উপকূলের আতঙ্ক বাইশ্যা ডাকাত গ্রেফতার

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৬
উপকূলীয় অঞ্চলের অঘোষিত সম্রাট হিসেবেই তার পরিচিতি। পূর্বে কুতুবদিয়া, মহেশখালী থেকে পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত। বিশাল জলসীমায় তার দাপটে ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের। নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি মাসে বোট মালিকদের কাছে টোকেন বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সে। চাঁদা না দিলে জেলেদের হাত-পা বেঁধে সাগরে ভাসিয়ে দিতে তার হাত কাঁপতো না। তারপর মাছ ধরার সরঞ্জামসহ পুরো বোট ছিনতাই করে নিয়ে আসতো নিজের আস্তানায়। দুর্ধর্ষ এ জলদস্যুর নাম আবদুল হাকিম। উপকূলীয় এলাকায় তার পরিচিতি বাইশ্যা ডাকাত হিসেবে। গত প্রায় একযুগ ধরে উপকূলীয় এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক বাইশ্যা ডাকাত অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। গত সোমবার রাত নয়টায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া গ্রামে আবদুল্লাহর দোকান এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে বাইশ্যা ডাকাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে পুলিশ বাইশ্যা ডাকাতের বাড়ির চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এসময় সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পুলিশের কাছে আত্মসমপর্ণের পর বাইশ্যা নিজেকে হার্টের রোগী দাবি করে নির্যাতন না করার অনুরোধ জানায়। তার গ্রেফতারের সংবাদে উপকূলীয় এলাকার জনগণ বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত বাইশ্যা ডাকাতের বিরুদ্ধে খুন ও ডাকাতির অভিযোগে বাঁশখালী থানায় ১২টি এবং কক্সবাজারে বিভিন্ন থানায় চারটিসহ মোট ১৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের মার্চে। ২৫ মার্চ বাঁশখালীর ৪২ জন জেলে তিনটি ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। পরদিন জলদস্যুরা ট্রলারে হামলা চালিয়ে ৩৬ জন জেলেকে হাত-পা বেঁধে সাগরের পানিতে ফেলে দেয়। পরে বাঁশখালী-কুতুবদিয়া উপকূলে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩১ জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি বাইশ্যা ডাকাত। গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর কোস্টগার্ড বাইশ্যা ডাকাতের বাড়ি ঘেরাও করে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় বাইশ্যার গুলিতে কোস্টগার্ড সোর্স সুফী আলম নিহত হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া বাইশ্যা বাহিনী ২০১১ সালে খুদুকখালী, ছোট ছেনুয়া ও শেলবন এলাকায় ১১ জেলেকে হত্যা করে লাশ সাগরের পানিতে ফেলে দেয় বলে পুলিশ জানায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র আরো জানিয়েছে, বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকায় রিফিউজি ঘোনায় সরকারি খাসজমি ও চিংড়ি ঘেরের দখল নিয়ে স্থানীয় সিদ্দিক মাস্টার বাহিনীর সঙ্গে খুদুকখালী বাহিনীর প্রায়ই সংঘর্ষ হত। বাইশ্যা খুদুকখালী বাহিনীর হয়ে এই সংঘর্ষে অংশ নিতো। পরে সে ওই বাহিনীর নেতৃত্ব তার হাতে চলে আসে। এরপর ধীরে ধীরে সে গড়ে তোলে জলদস্যু বাহিনীর নেটওয়ার্ক। ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় বাইশ্যা ডাকাত গ্রেফতার হয়ে ১১ মাস জেলে ছিল। এরপর ২০১০ সালে সে খুদুকখালী এলাকায় অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। তখন সাত মাস জেলে খেটে জামিনে বের হয়ে আসে। বাইশ্যা ডাকাতরা নয় ভাইবোন বোন। পুলিশ জানায়, বাইশ্যার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে রহিমা নামে এক বোন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে। বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, উপকূলীয় এলাকার স্বঘোষিত সম্রাট বাইশ্যা ডাকাতের নামে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা তটস্থ থাকত। কেউ তার নাম ভয়ে মুখে আনতো না। তাকে ধরার জন্য দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ, র্যাব ও কোস্টগার্ড তত্পর ছিল। গত তিন মাস কঠোর নজরদারির পর সোমবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন বাইশ্যা ডাকাত গ্রেফতার হওয়ার পর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার গতকাল মঙ্গলবার সকালে তার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন। এতে তিনি বলেন, বাইশ্যা ডাকাত খুবই নিষ্ঠুর এবং ধূর্ত প্রকৃতির। হাফিজ আক্তার আরো বলেন, বাঁশখালী, আনোয়ারা, মহেশখালী, কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় এলাকার জেলেদের কাছে বাইশ্যা ডাকাত জীবন্ত ত্রাস। তার বিশাল বাহিনী আছে। যখন কাজ থাকে না তখন জেলেদের কেউ কেউ বাইশ্যার বাহিনীতে যোগ দেয়। তাকে গ্রেফতারের পর উপকূলে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এদিকে মঙ্গলবার এসপি অফিসে আনার সময় বাইশ্যা ডাকাতকে পুলিশ হেফাজতে অনেকটা নির্বিকার অবস্থায় দেখা যায়। সাংবাদিকদের সামনে বাইশ্যা ডাকাতির সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে।