জটিল সংকটে তোবার মালিক, শ্রমিক

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৩৭
তোবা গ্রুপের ৫ কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের পরত্আপাত দৃষ্টিতে সংকট ‘মিটে গেছে’ বলে মনে হলেও কার্যত সংকট আরো গভীর হচ্ছে। কারখানাটি চালু রাখা বা বন্ধ করা প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটি আরো বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বেতন পরিশোধে জমিজমা ও মেশিনপত্র বিক্রি করে দেয়ায় কার্যত এখনই কারখানাগুলো চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু কারখানা বন্ধ করতে হলে আইনগতভাবে দেড় হাজার শ্রমিকের ‘সার্ভিস বেনিফিটের’ অন্তত তিন কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। বিজিএমইএ’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসের বেতন পরিশোধ করতে গিয়ে সব সম্পত্তি বিক্রি করেও দায় পরিশোধে আরো অন্তত অর্ধকোটি টাকা প্রয়োজন তোবা’র মালিক দেলোয়ার হোসেনের। এই অবস্থায় আরো তিন কোটি টাকা দিয়ে কারখানা বন্ধ করার মত অবস্থাও নেই তার। সেক্ষেত্রে নতুন করে এই ইস্যুতে আবার আন্দোলন দানা বাঁধতে পারে। এই সংকট সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে দফায় দফায় সভা করেও কোন কূল কিনারা করতে পারছে না বিজিএমইএ’র নেতৃত্ব। এ অবস্থায় সবচেয়ে সংকেট পড়তে যাচ্ছে তোবার প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক। তাদের আন্দোলনের কারণে কোন কারখানা কর্তৃপক্ষ এসব শ্রমিককে এখন আর নিয়োগও দিতে রাজি হচ্ছে না বলে বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছেন। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘তোবা’র কারখানা বন্ধ করতে হলে সর্ভিস বেনিফিট বাবদ আরো তিন থেকে চার কোটি টাকা দিতে হবে। এখন ব্যাংক বা বায়ার এগিয়ে আসতে চাইবে না। সব মিলিয়ে তোবা গ্রুপের ৮০ থেকে ৮২ কোটি টাকার দায় রয়েছে। মালিকের সব সম্পত্তি বন্ধকে। তোবা’র মালিকের স্থানে আমি হলে কারখানা আবার চালু করার সাহস করতাম না। যে কোন বিবেচনায় এ সব কারখানা আবার চালু করা কঠিন।’ এদিকে কারখানা বন্ধ করতে হলে শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তোবা’র উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে গতকাল সোমবার সভা করেছে ‘তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি’। সভায় তোবা’র শ্রমিকরা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকার কথা জানিয়েছেন। তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, শুধু তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে কোন ধরনের টালবাহানা করলে আবার অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দাবি কারখানা চালু থাকুক। কিন্তু যদি কারখানা বন্ধ করতে হয় সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সব শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। সেই সঙ্গে এসব শ্রমিককে অন্য কারখানায় চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এ কে এম নাসিম বলেন, বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, কোন কারখানায় শ্রমিকের কাজ এক বছরের বেশি হলে তাকে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এক মাসের মোট বেতন দিতে হয়। এছাড়া এক মাসের মূল বেতনও দিতে হবে। সেই হিসেবে কোন শ্রমিক এই গ্রুপের কোন কারখানায় তিন বছর কাজ করলে তিনি তিন মাসের মূল বেতনের সাথে এক মাসের মোট বেতন (মূল বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদিসহ) প্রাপ্য হবেন। একই সঙ্গে অন্যান্য সুবিধাও প্রাপ্য হবেন। তোবা গ্রুপের এসব কারখানায় কিছু শ্রমিক রয়েছেন যারা টানা ৬ বছরের বেশি কাজ করেছেন। তোবা’র মালিকের দায় তোবা গ্রুপের মালিক দোলোয়ার হোসেনের বড় দায় তৈরি হয় সাভারের তাজরীন গার্মেন্টস পুড়ে যাওয়ার পর। বিজিএমইএ’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি ব্যাংকে তোবা গ্রুপ প্রায় ৮০ কোটি টাকা দেনা। ঝুট ব্যবসায়ী পাবে ২ কোটি টাকা, আর কারখানা ভবনের মালিক পাবে ৩৮ লাখ টাকা। এর বাইরে ফুজি ভবনে অবস্থিত দুটি কারখানার দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপত্কালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য আরো ১ কোটি টাকা ঋণ করে দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এছাড়া প্রথম দুই মাসের বেতন বাবদ ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিল বিজিএমইএ। বাড্ডায় দেলোয়ার হোসেনের ১৬ কাঠা জমিতে তোবা প্রিন্টিং নামের একটি কারখানা আছে। এ ছাড়া একই এলাকায় আরো ৯ কাঠা জমি আছে তার। বেতন দিতে এই ২৫ কাঠা জমি বিক্রি’র বায়না চুক্তি করে ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম এক কোটি টাকা এনে রবিবার জুলাইয়ের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। আর পাঁচ কারখানার যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়েছে ৫০ লাখ টাকায়। জানা গেছে, জমি ও যন্ত্রপাতি বিক্রি করে প্রায় ৬ কোটি টাকা আসবে। সেখান থেকে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের পর বিজিএমইএর টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না তার পক্ষে। যন্ত্রাংশ ও কাপড় চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ বাড্ডায় হোসেন মার্কেট থেকে বেশকিছু যন্ত্রপাতি ও কাপড় চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে বিজিএমইএ। বিজিএমইএ’র লেবার স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান আহাদ আলী আনসারি এ জন্য অনশনরত শ্রমিকদের একটি অংশকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও কাপড় চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মামলা করার চিন্তা চলছে বলে জানান তিনি। সংকট যেভাবে ঘনীভূত হয় মে মাসের বেতন যথাসময়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জুনের ১০ ও ১২ তারিখ থেকে বাড্ডার ফুজি ভবন ও হোসেন মার্কেটের ৫ কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বেতনের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকেন। এরপর থেকে এসব কারখানায় আর চাকা ঘুরেনি। এসব কারখানা মূলত সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করতো। হোসেন মার্কেটে তিনটি কারখানার ব্যবস্থাপক ফারুক হোসেন বলেন, জুনের ১২ তারিখ থেকে হোসেন মার্কেটে অবস্থিত কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেন। সাব কন্ট্রাক্টে চললেও কারখানাগুলো মোটামুটি সারা বছরই কাজ পেতো। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করার সময়ও ৫টি কারখানায় ১ কোটি টাকার বেশি কাজের অর্ডার ছিল। কিন্তু ওই কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। অর্থাত্ জুন থেকে দেড় মাসেরও বেশি সময় কাজ না করিয়েও শ্রমিকের বেতনের দায় মালিকের ঘাড়ে যায়। ঘোর হতাশায় দেড় হাজার শ্রমিক তোবা গ্রুপের প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। গত রবিবার তৃতীয় মাসের বেতন নিয়েছেন বিজিএমইএ ভবন থেকে। কিন্তু তাদের কারো মুখেই হাসি দেখা যায়নি। অন্য কারখানায় কিছু শ্রমিক যোগাযোগও শুরু করেছেন। কিন্তু আন্দোলন করার অভিযোগ এনে তাদের চাকরি দিতে চাচ্ছে না অন্য কারখানা। সালমা নামের বুকশান গার্মেন্টসের এক শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় বিজিএমইএ ভবনের সামনে। তিনি বলেন, বাড্ডায় দুইটা গার্মেন্টসে চাকরির চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তোবা’র নাম শুনার পর তারা চাকরি দেয়নি। এক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকরা বেশি বিপদের মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা তাদের। তবে হোসেন মার্কেটে অবস্থিত তোবা’র তিন কারখানা তোবা টেক্সটাইল, তাইফ ডিজাইন ও মিতা ডিজাইনের কারখানা ব্যবস্থাপক ফারুক হোসেন বলেন, এসব কারখানার অপারেটরা বেশ দক্ষ। দক্ষতার বিচারে তারা যে কোন কারখানায় কাজ পাওয়ার দাবি রাখে। গতকালও বেতন নিয়েছে শ্রমিকরা বিজিএমইএ ভবন থেকে গতকাল সোমবার বেতন নিতে দেখা গেছে শ্রমিকদের। যারা যথাসময়ে এসে বেতন নিতে পারেননি তারা গতকাল বেতন নিয়েছেন। বিজিএমইএ ভবনের নিচে কথা হয় বেতন নিতে আসা শ্রমিক তাইফ ডিজাইনের শ্রমিক মুক্তার সঙ্গে। তখনো তিনি বেতন পাননি। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে থাকায় আসতে পারিনি। আজকে আসছি। স্যারেরা বলছে বেতন দিবে।’ হাবিবুর রহমান নামে একজন এসেছেন যিনি তোবা’র কয়েকটি কারখানায় টিফিন সরবরাহ করতেন। প্রতিষ্ঠানটির কাছে তিনিও ৩০ হাজার টাকা পাবেন। তিনি এসেছেন ওই টাকার জন্য। অন্যদিকে তোবা’র কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বেতন দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ এসেছে। বাড্ডার ফুজি ভবনে অবস্থিত দুটি কারখানার ব্যবস্থাপক মালেকুজ্জামান বলেন, ‘প্রথমে দুই মাসের বেতন দেয়া হলেও আজ সোমবার এক মাসের বেতন দেয়া হচ্ছে না। কী কারণে দিচ্ছে না কোন ব্যাখ্যা দিচ্ছে না।’