীয়া প্রেম দুটোই ভীষণ একরোখা। তবে প্রেমই শেষ কথা। কারণ, শুধু একদিন ভালোবাসা (প্রেম) মৃত্যু যে তারপর, তাও যদি হয়, আমি তা-ই চাই, তা-ই যদি পাই। চাই না বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর। প্রেম নিয়ে রচিত হয়েছে হাজারো উপাখ্যান। লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চণ্ডীদাস-রজকিনী, রোমিও-জুলিয়েট, এসব কাহিনী নিয়ে অসংখ্য গল্প-কবিতা এমনকি সিনেমাও হয়েছে। জটিল সব পরকীয়া প্রেমের কাহিনী নিয়ে হাটে-বাজারে চটি সাহিত্যও অনেক সময় চোখে পড়ে। তবে আমার মনে হয়, এত সব প্রেমের মধ্যে সবচেয়ে জটিল ও কঠিন প্রেম হলো—ক্ষমতার প্রতি প্রেম। হোক সেটা রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রধান বা দলীয় প্রধানের ক্ষমতা। কোনো সমিতি প্রধানের ক্ষমতাও কম না। মোদ্দা কথা হলো ক্ষমতার প্রতি প্রেমের কাছে আর সব প্রেম মার খেয়ে গেছে। আগেরকার দিনে প্রেম নিয়ে বেশ লুকোচুরির একটা ব্যাপার ছিল। প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে, আমারই দুয়ার প্রান্তে, সে তো হায় মৃদু পায় এসেছিল পারিনিকো জানতে। ফলে ‘ভালোবাসি’ বলতেই দীর্ঘ সময় বয়ে যেত। দূর থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য একটু দেখা বা পাশাপাশি চলতে একটু মৃদু স্পর্শ, ব্যস ওতেই কয়েক দিন হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো যেত। স্কুল ছুটির পর প্রেমিকা যে পথে বাড়ি ফিরবে সেপথের কোথাও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা তো ছিল সাধারণ ব্যাপার। ডেয়ারিং টাইপের প্রেমিক হলে, প্রেমিকা সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে হ্যারিকেনের আলোয় পড়ছে, ওখানে গিয়ে চিঠি ছুড়ে দেওয়া। বিকেলে পাশপাশি বাসার ছাদে উঠে অভিভাবকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইশারায় কথা বলা। বা চিঠি লিখে সে কাগজ দিয়ে এরোপ্লেন বানিয়ে পাশের ছাদে ছুঁড়ে মারা। চিঠি লিখে তা প্রেমিকার বইয়ের পাতায় গুঁজে দিতে গিয়ে কত প্রেমিক যে ধরা খেয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সে সব দিনে প্রেমিকাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া মানেই নির্ঘাত বকুনি খাওয়া। তারউপর বাবা-মাকে বলে দেওয়ার ধমকিও সাথে থাকত উপরি হিসেবে। প্রেমের প্রস্তাব করার ক্ষেত্রে একটা কমন ব্যাপার ছিল, চিঠি লেখা। নানারকম কায়দা-কানুন মেনে সেই চিঠি লেখা হতো। অনেক ধরনের উপমা দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার চেহারা বা প্রকৃতির বর্ণনাসম্বলিত সেসব চিঠি ছিল হাই ভোল্টেজ সাহিত্যকর্ম। এই ধরনের চিঠি লেখার কায়দা ও ভাষার বর্ণনাসহ এক ধরনের বইও তখন বাজারে কিনতে পাওয়া যেত। বইয়ের ভাষায় চিঠি লিখে উল্টো প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার ঘটনাও ঘটত কদাচিত। তেমনই একটা কাহিনী এই মুহূর্তে মনে পড়ল। আমি তখন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। থাকি হলে। আমার এক রুমমেটের বেয়াইন তার প্রেমে পড়েছে। তখন শীতকাল। খুব ঠাণ্ডাও পড়েছে সে বছর। তো সেই কড়া শীতের দিনে বন্ধুর নামে এল রঙিন খামের চিঠি। যথারীতি বন্ধুটির অনুপস্থিতিতে সেই চিঠি খোলা হলো। দল বেঁধে পড়তে বসল রুমের সবাই। চিঠির শুরুটা ছিল অনেকটা এরকম— ‘চৈত্রের এই খরদুপুরে কাঠাফাটা রোদে চিকচিক করছে আকাশ বাতাস। ঠিক এমন এক কঠিন সময়ে তোমার কথা খুব মনে পড়ল। তাই দুকলম লিখতে বসলাম।’ বুঝেন অবস্থা! মাঘ মাসের শীতে চৈত্রের বর্ণনা দেওয়া চিঠি। এই চিঠির পর প্রেম আর বেশিদূর এগোয়নি। ১৯৭৬ সালের কথা। তাও আবার অজপাড়া গাঁয়ের স্কুল। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়কার একটা ঘটনা। সহপাঠীর প্রেমে পড়ল আমার এক বন্ধু। মেয়েটির বাবা ব্যবসায়ী, থাকে শহরে। শুনেছি ভীষণ মেজাজী মানুষ। ধরা পড়লে রেহাই নেই। কিভাবে কী করা যায়? আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে চালু মেয়ে দিলুর শরণাপন্ন হলাম। ও এরই মধ্যে বিখ্যাত প্রেমিকা। বলল, একটা চিঠি লেইখ্যা দে। আমি অরে দিয়া দিমু। দু’দিন বাদে বন্ধুটি চিঠি নিয়ে এল। দিলু সে চিঠি টিফিন পিরিয়ডে মেয়েটির বইয়ের পাতার ভাঁজে রেখে দিল। কিছু কথাও মনে হয় বলল। টিফিনের পর দেখি মেয়েটি কাঁদছে। এই বুঝি মেয়েটি হেডস্যারকে বলে দেয়। ভয়ে আমার বন্ধুর অবস্থা তো কাহিল। কাউকে কিছু না বলে কোনো এক ফাঁকে স্কুল থেকে চলে গেল। তিন দিন দেখা নেই। এই তিন দিন মেয়েটিও স্কুলে এল না। সহপরিকল্পনাকারী হিসেবে আমি নিজেও একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম প্রথম দু-একদিন। এই নিয়ে অবশ্য আর কোনো মাতামাতি হয়নি। তো এই ছিল সেসময়ের প্রেমের ব্যাপার-স্যাপার। তবে একটা কথা বলতেই হয়, পুরোনো দিনে প্রেমের ব্যাপারটা ছিল পুরোপুরি মানসিক। আর এখন প্রায় পুরোটাই শারীরিক। এখন দিন বদলেছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় এসব লুকোচুরির দিন শেষ। এখন ভালোবাসি বলতে খুব বেশি সময় নেয় না নতুন প্রজন্ম। আজকাল সব কিছুই দ্রুত পেতে চায় সবাই। সেটা অর্থ-সম্পদ বা প্রেমিকার ভালোবাসা, যাই হোক। ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম নিবেদন করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করার মতো সময় নেই কারো। তাই কাউকে ভালো লাগলে সরাসরি ফেসবুক বা এসএমএস-এর মাধ্যমে বলে দিচ্ছে—হাই বেবস্। আই লাভ ইউ। ইদানীং প্রেম শুধু মনের মন্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অতি দ্রুত তা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মন থেকে শুরু হয়ে যে প্রেম শরীর পর্যন্ত গড়ায় সেটাই নাকি সবচেয়ে গাঢ় প্রেম। প্রথম প্রেমে পড়লে মনে হয়, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। বন্ধু-বান্ধব সবাইকে বলে বেড়ায়—ম্যায়নে পেয়ার কিয়া। কিন্তু ছ্যাঁকা খাওয়ার পর মনে হতে পারে, ম্যায়নে পেয়ার কিউ কিয়া? প্রেম বড় মধুর, কভু কাছে কভু সুদূর। কখনও জীবনে ফুল ফোটায়। কখনও বা কাঁদিয়ে চলে যায় বহুদূর। তখন পুরোনো প্রেমের কথা ভেবে ভেবে কিছুটা সুখ খুঁজে নিতে হয়। প্রেম যদি করতেই হয় তবে বড় প্রেমই করা উচিত। আসুন সবাই বড় প্রেমে মগ্ন হই। কারণ বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়। দূরে থাকলে আর যাই হোক, অনাহুত কিছু ঘটবে না। শান্তিতে থাকা যাবে। লেখক :উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী