লিবিয়ায় চলমান সহিংসতার মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা দেশটি ছেড়ে গেলেও দেশে ফিরতে নারাজ বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা। আর্থিক অসঙ্গতির কারণেই জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে থাকছে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক। সুদিনের আশায় তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায়। আর সরকারও এই মুহূর্তে বাংলাদেশি কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে বেশি আগ্রহী নয়। শুধু তাদের নিরাপদে থাকার পরামর্শই দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।
গত বছরের মাঝামাঝি লিবিয়ায় যান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ফারুক হোসেন। আফ্রিকার এই দেশটিতে যেতে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছিলো তার। এই টাকার অর্ধৈকের বেশিই ধার করেছিলেন তিনি। প্রায় এক বছর কাজ করে গরিব আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেয়া এই ধারের টাকা এখনো তুলতে পারেননি তিনি। তাই জীবন বাজি রেখে লিবিয়াতেই থাকতে চান ফারুক। শুধু ফারুক নন, তার সঙ্গে কাজ করা আরো প্রায় ৩০ বাংলাদেশি শ্রমিকেরও একই বক্তব্য।
ফারুক ‘ইত্তেফাক’কে জানান, প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনে খাওয়া-থাকা শেষে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার মতো জমাতে পারেন তিনি। যে কারণে খরচের টাকা এখনো তুলতে পারেননি। আর দেশে ফিরেই বা কী করবেন! সংসার আর ঋণের চাপের চেয়ে কষ্ট করে লিবিয়াতে থাকা ঠিক মনে করছেন তিনি। পরিস্থিতি ভালো হলে কাজটা অন্তত করতে পারবেন তারা।
আব্দুল হালিম নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে লিবিয়ায় নতুন করে ইসলামপন্থী ও কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ও গোষ্ঠীর সংঘর্ষ শুরু হয়। গত দুই মাসে সংঘাত ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ায় কাজ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আশেপাশে প্রায়ই ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশি-বিদেশিসহ অনেক লোক মারা গেছে। বাংলাদেশিরাও মারা গেছে। কিন্তু কি করবো! দেশে ফেরার উপায় নেই। দেশে ফিরে গেলে এখন সবাইকে পথে বসতে হবে। জানা যায়, লিবিয়াতে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা ফিরতে চাইছেন না।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারা গেছে ৭ বাংলাদেশি। লিবিয়ার সহিংস পরিস্থিতির কারণে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, চীন, ইন্দোনেশিয়া তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছে। ফিলিপাইনসের নাগরিকদের লিবিয়া ছাড়তে বলা হয়েছে। ফিরিয়ে আনা হয়েছে অনেক ভারতীয়কে। কিন্তু বাংলাদেশি কর্মীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কর্মীরা যেমন দেশে ফিরতে আগ্রহী নয়, সরকারও তেমনি তাদের জোর করে ফিরিয়ে আনতে রাজি নয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদে থাকতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, কেউ আসতে না চাইলে তাকে জোর করে আনা সম্ভব নয়। তবে কেউ দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে ফিরিয়ে আনাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা আর্থিক কারণেই দেশে ফিরে আসতে চাইছে না। এত শ্রমিক দেশে ফিরে আসলে তাদের ক্ষতিপূরণ বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কিংবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার লিবিয়াতে পাঠানোরও কোনো নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। তবে তারা সতর্কভাবে নিরাপদ জায়গায় থাকতে পারলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সেখানে কাজের ব্যবস্থা করে দিতে আমরা সবরকম চেষ্টা চালাবো।
তিনি বলেন, এর আগে ২০১১ সালে লিবিয়ায় সরকারবিরোধী সংঘাতের সময় প্রায় ৩৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে সে সময়ের চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। তাই আমরাও তাদের নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। বর্তমানে লিবিয়াতে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রয়েছে। লিবিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারো শ্রমিকদের পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।
তিনি বলেন, লিবিয়া ছাড়াও ইরাকে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখান থেকেও শ্রমিকরা ফিরে আসতে চাইছে না। তবে এই দুই দেশের জন্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা যাচ্ছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী গত আড়াই বছরে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়াতে গেছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গেছেন চার হাজার ৪৩৩ জন। বৈধ-অবৈধ সব মিলিয়ে দেশটিতে এখন প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন।
২০১১ সালে লিবিয়ার সাবেক একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে দেশটিতে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। সেদেশে তত্পর রয়েছে বহু সশস্ত্র গোষ্ঠী। প্রায়ই এসব গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে এবং সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।
