শ্রাবণের নীল আকাশে সাদা মেঘের খেলা। কখনো জমাট-আবার কখনো হালকা বাতাসে দলছুট হয়ে পাগলা ঘোড়ার মত উত্তরে দাঁড়ানো আকাশছোঁয়া বিশাল খাসিয়া পাহাড়ে গিয়ে আঁছড়ে পড়ছে। আর তারই প্রতিবিম্ব সুনামগঞ্জের বিশাল টাংগুয়ার হাওরে যখন ফুটে উঠে তখন বিস্মিত হতে হয় যে কাউকেই।
এবারের ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য পাহাড় ও হাওরের জলরাশি তার নিচে জলজ উদ্ভিদ দেখতে হাজারো পর্যটক ছুটে চলেছেন, ঘুরছেন টাংগুয়ায়। টাংগুয়ায় শীতে এক রূপ, বর্ষায় অন্যরূপ। এই ভরা বর্ষায় হাওরের নীল পানিতে অর্ধডোবা হিজল-করছ গাছের পরশে কেউবা নৌকায়, কেউবা স্পিডবোটে ঘুরছেন আপন মনে বৃক্ষলতার সাথে মিতালী করতে করতে।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার সুনামগঞ্জের টাংগুয়াকে কেন্দ্র করে এখানে টেকেরঘাট ও বারেক টিলায় পর্যটনশিল্প গড়ে উঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে না, স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, তবু পর্যটকরা কষ্ট করে হলেও ছুটে আসেন এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে।
সুনামগঞ্জ হাওরপ্রধান জেলা। বড় বড় হাওর শীতে শুকিয়ে গেলে সবুজ ফসলে ভরে যায়। আর বর্ষায় হাওরগুলো পানিতে ভরে গিয়ে মাছের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। বর্ষায় বিশাল হাওরে সাগরের মত ঢেউ। শীতকালে কুয়াশা ঢাকা প্রান্তরে অতিথি পাখির কলকাকলী। এক নয়নাভিরাম দৃশ্যপটের টাংগুয়াকে ঘিরে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারেরও প্রতিশ্রুতি ছিল এখানে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার। সুন্দরবনের পরেই এটি দ্বিতীয় রামসার সাইট। হাওরটি দেশের ‘মাদার ফিশারি’ হিসাবে খ্যাত।
হাওরটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলা জুড়ে। উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। হাওরটির আয়তন প্রায় ৪ হাজার একরের মত । বর্ষাকালে এর আয়তন দাঁড়ায় ২০ হাজার একরের বেশি। শীত যত বাড়ে অতিথি পাখির আগমনও বাড়ে। ‘‘টাংগুয়ায় এখন আগের মত আর পাখি আসে না, বিশাল হাওরটি মাছ শূন্য হয়ে যাচ্ছে শিকারীদের অত্যাচারে।
সিলেট বিভাগের বিখ্যাত টাংগুয়া, হাকালুকিসহ অসংখ্য হাওর ও জলাশয়ে শীতের শুরুতেই দলে দলে আসতে থাকে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি। সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ অনেক দেশ থেকে আসে এসব অতিথি পাখি। বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক, কানা বক, লেঞ্জা, সরালি, মাছরাঙ্গা, গাংচিলের পাখার ঝাপটায় জলাশয়ে ঢেউয়ের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। ‘‘নয়নাভিরাম টাংগুয়া দেশের অনন্য সম্পদ। এটিকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে,’’ বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধূরী এই প্রতিনিধির সাথে আলাপচারিতায় বলেন, ‘‘দেশে এমন সম্পদ সত্যিই বিরল ও মনোমুগ্ধকর।’’ তিনি গত ৩ আগস্ট রবিবার টাংগুয়ার হাওর পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা শত শত তরুণ-তরুণীকে আসতে দেখে অবাক হয়েছেন।
৫১টি বিল সমন্বয়ে হাওরটি দেশের ‘মাদার ফিশারিজ’ হিসেবে খ্যাত। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইটের মর্যাদা লাভ করে এই টাংগুয়ার হাওর। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় এর অবস্থান। স্থানীয়দের কাছে ‘নয় কুড়ি বিল আর তের কুড়ি কান্দা’ হিসেবে পরিচয় এ হাওরের। এগারো কিলোমিটার দৈর্ঘ ও সাত কিলোমিটার প্রস্থের মধ্যে ৫১টি বিল সমন্বয়ে হাওরটি দেশের মাদার ফিশারিজ হিসেবে খ্যাত। হাওর পাড়ের ৮৮টি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা এ হাওরকে ঘিরে। টাংগুয়ার হাওরে ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণি, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি, ২১ প্রজাতির সাপ এবং ২০৮ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এই হাওরে আছে দুর্লভ প্রজাতির প্যালাসিস ঈগল পাখি।
কর্মসংস্থানে সুযোগ
অপার সম্ভাবনাময় টাংগুয়ার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হাতছানি দেয় প্রতিনিয়ত। ‘‘টাংগুয়াকে ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এগিয়ে এলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হতো ,’’ মন্তব্য করে সুনামগঞ্জ জেলা বারের সভাপতি এডভোকেট রবিউল লেইস রুকেশ বলেন ‘‘বেকারদের কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ হবে। তিনি বলেন ‘‘এখানে রাস্তাঘাটের অবস্থা দশ বছর আগে যে রকম দেখেছি, আজ তার চেয়েও খারাপ দেখলাম। মনে হয় এর কোন অভিভাবক নেই।’’ বারেক টিলায় গড়ে উঠতে পারে হোটেল-মোটেল:টেকেরঘাটের যুব সংঘের সাবেক সেক্রেটারি উইনস্টন সলমার ইত্তেফাককে বলেন, ‘‘উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটছে না।,” তিনি মনে করেন ‘‘জাদুকাটা নদীর তীরে ৭শ ফুট উঁচু বারেক টিলা, টেকেরঘাট ও টাংগুয়ায় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত।”
টাংগুয়া ঐতিহ্য হারাচ্ছে, রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন
২০০৫ সালে জেলা প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন দ্য ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন ইউনিয়ন যৌথভাবে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে আজও এর সুফল আসছে না। ক্রমাগত কমছে পরিযায়ী পাখি ও মাছ। হাওর পারের মানুষেরা বলেন, টাংগুয়া ঐতিহ্য হারাচ্ছে এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত দিক থেকে ঝুঁকিপুর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সরকারি ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা হয় টাংগুয়ার হাওরকে। সরকারের এই দেখাশোনার উদ্দেশ এখানকার জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, হাওরপাড়ের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। ২০০১ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় । পরে ভূমি মন্ত্রণালয় হাওরের মালিকানা হস্তান্তর করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নিকট। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ইজারা প্রথা বাতিল হয়ে এই হাওরের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে জেলা প্রশাসনের উপর। ২০০৫ সালে শুরু হয় সরকার, এনজিও এবং জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক বিশেষ কার্যক্রম। যাত্রালগ্নে এর বেশকিছু সফলতা আসলেও সেটি আর ধরে রাখা যায়নি। বর্তমানে টাংগুয়ায় মাছের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পাহারা আছে, মাছও লুট হচ্ছে
জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হাওরকে নিরাপদ মনে করে শীতে দ্বিতীয় রামসার সাইট টাংগুয়ার হাওরে হিজল কড়চবাগ, কান্দা ও জলাবনে এসে আশ্রয় নেয় এসব পাখি। কিন্তু পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও শিকারীদের অত্যাচারে পাখির সংখ্যাও কমে গেছে। বর্ষায় মাদার ফিশারিজ টাংগুয়ার আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার একরে। টাংগুয়ার হাওরটি সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ ছিলো জেলার অন্যান্য হাওরের মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। তাই এটির ইজারা প্রথা বিলুপ করে অভয়াশ্রম করা হয়। সারা বছর এখানে মাছধরা নিষিদ্ধ। সার্বক্ষণিক একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসারবাহিনী পাহারা দেয়। সারা বছর মাছধরা নিষিদ্ধ থাকায় টাংগুয়ার হাওরে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার কথা এবং পোনামাছ বিভিন্ন হাওরে প্রবেশ করে মাছের উত্পাদন বাড়ার কথা। ‘‘কিন্তু টাংগুয়া এখন নিজেই মাছশূন্য’’, মন্তব্য করে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আজরফ চৌধূরী বলেন,‘‘লুটপাটের ফলে সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’’ এলাকাবাসী বলেন, ‘‘সরকারি ব্যবস্থাপনায় এটি সঠিকভাবে রক্ষা হচ্ছে না।’’ তারা বলেন, এই সম্পদ রক্ষায় সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। এলাকার অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, কাগজে-কলমে টাংগুয়া সংরক্ষিত। কিন্তু রাতের আঁধারে নৌকাপ্রতি নজরানা দিয়ে মাছ যে লুটে নেয়া হয় তা ওপেন সিক্রেট।
বিরল পাখির সন্ধান
বহু আগে শীতকালে টাংগুয়ার হাওর পাখির কলকাকলীতে মুখর থাকতো। শীতের শেষে এলেই পরিযায়ী পাখি ফিরে যেতো নিজ দেশে। টাংগুয়ার সেই দৃশ্য হারিয়ে গেছে। তবে পাখি বিশেষজ্ঞরা টাংগুয়ার হাওরে বিরল কিছু পাখির সন্ধান পেয়েছেন কয়েক বছর আগেই। রেড ক্রেস্টেড পোচার্ড (লাল ঝুটি), পিন টেনল (ল্যাঞ্জা হাস), সভেলার (খুন্তে হাস), মালার্ড (নীলমাথা হাঁস), পিয়াং হাঁস (গাডওয়াল), ঠাফটেউ (টিকিহাঁস), কঁনপিগমি (ধলা বালিহাঁস). বেগুনি কালেম, ডাহুক, পান মুরগি, সরালি, রাজসরালি, পাতিমাছরাঙা, পাকড়া মাছরাঙা ও চখাচখির দেখা পেয়েছেন। পৃথিবীর বিরলপ্রায় প্যালসিস ঈগলের দেখা মিলেছে টাংগুয়ার হাওরে।
