মুক্তাগাছায় ভরাট হচ্ছে ‘দাম’ হুমকিতে স্বাদু পানির মাছ

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৫
আমাদের দেশের হাওর বিলের সংখ্যা যেমন কমছে, কমছে এগুলোর আয়তনও। এতে স্বাদু পানির মাছ কৈ, মাগুর, সিং, ট্যাংরা ইত্যাদি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। অধিকাংশ হাওর বিলে সারা বছর পানি থাকে না। চৈত্র-বৈশাখে অধিকাংশ হাওর বিল শুকিয়ে যায়। কিন্তু বিলের একেবারের তলায় এক বা একাধিক কাদামাটির গভীর খাদ থাকে। কাদা জলের এই খাদকেই স্থানীয় ভাষায় বলে ‘দাম’। খরায় বিলের চারদিকে চৌচির হয়ে গেলেও এই দাম শুকিয়ে যায় না। শীতে বিলের পানি কমতে থাকলে মাছগুলো এই দামে শীতনিদ্রায় যায় । খরা মৌসুমে চৌচির বিলের মধ্যখানে কাদা মিশ্রিত জলাধার একটি বিস্ময়কর ভূতাত্ত্বিক বিষয়। দামের কাদামাটিতে এক ধরনের লতানো উদ্ভিদের ঘন ঝোপ জন্মায়, যার জন্য সূর্যালোক ভেতরে প্রবেশ করে না। এই কাদাজলের গভীরতা তিন ফুট থেকে তিরিশ ফুট পর্যন্ত হতে দেখা যায়। এই লতানো উদ্ভিদে ঢাকা দামের ওপর কোন মানুষ, গরু-ছাগল বা বন্যপ্রাণী ভুলবশত উঠে পড়লে এই কাদাজলে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। গ্রাম-গঞ্জে দামে গরু-ছাগল হারিয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়। অর্থাত্ এই কাদাজল চোরাবালির মত ভয়ংকর। ভারি যে কোন প্রাণিই তলিয়ে যেতে পারে। বর্ষার নতুন পানিতে এসব মাছই ছড়িয়ে পড়ে। ভরা মৌসুমে হাওর বিলে অগণতি মাছের উত্স এসব মাছই। তাই হাওর বিলের মাছের জননাধার হিসাবে এই দামের কোন বিকল্প নেই। ইদানিং কিছু মাছ ব্যবসায়ী বালি মাটি দিয়ে এসব দাম ভরাট করে মত্স্য খামার তৈরি করছে। যার ফলে দামের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব দামের শতকরা একশ ভাগই খাস জমি। হালে সরকারি খাসজমি বিতরণ প্রকল্পের কারণে এসব দাম ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাচ্ছে। দামের জমি আবাদ করার লক্ষ্যে বালি বা দো-আঁশ মাটি দিয়ে এসব দাম ভরাট করে ধান চাষ করা হচ্ছে। মুক্তাগাছার রসুলপুর বনের পাদদেশে আবহমান কালের বড় বড় দাম যেমন; বড়িল, ধনরা, হাওদা, কাজলকোঠা, চিতল প্রভৃতি ভরাট করে ধান চাষ করা হচ্ছে। তেমনি সারাদেশে সম্ভবত শতকরা ৮০ ভাগ ছোট-বড় বিলের দামগুলো ভরাট করা হয়েছে। এটি বিলজ মাছের জন্য অশনিসংকেত। দাম বিষয়ে অনেক কথা বিল পাড়ের বাসিন্দাদের মুখে মুখে শোনা যায়। অনেক উপাখ্যানও প্রচলিত আছে। সাগর-দিঘি, কমলা রাণীর দীঘি ইত্যাদিতে রাজকন্যার সলিল সমাধির কথা জানা যায়। প্রকৃতপক্ষে এসব কাহিনী দামে কোন সুন্দরী রমণীর ডুবে যাওয়ার স্মৃতির অপভ্রংশই। অন্যদিকে এই দামের মাটিতে হাঁটলে সমূহ অমঙ্গলের বার্তা সবারই জানা। এমনই কিছু কুসংস্কার বিল পাড়ের খেটে খাওয়া মানুষদের রয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত মানুষরা এমন কুসংস্কার নেই বলেই বিলের এসব মাছকে ‘বাজে মাছ’ বলে চিহ্নিত করেন এবং দাম ভরাট করে মত্স্য চাষের উদ্যোগ নেন। এহেন প্রকল্পগুলো বিলজ মাছের জন্য মহামারীর চাইতেও ভয়ংকর। বিল পাড়ের মানুষের মঙ্গল-অমঙ্গলের বিশ্বাসে আবহমানকাল ধরে টিকে থাকা প্রাকৃতিক মাছের জননাধার এই দামগুলো বেদখল না হোক এই কামনা পরিবেশবাদীদের।