সমপ্রচার নীতিমালা ও তথ্য অধিকার আইন

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৭
‘তথ্য জানা আপনার অধিকার’—এই বিষয়ের ওপর প্রায়শ মোবাইলে ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটি পড়ে আমার মনে হতো জানতে না পারার একটি সীমাবদ্ধ সংস্কৃতি থেকে আমরা হয়তো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছি। মোবাইল ফোনের সে তথ্য বাস্তবে কতটুকু কার্যকর হবে তা এখন বিবেচনার বিষয়। কারণ ইতোমধ্যে সমপ্রচার নীতিমালার যে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে তাতে তথ্য জানা কি অধিকারের পর্যায়ে পড়বে? কারণ নীতিমালায় জানার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে হয়। এ বিষয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর ও ব্যাখ্যা তথ্য অধিকার আইনে প্রত্যাশা করছি। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোপরি সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল অনেক। দুর্নীতিতে বারবার সাফল্য পাওয়া এদেশে সরকারি পদস্থ অনেক কর্মকর্তা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। তাদের দুর্নীতি নিয়ে মিডিয়ায় তথ্য প্রকাশিত হয়, আলোচনা হয় আর জনগণ সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, সচেতন হয়। কিন্তু যে নীতিমালা করা হয়েছে তাতে কোনো গণমাধ্যম তো সরকার কিংবা তার কর্মকর্তার কাজ সম্পর্কে তথ্যই জানাতে পারবে না। কারণ তাতে সরকার কিংবা সরকারি কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কখনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ‘কাদের’-এর মতো কোনো ছাত্রের ওপর নির্মম নির্যাতন করে কিংবা নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মতো কোনো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ইমেজ সংকট হতে পারে এই ভয়ে হয়তো কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল তা নিউজ করা থেকে বিরত থাকবে। এতে করে কি মানুষের তথ্য জানার অধিকারটি নিরঙ্কুশ হবে? কিংবা এ রকম ঘটনায় জনগণের কাছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে? অথবা এরকম ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কীভাবে তথ্য প্রদান বা অবহিত করা হবে? যদি তথ্য জানাতে কোনো ত্রুটি হয় তাহলে জনগণ কি তথ্য অধিকার আইনের সুফল পাবে? আবার জনগণকে আতঙ্কিত করে এমন কোনো সংঘর্ষ কিংবা ঘটনার খবর কিংবা ছবি দেওয়ার বিষয়ে মানা করা হয়েছে নীতিমালায়। এমন ঘটনার আতঙ্কিত হওয়ার মতো ছবি না দেখানো ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো এলাকায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় যদি কোনো হতাহতের মতো দুর্ঘটনা ঘটে এবং সে তথ্য জনগণ জানতে না পেরে ঘটনা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকে কিংবা ঘটনা না জানার কারণে নতুন কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় তার দায় কে নেবে—সরকার না নীতিমালা? আরেকটি বিষয় সম্পর্কে না জানলেই নয়। সেটা হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয় এমন বিষয়ে সংবাদ করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে—ফেলানির মতো কোনো তরুণীকে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার মতো অমানবিক দৃশ্য কিংবা খবর কি মানুষ জানার অধিকার রাখে না? প্রতিবেশীর সব আচরণ সব সময় ভালো হবে এমন তো কথা নেই—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই? প্রতিবেশী না হয় ভিন্ন দেশ। নিজ দেশের সরকার কি সব সময় ভালো কাজ করে? তার কোনো ভুল-ত্রুটি হয় না? যদি হয় তার সমালোচনা করার নীতি কী হবে তার ব্যাখ্যা কি আছে নীতিমালায়? সচেতন মানুষ মাত্রই ধারণা করতে পারেন যে মূলত সরকারের সমালোচনাই কাল হয়েছে গণমাধ্যমের জন্য, বিশেষ করে টেলিভিশনের টক-শোগুলোতে সরকারি কাজের যে সমালোচনা তা গণতান্ত্রিক সরকার মানতে পারছে না। বর্তমান সরকারের কোনো ভুল হতে পারে এটা সরকার মনে করে না। তাই নীতিমালার নামে খড়্গ নেমে এসেছে। নীতিমালাটা যদি সর্বজনগ্রাহ্য ধরে নেওয়া যায় তাহলে আরেকটি প্রশ্ন কি উঁকি দেয় না যে, নীতিমালাটি কি তথ্য অধিকার আইনকে সমর্থন করে? দেশে কোনো সমপ্রচার নীতিমালা ছিল না তাই এটার প্রয়োজন ছিল, সবাই তা আশাও করেছিল। কিন্তু শুরুতেই যা বিতর্কিত এবং হাজারও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে তা কতটা গ্রহণযোগ্য তা ভাবনার দাবি রাখে। ঢাকা