মুজিব-দর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তি

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৬
রাত থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। ট্যাঙ্ক দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় ভবনটিকে। সুবহে সাদেকের সময়ই শুরু হয় ঘাতকদের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। একইসঙ্গে একটি পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে ঘাতকরা হত্যা করে। এই হত্যার তালিকা থেকে বাদ যায়নি ১১ বছরের ছোট্ট শিশুটিও। বাদ যায়নি পৃথিবীর আলো না-দেখা গর্ভের সন্তানটিও। ট্যাঙ্কে প্রতীক্ষারত ঘাতকরা বাড়ির ভেতরে অবস্থান করা ঘাতকদের জিজ্ঞেস করে, ভেতরে কে আছে? ভেতর থেকে উত্তর আসে, ‘অল আর ফিনিশড’। না, এটা কোনো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য নয়। ১৫ আগস্টকে ফিরে দেখতে চাইলেই মানসচক্ষে ভেসে ওঠে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি। রক্তাক্ত সেই ভোরে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, একে একে এই হত্যার শিকার হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঘটে যাওয়া পৃথিবীর এ জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। পরিবারের সকলকে হত্যা করে ‘অল আর ফিনিশড’ নিশ্চিত করে, তারপর ঘাতকরা সেই বাসা ত্যাগ করে। ২ তরুণ বয়সেই শেখ মুজিবুর রহমান জড়িয়ে পড়েন ছাত্ররাজনীতিসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মে। সংস্পর্শে আসেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ দেশবরেণ্য নেতৃত্বের। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বাদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ তরুণ মুজিব এর কিছু পরেই বলিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। মুহাম্মদ আলী জিন্নার দ্বি-জাতি তত্ত্বকে প্রথম চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধা দেখিয়ে মুজিব হন কারারুদ্ধ। তিনি ৪৭-এর দেশবিভক্তির পরই জিন্না ও মুসলিম লীগের প্রতারণার বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গে ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোধা ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের মোকাবিলায় শেখ মুজিব সরাসরি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। ১৯৬৬ সালে দূরদর্শী মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানে বিরোধীদলীয় সমাবেশে যোগদানের পর সেখানে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। তিনি জানতেন, পাকিস্তানের জান্তা কোনোদিন স্বায়ত্তশাসনের দাবি মানবে না। তাঁর মনে হয়েছিল, স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফা দাবিই একদিন এক দফায় অর্থাত্ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতায় রূপান্তরিত হবে। দীর্ঘ কারাবাস-ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, সামরিক শাসকদের নির্মম অত্যাচার, দেশদ্রোহী হিসাবে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর প্রস্তুতিসহ সকল পর্যায়কে অতিক্রম করে দেশের সকল স্তরের জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে উপনিবেশবাদী শৃঙ্খল ভাঙতে এগিয়ে যান শেখ মুজিব। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে এসে যিনি ততদিনে শেখ মুজিব থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’-তে পরিণত হয়েছেন। এরপর সেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালির হাজার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার যেন অবসান ঘটলো। কারণ তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের এবং অন্তরের অন্তস্তলে গুমরে মরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন সেদিন। যুগের দাবিকে সাহসে ও শৌর্যে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি। দখলদার বাহিনীর কামান, বন্দুক ও হেলিকপ্টার গানশিপের যে কোনো মুহূর্তে গর্জে ওঠার ভয়াল পরিস্থিতিও তাঁকে দমাতে পারেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো নেতা এমন ভয়ঙ্কর জটিল পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এত অকুতোভয়ে স্বাধীনতার শব্দ উচ্চারণের সাহস করেছেন কিনা তা শুধু ইতিহাসই বলতে পারবে। ৩ দ্য টাইমস অব লন্ডন-এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়, সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। বঙ্গবন্ধুর অনন্যসাধারণ নেতৃত্বের জন্য ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী নিউজউইক তাঁকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ অর্থাত্ ‘রাজনীতির কবি’ বলে আখ্যায়িত করে। ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিবিসির বাংলাভাষী শ্রোতা জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যথার্থভাবেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন। ৪ আর তাই ১৫ আগস্ট ভোরে ‘অল আর ফিনিশড’ বলে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারকে নয়, বরং বাংলাদেশের ভিত্তিকে নস্যাত্ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্বকে; জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-বিশ্বাসী মুজিব-দর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তিকে—যে বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্যই তিনি সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের মনোবাসনা। তাই ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা করা সম্ভব হলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে মুছে ফেলার সকল অপচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতেও এর অন্যথা হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঢাকা