নাটকে প্রাণ থাকে দ্বন্দ্বে, রবীন্দ্রনাথের নাটকেও সেই দ্বন্দ্বটা আছে, এবং তা প্রধানত মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বন্ধনের বাস্তবতার, যেন অচলায়তনের সঙ্গে মুক্তধারার। ওই দুটি তাঁর নাটকের নাম; এবং অচলায়তনে (১৯২২) যেমন মুক্তধারাতেও (১৯২২) তেমনি বন্ধন আছে, আর আছে সেই বন্ধন থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। শেষ পর্যন্ত মুক্তির আকাঙ্ক্ষাটাই জয়ী হয়। রবীন্দ্রনাটকের পরিণতি বিয়োগান্ত নয়, মিলনান্ত; যদিও যন্ত্রণা, দুঃখ, মৃত্যু, আত্মাহুতি অনেক বেদনাদায়ক ঘটনা নাটকের ভেতর ঘটে। জীবনের দুর্ভোগকে রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই জানতেন, এবং মানতেনও, কিন্তু জীবনকে ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখতে সম্মত ছিলেন না।
বন্ধন মানুষ নিজেই তৈরি করে, নিজের জন্য কখনো কখনো, অপরের জন্যই অধিকাংশ সময়েই। কাজটা শত্রুতামূলক; কিন্তু এটা অনিবার্য হয়ে ওঠে স্বার্থঘটিত কারণে। রবীন্দ্রনাথ সর্বত্রই মুক্তির পক্ষে, এবং বন্ধনের বিপক্ষে। তাঁর নাটকে দেখি মুক্তির জন্য মানুষ কাজ করছে, চঞ্চল, অস্থির হয়ে উঠছে, কিন্তু বন্ধনটা তো বাস্তবতা, তাকে ভাঙা সহজ নয়। তবু ভাঙতে হয়। আর ওই ভাঙার চেষ্টার ভেতর দিয়ে বন্ধনের যে চরিত্র—সেটা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। পাখি মুক্তি চায়। কিন্তু তার মুক্তির প্রসঙ্গে খাঁচার কথা এসে যায়। ‘কিন্তু পাখির বেদনাকে সত্য করিয়া দেখাইতে হইলে খাঁচার বদ্ধতা ও কঠিনতাকে পরস্ফুিট করাইতেই হয়।’ কথাটা রবীন্দ্রনাথের নিজেরই, অচলায়তনের প্রসঙ্গে লিখেছেন।
নাটক রবীন্দ্রনাথ কম লেখেননি। হিসেব করলে দেখা যাবে সংখ্যার দিক থেকে কবিতার পরেই তাঁর নাটকের স্থান; কিন্তু কবিতা ও কথাসাহিত্যের তুলনায় তাঁর নাটকের পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তাটা খাটো। তার কারণ আছে। নাটক যদিও তিনি মানুষের জীবন ও তার মনুষ্যত্বের সঙ্কট নিয়েই লিখেছেন, তবু তাতে তত্ত্ব আছে, রয়েছে দার্শনিকতা, যে জন্য সংকেত ও রূপকের ব্যবহার এসে গেছে, অর্থটা সরল হয়ে ওঠেনি; সূক্ষ্মতা এসে সরল সমীকরণের পথে অন্তরায়ের সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া অধিকাংশ নাটকেই রয়েছে গানের ব্যবহার। গান অবশ্যই কাব্যময়তা নিয়ে আসে, তবে নাটকের ভেতরের লড়াইটাকে খানিকটা বুঝিবা স্তিমিতও করে দেয়। লড়াইটা অবশ্য ভীষণ রক্তপাতের নয়। তাতে রোমহর্ষকতার অভাব রয়েছে; সেই রণক্ষেত্রে গানের সুর ও ছন্দ যে অশোভন এমন বলা যাবে না।
দুই
রবীন্দ্রনাথের লেখা নাটকের মধ্যে সবচেয়ে অধিক পরিচিত, আলোচিত ও তাত্পর্যপূর্ণ হচ্ছে রক্তকরবী (১৯২৬)। এ নাটকের নান্দনিক সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু অন্তর্গত দার্শনিক বিষয়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রক্তকরবীর মূল দ্বন্দ্বটাকে একাধিক নামে চিহ্নিত করা সম্ভব এবং তা করা হয়েছেও বৈকি। একদিকে আছে মানুষের সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে লালসা, অন্যদিকে প্রকৃতির স্বাভাবিক ও প্রবহমান জীবন। লড়াইটাকে যন্ত্রের সঙ্গে মনুষ্যত্বের বিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করাও অযৌক্তিক নয়। দ্বন্দ্বটির ভেতর একটি সময়োত্তীর্ণতা রয়েছে। এটি আগের কালেও সত্য ছিল। কিন্তু একালে বিশেষরূপে প্রকট হয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, কৃষিজীবী ও আকর্ষণজীবী এই দুই জাতীয় সভ্যতার মধ্যে একটা বিষম দ্বন্দ্ব আছে, এ সম্বন্ধে বন্ধুমহলে আমি প্রায়ই আলাপ করে থাকি। কৃষিকাজ থেকে হরণের কাজে মানুষকে টেনে নিয়ে কলিযুগ কৃষিপল্লিকে কেবলই উজাড় করে দিচ্ছে। তাছাড়া শোষণজীবী সভ্যতার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, দ্বেষ-হিংসা বিলাসবিভ্রম সুশিক্ষিত রাক্ষসের মতোই। আমার মুখের এই বচনটি কবি তাঁর রূপকের ঝুলিতে আত্মসাত্ করেছেন, সেটি প্রণিধান করলেই বোঝা যায়।
সুশিক্ষিত রাক্ষসের যে শোষণজীবী চরিত্রের কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—তার নামটি তিনি উল্লেখ করেননি; করলে হয়তো ব্যাপারটা স্থূল হয়ে পড়ত, অথবা হতে পারে কবির যে নিজস্ব সংস্কৃতি তার সঙ্গে ওই নামকরণ খাপ খেত না, কিন্তু আমাদের পক্ষে এটা কোনো অযৌক্তিক কাজ হবে না যদি চিরকালের ওই ব্যাধিটাকে একালের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করি। বরঞ্চ তাতে করে ব্যাপারটিকে বুঝতে সুবিধাই হবার কথা। রক্তকরবী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ হবার পরে লেখা, যে যুদ্ধটা ছিল বিশ্বের পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর ভেতর আধিপত্য নিয়ে লড়াই। যুদ্ধটা ওইখানেই শেষ হয়ে যায়নি, নাটকটি রচনার একযুগ পরে পুঁজিবাদীরা আরেকটি যুদ্ধ বাধায়, রবীন্দ্রনাথ যেটি দেখে গেছেন, যদিও তার ধ্বংসকার্যের সবচেয়ে নির্মম ছবিগুলো তাঁকে সহ্য করতে হয়নি, সেটি ঘটার আগেই তিনি চলে গেছেন।
নাটকটির নাম প্রথমে ছিল যক্ষপুরী, পরে বদল করে রেখেছিলেন নন্দিনী, এবং শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় রক্তকরবী। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, রক্তকরবীর সমস্ত পালাটি নন্দিনী বলে একটি মানবীর ছবি। চারিদিকের পীড়নের ভিতর দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। ফোয়ারা যেমন সঙ্কীর্ণতার পীড়নে হাসিতে অশ্রুতে কলধ্বনিতে ঊর্ধ্বে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তেমনি তিনি আরো লিখেছেন, ‘নাটকের মধ্যেই কবি আভাস দিয়েছেন যে, মাটি খুঁড়ে যে পাতালে ধন খোঁজা হয় নন্দিনী সেখানকার নয়, মাটির ওপর তলে যেখানে প্রাণের, যেখানে রূপের, যেখানে প্রেমের লীলা নন্দিনী সেই সহজ সুখের, সেই সহজ সৌন্দর্যের’ নন্দিনী এবং রক্তকরবী আসলে একই, তারা স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত।
মকররাজের এই যক্ষপুরীতে মানুষের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। এখানকার লোকেরা উত্পাটিত, পরস্পরবিচ্ছিন্ন, যান্ত্রিক। তারা আত্মপরিচয় হারিয়েছে। স্বর্ণখোদাইকারকেরা নিজের নামে পরিচিত নয়, তারা পরিণত হয়েছে একেকটি সংখ্যায়। বেচারা অধ্যাপক এখনো পুরোপুরি যন্ত্রে পরিণত হননি, নবাগত পুরাণবাগিশকে তিনি বোঝাচ্ছেন, ‘পৃথিবীর প্রাণভরা খুশিখানা নির্জের সর্বাঙ্গে টেনে নিয়েছে ওই আমাদের নন্দিনী। এই যক্ষপুরে যত সর্দার আছে, খোদাইকার আছে, আমার মতো পণ্ডিত আছে, মুর্দাফরাশ আছে—সব বেশ মিশ খেয়ে গেছে। কিন্তু ও একেবারে বেখাপ্পা। চারদিকে হাটের চেঁচামেচি, ও হলো সুরবাঁধা তাম্বুরী।’ এই নগরটি পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক, পুঁজিবাদ যেমনটা হয়ে থাকে। এখানে কেউ ওকে চায় আত্মসাত্ করবে, কেউ চায় তাড়িয়ে দেবে। কিন্তু নন্দিনী তার স্বভাবগুণেই চায় ব্যবস্থাটাকে ভাঙবে, অস্ত্রের জোরে নয়, প্রাণের জোরে। রাজাকে সে জানিয়ে দিয়েছে, ‘আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার সঙ্গে লড়াই।’
রাজা নিজেও কিন্তু বন্দি, তার নিজের গড়া ওই ব্যবস্থার ভেতরে। সে নিঃসঙ্গ, তপ্ত, রিক্ত, ক্লান্ত। থাকে লোহার তৈরি জালের ভেতরে। যে সর্দার ও মোড়লরা তার চারপাশে রয়েছে তারা তার পক্ষে কাজ করে, আবার তাকে পাহারাও দেয়, ঘিরে রাখে, রাজা যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে। যক্ষপুরীতে মৈত্রী নেই। রয়েছে রাগ, অবিশ্বাস, হিংসা ও ষড়যন্ত্র। নগরের বাইরে আছে জীবন্ত প্রকৃতি, সেখানে কৃষিকাজ চলে, সেখান থেকে ডাক আসে, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে চলে আয়, আয়, আয়।’ ঘটনার সময়টা পৌষ মাসের, ফসল কাটার দিনের। রাজার ভেতরে আছে লালসা; তাল তাল সোনা খুঁড়ে তুলেছে তার খোদাইকাররা। কিন্তু ভেতরের মানুষটা এখনো একেবারে পাথর হয়ে যায়নি। যে জন্য নন্দিনীর প্রতি সে চঞ্চল হয়। নন্দিনীর সঙ্গে রঞ্জনের বন্ধুত্ব রাজাকে ঈর্ষাকাতর করে, তার ভেতরে কম্পন ধরায়, রঞ্জনও বিদ্রোহী, সে এই রাজ্যের যান্ত্রিকতাকে মানে না, সে গান গায়, নানান সাজে নিজেকে সাজায়; রঞ্জন কিছুতেই খোদাইকার হবে না। আর আছে বিশুপাগলা। সেও
গান গায়, এবং যক্ষপুরীর নিয়মকানুন মানে না।
রঞ্জনকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাজপ্রাসাদে। অন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে সেখানে তাকে হত্যাও করা হয়েছে। রাজা বলে রঞ্জনকে সে চিনতে পারেনি। তাকে রঞ্জন বলে না চিনুক, বিদ্রোহী বলে নিশ্চয়ই চিনে ছিল। বিশুপাগলাকেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বন্দিশালায়। কিন্তু সর্দারের লোকেরা শেষ পর্যন্ত কাজটা সমপূর্ণ করতে পারেনি, বিশুর কারিগরেরা বন্দিশালা ভেঙে ফেলে তাকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছে। ওদিকে নন্দিনীর ডাকে সাড়া দিয়ে রাজা নিজেও এসেছে বের হয়ে; সে ভেঙে ফেলেছে তার ধ্বজা। খবর পেয়ে সর্দার ছুটে এসেছে সৈন্যদের নিয়ে, রাজাকে আটক করবে বলে। কিন্তু তার আগেই রাজা চলে গেছে তাদের নাগালের বাইরে, নন্দিনীর পিছু পিছু। জয় হয়েছে নন্দিনীর, অর্থাত্ প্রাণের। পৌষের যে গান শুরুতে শোনা গিয়েছিল, শেষেও সেটি শোনা যায়। যন্ত্র হেরে যায় মানুষের কাছে।
রাজার পলায়ন এবং অন্যদের বিদ্রোহে সাময়িক মুক্তির একটা সুবাতাস বইবে এমন আশা আমরা করতেই পারি; কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটার যে অবসান ঘটবে তেমনটা তো ভরসা করা যাচ্ছে না। বিজ্ঞান, যন্ত্র, সমপদ সমস্ত কিছুর ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থার তথা সভ্যতারই উদ্ভব ঘটা সম্ভব। কিন্তু সেটা ঘটবে কি ঘটবে না তা বলার দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথের নয়, এবং তাঁর পারিপার্শ্বিক সময়, অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির দরুন সে দায়িত্ব তাঁর পক্ষে নেওয়াটা সম্ভবও ছিল না। নন্দনতত্ত্বের সকল নিয়মকানুনের ভেতরে থেকে রক্তকরবীতে রবীন্দ্রনাথ যা করেছেন—তা হলো পুঁজিবাদ যে চরম সত্য তা নয়, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে অবশ্যম্ভাবী, এবং সেই বিদ্রোহে মনুষ্যত্বের বিজয় যে অনিবার্য সেই সত্যটাকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন।
রক্তকরবীতে রাজনীতি আছে, এবং সেই রাজনীতিটি পুঁজিবাদের। মকররাজের রাজত্বটা স্বাধীন, অন্য কোনো রাষ্ট্রের সে উপনিবেশ নয়। রাজনীতির একধরনের ঔপনিবেশিক তত্পরতার সাক্ষাত্ পাওয়া যায় ১৯২২-এ লেখা তাঁর নাটক মুক্তধারাতে। উত্তরকূটের অবস্থান ওপরে। শিবতরাই রয়েছে নিচে। উত্তরকূট শিবতরাইয়ের ওপর কর্তৃত্ব করে, অনেকটা ঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে। উত্তরকূটের যুবরাজ অভিজিেক শিবতরাইয়ের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল; শিবতরাইয়ের লোকেরা উত্তরকূটের রাজাকে খাজনা দেয়। শিবতরাইয়ের ওপর উত্তরকূটের কর্তৃত্বের আসল ভিত্তিটা হলো নদীর প্রবাহ। মুক্তধারা নেমে এসেছে ওপর থেকে নিচে। সেই ধারাপ্রবাহকে বাঁধ তুলে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যটা হচ্ছে নদীপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের ওই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শিবতরাইয়ের প্রজাদের ভেতর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে তাকে দমন করা। প্রজাদের অসন্তোষ নির্দিষ্ট আকার নিয়েছে খাজনা প্রদানে অসম্মতিতে। শিবতরাইয়ের লোকদের অজুহাত সেখানে দুর্ভিক্ষ চলছে; রাজা রণজিত্-এর বক্তব্য দুর্ভিক্ষ হয়েছে বলে রাজার প্রাপ্য তো বন্ধ হতে পারে না। উত্তরকূটে বিভূতি নামে একজন বুদ্ধিমান ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক আছে; জন্ম তার কামারের ঘরে, কিন্তু নিজের যোগ্যতায় সে এখন যন্ত্ররাজ হয়ে উঠেছে, এবং শিবতরাইয়ে নদীর জলপ্রবাহকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য যে বাঁধ তৈরি সে কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য। এজন্য সময় লেগেছে, বহু মানুষকে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করা হয়েছে, যাদের অনেকেই ফিরে আসেনি।
মন্ত্রীর সঙ্গে রাজার কথোপকথনে রাজনৈতিক সমস্যাটা প্রকাশ পায়। রাজা তার মন্ত্রীকে বলে, শিবতরাইয়ের প্রজাদের কিছুতেই তো বাধ্য করা যাচ্ছিল না, মুক্তধারার জলকে আয়ত্ত করে এখন ওদের বশ মানাবার উপায় হয়েছে। জলের প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করার যে রাজনীতি বর্তমানকালে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে, এবং আগামীদিনে তেলের সঙ্গে জল নিয়েও যে যুদ্ধ লাগবার আশঙ্কা সেটা রবীন্দ্রনাথ অত আগে, সেই ১৯২২ সালেই আঁচ করতে পারছিলেন। অন্য অনেক দিকে তো অবশ্যই, ভবিষ্যত্দ্রষ্টা হিসেবেও তিনি মোটেই সামান্য ছিলেন না।
রাজা মন্ত্রীকে অভিযুক্ত করছে, ‘কতবার বলেছ ওপরে চেপে বসে নিচে চাপা দেওয়া সহজ, আর বিদেশি প্রজাদের সেই চাপে রাখাই রাজনীতি। এ কথা বলোনি?’ মন্ত্রী স্বীকার করে যে চেপে বসবার সেই রাজনৈতিক পরামর্শ সে দিয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল তখনকার জন্য, এখন অবস্থা বদলেছে, শিবতরাইয়ের প্রজারা ক্ষেপে উঠেছে, এখন তাই আগের নীতি আর চলবে না। রণজিত্-এর খুড়া মহারাজ বিশ্বজিত্ রাজত্ব করেন পার্শ্ববর্তী মোহনগড়ে, তাঁর পরামর্শ মুক্তধারার প্রবাহকে বাঁধমুক্ত করে দেবার। রণজিেক তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সকল তৃষিতের জন্য দেবদেবীর কমণ্ডুল যে জলধারা ঢেলে দিচ্ছে সেই মুক্তজলকে তোমরা বন্ধ করবে কেন?’ ওদিকে শিবতরাইয়ের লোকেরা বিশ্বাসই করতে পারে না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন কোনো মানুষ তা বন্ধ করতে পারবে। অথচ বিভূতি ঠিক সেটাই করেছে। দম্ভ ভরে সে বলে, ‘দেবতা তাদের কেবল জলই দিয়েছেন, আমাকে দিয়েছেন জলকে বাঁধবার শক্তি’ সেই শক্তি সে পেয়েছে রাজার সমর্থনে; বিজ্ঞানকে পরিণত করেছে দাসে, রক্তকরবীর শাসক শ্রেণির মতোই। উত্তরকূটের মানুষেরাও শিবতরাইয়ের ওপর কর্তৃত্ব করার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে দীক্ষিত হয়ে পড়েছে। সেখানকার বিদ্যালয়ের ছেলেরাও জানে যে বিভূতি শিবতরাইয়ের খাবার জল বন্ধ করে দিয়েছে এবং বন্ধ করার কারণ হচ্ছে ওদেরকে জব্দ করার ইচ্ছে। ওদেরকে কেন জব্দ করতে হবে? তার কারণও লেখা আছে পাঠ্যপুস্তকে। কারণ হলো শিবতরাইয়ের লোকেরা খারাপ, ওদের ধর্ম খুব খারাপ, ওদের নাকও উত্তরকূটের লোকদের নাকের মতো উঁচু নয়।
অভিজিেক বিপজ্জনক বিবেচনা করে রাজা রাজকর্তব্য পালন করে, তাকে আটক করার পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু সফল হয় না। যুবরাজ চলে গেছে বাঁধের কাছে। রাজকুমার সঞ্জয়ও যুবরাজের পক্ষে। অভিজিত্-এর হস্তক্ষেপে ঘটনা শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে তার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে:‘ ওই বাঁধের একটা ত্রুটির সন্ধান কী করে তিনি জেনেছিলেন। সেইখানে যন্ত্রাসুরকে তিনি আঘাত করলেন, যন্ত্রাসুর সেই আঘাত ফিরিয়ে দিলে। তখন মুক্তধারা সেই আহত দেহকে মায়ের মতো কোলে তুলে নিয়ে চলে গেল।’ যুবরাজের প্রাণের বিনিময়ে শিবতরাইয়ের লোকেরা সাময়িকভাবে রক্ষা পেল। নইলে রক্তপাত ঘটত। বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হতো। কেননা যুবরাজকে বন্দি করা হয়েছে শুনে শিবতরাইয়ের হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছিল তাকে মুক্ত করবার জন্য। যুবরাজকে ফেরত না পেলে তারা ফিরে যেত না। তাদের ইচ্ছে যুবরাজকে তারা শিবতরাইয়ের রাজা করবে।
নাটকের সমাপ্তি জলস্রোতের শব্দের ভেতর দিয়ে। বাঁধ ভেঙে গেছে। মুক্তধারা ছুটছে। ধনঞ্জয় বলে, যে যুবরাজকে তারা খুঁজতে বের হয়েছিল শিবতরাইয়ের মানুষেরা তাকে চিরকালের জন্য পেয়ে গেল মুক্তধারার বন্ধনমুক্তির মধ্য দিয়ে।
বাঁধভাঙার গান দিয়ে তাসের দেশেরও (১৯৩৩) সমাপ্তি বটে। তবে এই বাঁধ ভিন্ন প্রকারের, নদীর নয়, নিয়মকানুন শৃঙ্খলের। নাটকের শেষে আমরা ওই দেশের সকল মানুষের একসঙ্গে গাওয়া গান শুনতে পাই, ‘বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও/ বন্দী প্রাণমন হোক উধাও।’ নাটকের শুরুতে শুনতে পেয়েছিলাম রাজপুত্র বলছে সোনার খাঁচায় সে আর বন্দি থাকবে না। যে রাজ্যে তার বসবাস সেখানে কোনো বৈচিত্র্য নেই, সুযোগ নেই কোনো প্রকার দুঃসাহসিক কাজের। শিকারে গেলে মনে হয় রাজশিকারি বাঘগুলোকে অহিংসা নীতির দীক্ষা দিয়েছে। এ পর্যন্ত একটি বাঘকেও সে ভদ্ররকমের লাফ মারতে দেখেনি। মুক্তির খোঁজে রাজপুত্র জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়ে, সঙ্গে নেয় সওদাগরপুত্রকে। ঝড়ের মুখে পড়ে তাদের জাহাজটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, এবং রাজপুত্র ও বণিকপুত্র গিয়ে ওঠে এক নতুন দেশে। সে দেশটা অদ্ভুত। সেখানকার মানুষগুলো সব তাসের মতো। তাদের নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই, ব্যক্তিত্ব নেই, স্বাধীনতা থাকবার প্রশ্নই ওঠে না।
আসলে তাসেরই দেশ সেটা, মানুষের নয়। এদের দলীয় গানে রয়েছে :‘তোলন নামন/ পিছন সামন/ বাঁয়ে ডাইনে/ চাইনে চাইনে।’ তাসদের রাজা আছে, রানি আছে, গোলাম আছে; কিন্তু তারা সবাই একই ভাবে বন্দি। অনেকটা বুঝি পরাধীন ভারতবর্ষের স্বৈরাচার-শাসিত রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি। সকলেই যথারীতি চলে, নিয়মের বাইরে যায় না কোনো মতেই। এরা শিকলকে মনে করে অলঙ্কার, জেলখানাকে বলে শ্বশুরবাড়ি।
এখানে বিদেশি ওই দুইজন, দুটি স্বাভাবিক মানুষ, রাজপুত্র ও সওদাগরপুত্র এসে পড়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এরা গান গায়, নৃত্যও করে, বলে ‘আমরা নতুন যৌবনেরই দূত, আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।’দেশের মেয়েরাই দেখা গেল প্রথমে নিয়ম ভাঙতে চাইছে। তারা আর তাস থাকবে না, মানুষ হয়ে উঠবে, এই রকমের ইচ্ছে। রাজা দেখছে ক্রমশ সে একলা হয়ে পড়ছে। এমনকি রানিও তার সঙ্গে নেই। ক্রুদ্ধ রাজা রানিকেও নির্বাসনে পাঠায়। কিন্তু রানি তাতে মোটেই অসন্তুষ্ট নয় দেখে রাজা নিজেও তাসের রাজ্যের বাইরে রওনা দেয়, রানির পেছনে পেছনে। বিদেশি রাজপুত্রকে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘ওগো বিদেশি, আমিও কি পারব?’ অর্থাত্ সেও তাস না থেকে মানুষ হতে চায়। মানুষ হওয়ার প্রথম পদক্ষেপটাই হচ্ছে মুক্ত হওয়া।
নাটকটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে, সুভাষচন্দ্র বসু তখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি; তাঁর নেতৃত্বে দেশে নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আবার রক্ষণশীল যাঁরা তাঁরা সুভাষকে পছন্দ করছেন না, তাঁদের মধ্যে স্বয়ং গান্ধীজিও ছিলেন। পরাধীনদের মুক্তির জন্য আপসবিমুখ এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন করে, এই বক্তব্য তাসের দেশের ভেতরে রয়েছে। তবে সে নেতৃত্ব কেবল বয়সেই নতুন হবে না, তাকে চিন্তার দিক থেকেও নতুন হতে হবে। জনগণের ভেতর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, প্রয়োজন নতুন চিন্তা ও নেতৃত্বের; তাসের দেশ এই সত্যের দিকেও ইঙ্গিত করছে।
রবীন্দ্রনাথের ছোট্ট একটি নাটক, নাম ডাকঘর (১৯১২); সেখানেও দেখি বন্ধনের বিরুদ্ধে মুক্তির প্রবল আকুলতা। ডাকঘরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবনের একটি সঙ্কটের যোগ আছে। বয়স তখন তাঁর পঞ্চাশ হয়ে গেছে। অথচ যে সব কাজ করতে চেয়েছিলেন সেগুলো করে উঠতে পারেননি। জনস্বীকৃতিও উল্লেখযোগ্যরূপে আসেনি। কোথাও যাবার ডাক তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। এ সময়ে সাময়িকভাবে হলেও মৃত্যুচিন্তা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। রবীন্দ্রনাথের নিজের পক্ষে এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। যে বছর ডাকঘর লেখেন সে বছরই তিনি পুত্র
রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূ প্রতিমাকে সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ড যান, সঙ্গে ছিল গীতাঞ্জলির অনুবাদ, যা তার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি বহন করে আনে। কিন্তু বালক অমলের পক্ষে তো তেমন কোনো মুক্তি লাভ সম্ভব ছিল না।
অমল উন্মুক্ত পথের ডাক শুনেছে, সে অস্থির হয়ে পড়েছে বেরোবার জন্য, কিন্তু তার পক্ষে আটক অবস্থা থেকে ছাড়া পাবার কোনো উপায় নেই। বালকটির মা নেই, বাবাও মারা গেছে। মাধব দত্ত সংসারী গৃহস্থ, তার সন্তান নেই, অমলকে সে পালক হিসেবে নিয়েছে। তার অতি যত্নের কারণেই হয়তো অমল অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অমল এখন গ্রাম্য কবিরাজের চিকিত্সাধীন, যে কবিরাজ তার চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এক সময়ে সে চলাফেরা করত, এখন উঠোনে পর্যন্ত যাওয়াও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তার ঘরের দরজা বন্ধ, সে জানালার পাশে বসে থাকে, দূরের ও নিকটের দৃশ্য দেখে, নানা কিছু কল্পনা করে। দইওয়ালাকে দেখে, বালকদেরকে দেখে যারা মাঠে যাচ্ছে খেলা করতে, সুধাকে দেখে, যে মালিনীর মেয়ে। তাদের সঙ্গে তার কথা হয়। এরা সকলেই সহানুভূতিশীল। অমলের দুঃখটা তারা বোঝে। এমন কি প্রহরীও তার বাইরে যাবার আকাঙ্ক্ষাটার
প্রতি দুর্বল। বোঝে না কেবল কবিরাজ এবং মোড়ল। মাধব দত্ত জানে অমলের কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মনে করে কবিরাজের নিষেধাজ্ঞা না মানলে অমলের ক্ষতি হবে। জানালার পাশে যে অন্ধখোঁড়া ভিখিরি আসে, একজন যাকে ঠেলে নিয়ে যায়, অমল বলে ভালো হয়ে উঠলে ঠেলে নেবার কাজটা
সে নিয়ে নেবে।
কিন্তু একসময়ে জানালার পাশে বসে থাকাটাও বন্ধ হয়ে যায়। মাধব দত্তের ধারণা জানালার পাশে রোজ রোজ বসে থেকেই তার ব্যামোটা বেড়ে গেছে। অমল বলে, ‘আমার ব্যামোর কথা আমি কিছুই জানি নে, কিন্তু সেখানে থাকলে আমি খুব ভালো থাকি।’ মাধব দত্তের প্রতিক্রিয়া : ‘সেখানে বসে তুমি শহরের যত রাজ্যের ছেলেবুড়ো সকলের সঙ্গেই ভাব করে নিয়েছ। আমার দরজার কাছে যেন মস্ত মেলা বসে যায়, তাতেও কি কখনো শরীর টেকে অমলের যথার্থ আপনজন শুধু একজনই, ফকিরবেশী ঠাকুরদা।’
এরই মধ্যে অমল দেখেছে নতুন ডাকঘর বসেছে। ঠাকুরদাকে সে জানায়, ‘প্রথমে যখন আমাকে ঘরের মধ্যে বসিয়ে রেখে দিয়েছিল তখন আমার মনে হয়েছিল যেন দিন ফুরাচ্ছে না, আমাদের রাজার ডাকঘর দেখে অবধি আমার রোজই ভালো লাগে।’ সে আশা করে রাজার কাছ থেকে তার নামে চিঠি আসবে। আর ডাক-হরকরা হতেও তো তার ভীষণ ইচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এক রাতে রাজদূত এসে উপস্থিত। বন্ধ দরজা ভেঙে তার প্রবেশ। রাজকবিরাজও আসে। দরজা জানালা সব খুলে দিতে বলে। অমলের ঘুম পায়। সে ঘুমিয়ে পড়ে। ধারণা করা যেতে পারে যে অমলের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সে ঘুমিয়ে পড়েছে এমনটা মনে করাটাও অসঙ্গত নয়। ঘুম হোক আর মৃত্যুই হোক, সামান্য মানুষদের অসামান্য তত্ত্বাবধানের হাত থেকে অমল যে মুক্তি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অচলায়তন (১৯১২) এবং ডাকঘর একই বছরে লেখা। উভয় নাটকেই মানুষকে আটকে রেখেছে মানুষের শত্রুপক্ষ। ডাকঘরের ঘটনা ছিল একজন বালককে ঘিরে, অচলায়তনে দেখা যাচ্ছে একটি জনগোষ্ঠী আটকা পড়ে আছে। অচলায়তনে কোনো কিছুই সচল নয়। এখানে আছে পাথরের প্রাচীর, বদ্ধ দরজা, নানা রেখার গণ্ডি, স্তূপাকার পুঁথি, মন্ত্রপাঠের গুঞ্জনধ্বনি এসব হচ্ছে এই বিশেষ আয়তনের ভেতরকার বৈশিষ্ট্য। পরিবেশটা অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন, বলা যায় ইউরোপে যেমনটা ছিল মধ্যযুগ বলে কথিত সময়টাতে। এখানে জ্ঞানের চর্চা চলে, কিন্তু সে জ্ঞান মাকড়সার জালের চাইতে উন্নত মানের কিছু নয়। পঞ্চক এই অচলায়তনের বাসিন্দা বটে, কিন্তু সে বাইরের ডাক শুনতে পেয়েছে, টানটা এমন যে তার পক্ষে সেটাকে উপেক্ষা করবার কোনো উপায় নেই।
অচলায়তনটা যে কেবল বাইরের ঘটনা তা নয়, ভেতরেরও ব্যাপার বৈকি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সংশয়ও দেখা দিয়েছে। পঞ্চকের চঞ্চলতা আমরা দেখেছি। আচার্যও বলছেন যে তাঁর আশা ছিল যে সাধনার শেষে কিছু পাওয়া যাবে, এখন টের পাচ্ছেন যে সেই সাধনা কেবল আপনাকেই আপনি
প্রদক্ষিণ করেছে। ওদিকে প্রতীক্ষা চলছে গুরুর। বর্ষার আরম্ভে তিনি নাকি আসবেন। এসে হয়তোবা লজ্জায় ফেলবেন অচলায়তনিকদেরকে তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা অবলোকন করে।
শেষ পর্যন্ত গুরু যখন এলেন তখন অচলায়তনের গোঁড়া সদস্যদেরকে তিনি সত্যি সত্যি ভীষণ লজ্জায় ফেললেন, কিন্তু সেটা সম্পূূর্ণ ভিন্ন কারণে, দেখা গেল তিনি অচলায়তনের বিধি-ব্যবস্থা ও সনাতনী প্রথা মোটেই মানেন না, উল্টো সেটাকে ভেঙে ফেলতে চান। এ কাজে তাঁর সহায়ক শক্তি হচ্ছে দেয়ালের বাইরের শোণপাংশুরা, যারা কাজের লোক, কাজ খোঁজে, কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না, এবং কাজ না পেলে ভারি অস্থির হয়ে পড়ে। শোণপাংশুদের কাছে তিনি দাদাঠাকুর হিসেবে পরিচিত। শোণপাংশুদের তিনি নেতা, ওদের সঙ্গে তিনি খেলে বেড়ান। খেলতে খেলতে তাঁর মনে হয় ‘আমি ঝরনার সঙ্গে খেলছি, সমুদ্রের সঙ্গে খেলছি।’
শোণপাংশুদের একজন তার দলের সকলের পক্ষ হয়েই যেন বলে যে, দাদাঠাকুর যদি অচলায়তনের ভেতরে যান তাহলে সেখানকার পাথরগুলোসুদ্ধ নাচতে আরম্ভ করবে, পুঁথিগুলোর মধ্যে বাঁশি বাজবে। পঞ্চক বেরিয়ে এসেছে। তার বড় ভাই মহাপঞ্চক অচলায়তনের রক্ষাকর্তাদের মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে, পঞ্চককে সে নির্বাসনে পাঠায়। পঞ্চক ভাবে সে বেঁচে গেল। তার উপলব্ধি এই রকমের :‘খাঁচায় যে পাখিটা জন্মায়, সে আকাশকেই সব চেয়ে ডরায়।’ পঞ্চকের ভয়-ডর ভেঙে গেছে। শোণপাংশুরা ছাড়াও রয়েছে দর্ভক সমপ্রদায়। তারা সামান্য মানুষ। তাদের আস্থা ভক্তিতে। দাদাঠাকুরকে তারা চেনে গোঁসাই হিসেবে। অচলায়তন ভাঙার কাজে যারা বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে তারাও সম্মত। অচলায়তন সম্পর্কে দাদাঠাকুরের ঘোষণা :‘আমাদের রাজার আদেশ আছে, এদের পাপ যখন প্রাচীরের আকার ধরে আকাশের জ্যোতি আচ্ছন্ন করতে উঠবে তখন সেই প্রাচীর ধুলোয় লুটিয়ে দিতে হবে।’ প্রাচীরের ওপর রাজপথ তৈরি হবে, রাজপথ দিয়ে চলবে রাজার বিজয় রথ।
শীঘ্রই খবর আসে দাদাঠাকুরের অনুসারী শোণপাংশুরা অচলায়তনের প্রাচীর ফুটো করে দিয়েছে। মহাপঞ্চকের কাছে এ খবর মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। সে তার সঙ্গের লোকদের আশ্বাস দেয়; বলে শিলা কি কখনো জলে ভাসে। ‘ম্লেচ্ছরা অচলায়তনের প্রাচীর ফুটো করে দেবে। পাগল হয়েছ।’ তার প্রতীক্ষা এখনো গুরুর জন্য। সে আশা করে, গুরু এসে সব ঠিক করে দেবেন। তিনি আসবেন দ্বারপথে। কিন্তু উপাধ্যায় জানাচ্ছে যে দ্বারের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না, ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মহাপঞ্চক তবু হার মানবে না, তার ভরসা ভেতরে আছে লোহার দরজা।
অচলায়তনেরও একজন রাজা আছেন। নাম তার মন্থর গুপ্ত। রাজা খবর পেয়েছেন দাদাঠাকুরের দল অচলায়তনের রাজ্যসীমার প্রাচীর ভাঙতে আরম্ভ করেছে। পরে যখন শুনলেন উত্তর দিকের জানালা খোলা হয়ে গেছে, তখন বেচারার নিতান্তই বেহাল দশা, তিনি একেবারে বসে পড়লেন। বালকেরা কিন্তু মহাখুশি। তারা মজা পেয়েছে। হঠাত্ করেই যেন ছুটি পেয়ে গেছে। সবদিক থেকেই আলো আসছে, সব যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। সমস্ত আকাশটা ঘরের মধ্যে দৌড়ে এসেছে। খুশি নয় কেবল মহাপঞ্চক। সে দেখে যোদ্ধৃবেশে দাদাঠাকুর এসেছেন; পেছনে প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে অস্ত্রধারী শোণপাংশুরা যাদেরকে সে কর্মকাণ্ডহীন ম্লেচ্ছ ভিন্ন অন্যকিছু মনে করে না। বাইরের সব কিছুই যখন বেদখল হয়ে গেছে অপরাজেয় মহাপঞ্চক তখন তার নিজের ভেতর চলে যায়, ইন্দ্রিয়ের সমস্ত দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে প্রায়োপবেশনে বসে।
দাদাঠাকুরের দল লড়াই করেছে। বীরবেশে দাদাঠাকুরকে দেখায় অত্যন্ত মনোহর। ততক্ষণে দর্ভক দলও এসে পড়েছে। তারা শুনেছে অচলায়তনে লড়াইয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজন হয়নি। তার আগেই পতন ঘটেছে অচলায়তনের প্রাণহীন অবরোধের। আকাশে মেঘ করেছিল, বজ ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, এবার নেমে এল বৃষ্টি, যার জন্য শুকনো পৃথিবী প্রতীক্ষায় ছিল। দাদাঠাকুর বলেন, ‘ভাবনা নেই আচার্য, ভাবনা নেই আনন্দের বর্ষা নেমে এসেছে, বাইরে বেরিয়ে এলেই দেখতে পাবে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে।’ কিন্তু ওই যে ভেঙে ফেলা অচলায়তনকে সেটা ধ্বংসের
প্রয়োজনে নয়, সৃষ্টির প্রয়োজনে বটে। শোণপাংশুরা অস্থির হয়ে পড়েছে; তারা কাজ চায়। দাদাঠাকুর এবার তাদেরকে কাজ দেবেন গঠনের, মুক্ত অচলায়তনকে আয়তনে অনেক বড় করবার, যাতে সেখানে সকলেরই স্থান হয়, বাধা নিষেধ উবে যায়। এতে নেতৃত্ব দেবে পঞ্চকদাদা। পঞ্চকের গান
দিয়ে নাটকের শুরু, নবনির্মাণে নিযুক্ত হতে তার প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে নাটকের শেষ।
মধ্যযুগের ইউরোপের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল ইহজগিবমুখতা, যে রকম ঘটনা আমরা দেখলাম অচলায়তন নাটকে; ওই যুগের আরেকটি দিক গীর্জার সঙ্গে রাজপ্রাসাদের প্রচণ্ড বিরোধ। রবীন্দ্রনাথের একেবারে প্রথম দিকের নাটক বিসর্জন (১৮৯০); সেখানে ওই বিরোধটিকে আমরা
দেখতে পাব।
ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা গোবিন্দমাণিক্য রাজপুরোহিত রঘুপতির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে চান না। রাজমন্দিরকে তিনি মান্য করেন। কিন্তু পুরোহিত রঘুপতির কামনা তাঁর নিজের ক্ষমতা রাজপ্রাসাদের অধীনে থাকবে না, বরঞ্চ ছাড়িয়ে যাবে। রঘুপতির ক্ষমতা কম নয়। রাজ্যের মানুষ তাদের সঙ্কটে বিপদে ধর্মের আশ্রয় নেয়; আর ধর্মের আশ্রয় মানেই দেবীর কাছে আসা, সেখানে আছেন রঘুপতি, একাধারে মা কালীর সেবক ও তার রক্ষক হিসেবে। সেদিক থেকে রঘুপতির প্রতাপ রাজক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায়। স্বয়ং রাজমহিষী তার অনুগ্রহপ্রার্থী। রাজমহিষীর কোনো সন্তান নেই, তাই তিনি ঠিক করেছেন মন্দিরে একশ মহিষ ও তিনশ ছাগ বলি দেবেন। রাজায় রাজপুরোহিতে বিরোধের প্রকাশ্য সূত্রপাত এখান থেকেই।
বলির জন্য যে তিনশ ছাগ সংগ্রহ করা হয়েছে তাদের একটি অনাথ ভিখারি বালিকা অপর্ণার; সে মেয়ে মাতৃস্নেহে ওই ছাগ শিশুটিকে লালনপালন করেছে। রাজা গোবিন্দমাণিক্য যাচ্ছিলেন মন্দিরে, প্রবেশপথে অপর্ণার সঙ্গে তাঁর দেখা। অপর্ণার ছাগ শিশুটিকে রক্ষা করার অশ্রুময় নিবেদনে রাজা বিচলিত হলেন, তিনি নির্দেশ দিলেন এখন থেকে ত্রিপুরা রাজ্যে কোনো পশু বলিদান চলবে না। এতে রঘুপতির ক্রুদ্ধ হবার কথা, তিনি হলেনও, তাঁর ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে দেখে। রাজমহিষী ক্ষুব্ধ তাঁর সন্তান লাভের আশা নষ্ট হচ্ছে ভেবে। কিন্তু রাজা অনড়।
জয়সিংহ রাজপুরোহিত রঘুপতির পালিত রাজপুত যুবক, সে রাজমন্দিরের সেবক। তার ওপর ভার পড়েছে বলির পশু সংগ্রহের। অপর্ণা তাকে ডাকে। মন্দির থেকে বের হয়ে আসতে বলে। জয়সিংহ বিচলিত হয়। ক্রোধান্ধ রঘুপতি রাজভ্রাতা নক্ষত্ররায়কে প্ররোচিত করেন রাজাকে হত্যা করে মা কালীর রক্ততৃষ্ণা মেটাতে। নক্ষত্ররায়ের সাহস হয় না। তখন জয়সিংহের ওপর আদেশ আসে রাজরক্ত সংগ্রহের। জয়সিংহকে অপর্ণা আবারো ডাকে মন্দির ছেড়ে চলে আসতে। ‘তুমি চলে এসো জয়সিংহ, ও মন্দির ছেড়ে দুজনে চলে যাই।’ জয়সিংহ দ্বিধায় পড়ে। দেবীপ্রতিমাকে সে বলে, ‘তোমার মন্দিরে এ কী নতুন সঙ্গীত/ ধ্বনিয়া উঠিল আজি, হে গিরিনন্দিনী/ হে শোভনে, কোথা এ মন্দির ছেড়ে/ কোথায় আশ্রয় আছে?’ শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করে তার নিজের দেহেও যেহেতু রাজরক্ত আছে, তাই গোবিন্দমাণিক্যের রক্তের পরিবর্তে নিজেদের রক্ত অর্পণ করে দেবীর রক্ততৃষ্ণা নিবারণ করবে। আর ঠিক সেটাই করল সে। জয়সিংহের মৃতদেহ দেখে অপর্ণা মূর্ছা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারই জয় হয়। জয়সিংহকে হারিয়ে রঘুপতি অপর্ণার মধ্যে নিজের জননীকে দেখতে পায়, পাষাণের কালীমূর্তিকে সে গোমতী নদীতে নিক্ষেপ করে। অপর্ণা তাকে পিতা বলে সম্বোধন করে মন্দির থেকে বের হয়ে আসতে বলে। রঘুপতি তাই করে।
ইতিমধ্যে গোবিন্দমাণিক্যও অবশ্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের দায়ে ভ্রাতা নক্ষত্ররায়কে তিনি অষ্টবর্ষের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন; রঘুপতিকেও সেই একই দণ্ড দিয়েছিলেন, যে জন্য রঘুপতি রাজরক্ত সংগ্রহের জন্য জয়সিংহকে আদেশ করেছিলেন। নির্বাসিত নক্ষত্ররায় মোগলসেনাদের হাতে পড়ে যায়, এবং তাদের প্ররোচনায় রাজাকে নির্বাসন দণ্ড দিয়ে পত্র পাঠায়। যুদ্ধ অবধারিত ছিল, কিন্তু গোবিন্দমাণিক্য রক্তপাত চান না, তাই তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। তাঁর সঙ্গে রাজমহিষী গুণবতীও যোগ দেন।
জয় ভিখারিণী অপর্ণারই। অপর্ণার অন্য কোনো সমপদ নেই। কিন্তু রয়েছে আহ্লাদ, মমতা, ভালোবাসা। রঘুপতি ধার্মিক নয়, ধর্মব্যবসায়ী। তার আসক্তি ক্ষমতায়। নিজের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য মদ্যপান করে। রাজ্যের সাধারণ মানুষকে সে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে দেবীর পূজায় বিঘ্ন ঘটলে হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটবে, রাজ্য মুসলমানদের হয়ে যাবে। তার পরাজয় গোবিন্দমাণিক্যের কাছে নয়, গোবিন্দমাণিক্য তাকে অষ্টবর্ষের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে তিনি নক্ষত্ররায়ের সান্নিধ্য পেতেন এবং রাজত্ব দখলের ষড়যন্ত্রে অনায়াসে অংশীদার হয়ে পড়তেন। রাজপুরোহিত
পরাজিত হয় ভিখারিণী অপর্ণার কাছেই। যাকে সে গালমন্দ করত, দুর দুর করে তাড়িয়ে দিত, তাকেই জননী বলে গ্রহণ করেছেন। জয়সিংহের আত্মাহুতিই ধরিয়ে দিয়েছে ক্ষমতালিপ্সার প্ররোচনায় কেন রঘুপতি নৃশংস ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
গোবিন্দমাণিক্যের ভেতর একজন সন্ন্যাসী ছিল, এমনটা বলা যায়; কিন্তু তিনি যে স্ত্রীর অনুরোধ, পুরোহিতের ষড়যন্ত্র, প্রজাদের অসন্তোষ সব কিছুকে উপেক্ষা করে জীব বলিদান নিষিদ্ধ করে দিয়ে সহস্র বছর ধরে প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন সেই শক্তিটা পেলেন কোথায়? পেয়েছেন ওই অপর্ণার কাছ থেকেই। রাজার নিজের উক্তি এই রকমের : ‘বালিকার মূর্তি ধরে/ স্বয়ং জননী মোরে বলে গিয়েছেন/ জীবরক্ত সহে না তাঁহার?’ জয়সিংহ পারত মন্দির ত্যাগ করে অপর্ণার সাথে পথে চলে আসতে, রক্তকরবীর রাজা যেমন ভাবে বেরিয়ে এসেছে নন্দিনীর পিছু পিছু, কিন্তু কিশোর জয়সিংহের ভেতরে অতটা শক্তি ছিল না। চূড়ান্ত বিচারে মন্দিরের দেবী মা কালীও পরাভূত হয়েছে অপর্ণার কাছেই। ওই দেবী পাষাণ প্রতিমা, অপর্ণা মূর্তিমান মানুষ। অপর্ণার কারণেই নিষিদ্ধ হয়েছে জীব বলিদান, পাষাণমূর্তি নিক্ষিপ্ত হয়েছে নদীতে।
অপর্ণা যেন রক্তকরবীর নন্দিনীর পূর্বাভাস। নন্দিনীর তুলনায় তার সাফল্য অধিক। নন্দিনী একজন রাজাকে মুক্ত করেছে, পুরোহিততন্ত্রের আধিপত্যকে পরাভূত করে। অপরদিকে অপর্ণা মুক্ত করতে পেরেছে একটি রাজ্যকে। দুজনের সাফল্যের ভেতর এই যে পার্থক্য সেটা যে তাদের চরিত্রের ব্যক্তিগত গুণের ব্যবধানের দরুন তা নয়; আসলে দুজনের শত্রু ছিল দু রকমের। নন্দিনীকে লড়তে হয়েছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, যেটি অনেক বেশি সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। অপর্ণার লড়াইটা ছিল পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে—যেটি ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তবে এদের দুজনের সঙ্গেই অন্যরাও ছিল; অপর্ণা পেয়েছে রাজা এবং জয়সিংহের সাহায্য, নন্দিনীর পক্ষে ছিল রঞ্জন, বিশু এবং পরে ফাগুলাল।
রবীন্দ্রনাথ নেতায় বিশ্বাস করতেন এটা সত্য। কিন্তু তাঁর নাটকে নেতার একক শক্তিতে পরিবর্তনগুলো ঘটে না। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই অন্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। নন্দিনী সফল হতো না রঞ্জন, বিশুপাগলা ও ফাগুলালের দলবলের সাহায্য না পেলে। অচলায়তনে দাদাঠাকুরের সঙ্গে শোণপাংশুরা আছে, দর্ভকরাও যোগ দিতে প্রস্তুত। মুক্তধারায় শিবতরাইয়ের মানুষের দলে বলে এগিয়ে আসছিল, বাধা দিলে জোর লড়াই হতো। রাজাতে রাজার সৈন্যদল প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে, প্রয়োজনে কাজে লাগাত, উত্পাত সৃষ্টিকারী বহিরাগত রাজাদের সেটা অজানা ছিল না। তাসের দেশে একে একে সবাই বিদ্রোহ করে, রাজা তখন নিজেও চলে যায় নির্বাসনে, রানির পিছু পিছু। বিসর্জনের অপর্ণা জয়ী হয় রাজা গোবিন্দমাণিক্য এবং জয়সিংহের সহায়তা পেয়ে। আর রথের রশিতে রথ যে চলে সে তো শূদ্রদের সমবেত অংশগ্রহণের কারণেই। এই যে সামাজিকশক্তি এর ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শক্তি না থাকলে কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিবর্তন যে অসম্ভব রবীন্দ্রনাথের নাটক থেকে অত্যন্ত জরুরি সেই বার্তাটা পাওয়া যায়।
ঘটনা আরো একটি রয়েছে। সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেটা হলো রাষ্ট্রীয়ও সামাজিক পরিবর্তন যে শুধু হূদয় পরিবর্তনে সম্ভব নয় এই ধারণার উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাটকে ভয়াবহ রকমের কোনো রক্তপাত ঘটে না; তার একটা কারণ প্রতিপক্ষের দুর্বলতা; কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ হচ্ছে পরিবর্তনকামীরা প্রয়োজনে সহিংসতার পথ গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে শত্রুপক্ষের এই উপলব্ধি। অচলায়তনের দাদাঠাকুরকে দেখি যোদ্ধৃবেশে উপস্থিত হয়েছেন, রাজা নাটকে ঠাকুরদার সাজসজ্জাও সেনাপতিসুলভ। রক্তকরবীর বিদ্রোহীরা বন্দিশালা ভেঙে ফেলে। রথের রশির রথ যখন চলতে শুরু করে তখন প্রচুর ভাঙচুর ঘটে, আগুনও দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ সহিংসতার পক্ষপাতী নন, কিন্তু হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসা অবলম্বন যে কার্যকর হবে না তাঁর সে বিশ্বাস রবীন্দ্রনাটকে অনুপস্থিত নয়।
মানুষের অগ্রগতিকে প্রতিহত করে যে শক্তি তার বিরুদ্ধে সমবেত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান তো কেবল শত্রুপক্ষের তাত্ক্ষণিক পতনে ঘটবে না, তার জন্য যা আবশ্যক সেটি হলো সম্পদের মালিকানায় ও বিতরণে সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। সেই সমাধানের কথা স্থূলভাবে বলে দেওয়াটা শিল্পীর কর্তব্য নয়; কিন্তু তার ইঙ্গিত যে রবীন্দ্রনাটকে নেই তাও বলা যাবে না। বঙ্কিমচন্দ্র একদা বলেছিলেন, ‘আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি।’ রবীন্দ্রনাথ তেমন কথা বলেন না। তাঁর নাটক আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে যে তিনি পরিবর্তনের পক্ষে। তিনি জানেন যে ঝরনায় পাঁক জমে যদি সে বহমানতা হারায়। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ তাঁর ঈপ্সিত। মানুষে মানুষে বৈষম্যের তিনি বিরোধী। তবে শ্রেণি-ব্যবস্থার অবসানের কথা তাঁর নাটকে বলা নেই। শ্রেণি থাকবে, কিন্তু সমাজে ভারসাম্যের প্রয়োজন হবে, সমাজের কর্তৃত্ব কোনো বিশেষ শ্রেণির দিকে ঝুঁকে পড়লেই বিপদ। শ্রেণি-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে ভারসাম্য বজায় রাখা যে সম্ভব নয়—ইতিহাস অবশ্য তার সাক্ষ্য দেয়। সে জায়গাটা পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের নাটক যায়নি।
শিক্ষার মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনে রবীন্দ্রনাথের আস্থা অবিচল ছিল। কিন্তু শিক্ষা নিজেই যখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায় তখন তার দশাটা কী হয় সে ছবি অচলায়তন, মুক্তধারা ও তাসের দেশে বিশেষভাবেই রয়েছে। যথার্থ শিক্ষার জোর আছে, কিন্তু শিক্ষাকেও মুক্ত করা চাই এবং মুক্ত করবার সে লক্ষ্যে বলপ্রয়োগ যে অপরিহার্য রবীন্দ্রনাথ তা মানেন। v
