গল্প

নিজস্ব শেকড়

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৩৮

আমাদের প্রিয় দাদা কেশব গুপ্তের জীবনাবসানের খবর পাই মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুত্ চলে যাওয়া নিবিড় অন্ধকারে। মোবাইল ফোনে মৃত্যুর কথা জানায় জুবায়ের। ক’বছর হলো ঢাকার বাস তুলে কেশবদা ফিরে যান তাঁর নিজস্ব পৈতৃকভিটে ফেনীর পাড়াগাঁয়ে। অশক্ত শরীরের বয়সী দাদার আটপৌরে নিঃসঙ্গ দিনযাপন চলছিল পুরনো বিবর্ণ দেয়াল-ছাদের দুই খোপের ভাড়া বাসায়। বহু বছর হলো তাঁর স্বজনদের স্থায়ীবাস ওপার বাংলায়। এলাকার প্রাচীন বংশের এই তিনি হারিয়ে-ফুরিয়ে অসচ্ছল অবস্থায় থেকে গেছেন স্বভূমিতে। গুণগ্রাহী স্নেহাস্পদ কেউ কেউ সময় খরচের উদ্দেশ্যে কখনো কাকরাইলের পাইওনিয়র রোডে কেশবদার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে থাকে মুখরোচক খানাপিনা। মলিন আলোর মধ্যে এক রাতের ঘটনাময় আড্ডার স্মৃতি সহসা আমার মধ্যে উত্থিত হয়।

রঙ-জ্বলা ক্ষয়াটে কাঠের সিঁড়ি; আর মরচেধরা সরু রডের খরখরে রেলিং নিচ থেকে দোতলায় উঠেছে। দোতলা মানে সেকেলে আমলের চুন-সুরকির বাড়ি—সিলিং থেকে হঠাত্ পলেস্তারার চাক খসে জমিয়ে রেখেছে রুমের অসুস্থতা। ঢাকার ঝকঝকে পালিশময় পাইওনিয়র রোডের সামনে-পাশে আকাশে ঘাড় তোলা বিশাল সরকারি দপ্তর, মোড় ফিরলেই নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, কংক্রিট-ইট-কাঠ-টাইলসের জৌলুশের পাশে পুরনো এই বাড়িটা বেমানান, দেখতেও বাজে। শ্রীহীন বাড়ির পেছনের অংশের দোতলার ছোট্ট দু রুমে দাদার একাকী বহু বছরের দিনক্ষয়ী জীবন। বাইরের আলো জামরুল, আমগাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে বারান্দার কাছাকাছি এসে থমকে যায়, ভেতর অব্দি পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রুমে সার্বক্ষণিক টিমটিমে বাল্ব জ্বলে; ফ্যাকাসে ওই আলোয় দাদার চেহারার ছায়া দূর হয়েছে কি না বোঝা দুষ্কর। বিছানার ওপর গোটা চারেক বিড়াল আশি-ঊর্ধ্ব নিঃসঙ্গ দাদাকে ঘেরাও করে শুয়ে থাকে, যেন বুড়োর জন্য পাহারার দায়িত্ব নিয়েছে। পায়ে পায়ে ঘোরা বিড়ালগুলো খাওয়ার সময় দাদার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। নিজে প্লেট থেকে খুটে খুটে যা খান, তার চেয়ে বেশি দাদা বিড়ালদের দেন। দুপুরে গুমোটভর্তি রান্নার রুমে হাঁসফাঁস শ্বাস ছড়িয়ে ছুটা কাজের বুয়া রান্না করে—কিসের রান্না, লবণজলের সিদ্ধই বলা যায়। কোনো দুপুরে কোনো রাতে ফাও খাওয়া নিজাম বা সিরাজ এজিবি অফিসের ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার থেকে দাদার টাকায় মাছ-তরকারি কিনে আনে। বাসি তরকারির দাম কম। এমন তরকারি, মলা-ঢেলা-পুঁটি-ট্যাংরা ছোট ছোট মাছ এই বাসায় রোজ ঢুকছে। সিরাজ বা নিজামের বাসার বাজারের ব্যাপারে আগ্রহ খুব। দাদা নির্বিকার। তাঁর পেটভর্তি হলেই ব্যস, অল্পেই খুশি তিনি। নিত্য আয়ু যাপনে বাড়তি কোনো চাওয়া বা সাধপূরণের ইচ্ছা তাঁর নেই। শুধু বনেদি বংশের ফতুর হয়ে যাওয়া এই মানুষটি সেই কবেকার নাছোড় অভ্যাসে সপ্তাহের কোনো কোনো রাতে কয়েক পেগ বিভোর উপযুক্ত রস পেলে মহাখুশি। তাঁর বুড়ো হাড্ডির মোড়ে মোড়ে সামর্থ্য বুঝি চালু হয়। তার তেজে খণ্ড খণ্ড ঘুম জোড়া লেগে মাখো মাখো এক আরাম এনে দেয়। কদমে কদমে এলোমেলো ভাব নেই, হাঁটাচলা বেশ উচিত রকমেরই মনে হয়। নিজেকে তখন আসল দাদাই তিনি ভাবেন। বাড়িওয়ালা জীবত্কালে মান্যিগণ্যি করে তাঁকে দাদা ডেকেছে, তাঁর দু ছেলেরও এখন দাদা তিনি, নিচের অফিসের পিয়ন-দারোয়ান-কেরানি সবার দাদা, দেয়ালের ওধারের ছাউনির বাচ্চাকাচ্চাদের দাদা, সামনে ফুটপাথের টং দোকানদারদের দাদা—সর্বজনের আন্তরিক দাদা সম্বোধনের আড়ালে আসল নাম তাঁর চাপা পড়েছে। সমবয়সী কোনো পুরনো সখা হঠাত্ দেখাসাক্ষাতে এলে কাঠের সিঁড়ির মাথায় চাহনি টেনে নিচে কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করে, ‘কেশব বাবু কি আছেন?’ নিজস্ব চৌখুপিতে নিঃশব্দ আউল এই মানুষটি বেশিরভাগ সময় লোকের চোখের বাইরে থাকলেও ইদানীং তিনি কাহিল শরীর টেনে হলেও গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করছেন। ঘটনা কী? পরিষ্কার কিছু জানা না গেলেও কেউ বলে গাছ, কেউ ধান, কেউ বলে জমি বেচতে তিনি বাড়ি গেছেন। হতে পারে হাতের পাঁচ ফুরিয়েছে। ঢাকায় বসবাসের খরচ আছে না।

সকাল সকাল ঘাড়ে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে রিকশা নিয়ে দাদা চলে যান আন্তঃজেলা বাস স্ট্যান্ডে। তাঁর হিসেবে প্রায় ষাট বছরের উপরে তিনি বাসে যাতায়াত করে আসছেন। তখন ঢাকা কি ফেনী—কোথাও বাস টার্মিনাল ছিল না। আরে, দূরপাল্লার বাসই ছিল কই! তাঁর এলাকার নির্দিষ্ট বাসে বসার জন্য সিট সবসময় পাওয়া গেছে। এই যে মাঝেমধ্যে বাড়ি যাওয়া, ক’দিন পর আবার ফেরা, এমন চলাচলের সুবাদে হেলপার-ড্রাইভারের একই মুখ দেখাদেখি, খণ্ড খণ্ড আলাপ, পরে সখ্য গড়ে ওঠে। মানুষের ফিসফাস, কথা চালাচালির কারণে নিয়মিত বাসযাত্রী কি বাসের কর্মচারীরা জ্ঞাত হয় যে, দাদা সম্পদশালী ঘরের এক চিরকুমার। এমন মুরব্বি, সাধু চেহারার মানুষটির বিশেষ কদর অবশ্যই প্রাপ্য। কখনো কখনো বাসযাত্রায় বাসের কর্মীরা ভালোবেসে কলা-শসা তাঁকে খেতেও দেয়।

থানা সদরের চলনসই বড় রাস্তার মোড়ে বাস থেকে নেমে দাদা ভ্যান চড়ে যান নিজ গ্রামের মুখে। পুরনো ইট বিছানো সরু রাস্তার দু পাশের রোদ-ছায়ার জড়াজড়ির মধ্যে কুলীন পায়ে হাঁটার পর নিজেদের টিনের দোচালা—গুপ্ত বাড়ি। উত্তর-পশ্চিমে বাগান, তার নিচে ধানের জমি, ওই জমি ও বাগান ভাগ করেছে একটা পগার, সীমানার নালায় কখনোই বারো মাস জল থাকে না, প্যাঁচপ্যাঁচে কালো কাদায় ভর্তি, এরই মাঝামাঝি উপরে ঢিবির মতো খণ্ডের পাশে পোক্ত বড় গাছটা বিক্রি করে দাদা চার মাস আগে ত্রিশ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। দূরের কাঁহা কাঁহা মুল্লুকের টুকরো টুকরো যে ধানীজমি ছিল, আগেই তিনি বেচেছেন। বিক্রি আর ঠিক হবে কি না, কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই বাড়ির সীমানার কাছাকাছি জায়গা বাজার চলতি দামের চেয়েও কমে তিনি ছেড়ে দেন। ঢাকা শহরে খরচ তাঁর অনেক। তা বাদে গ্রামে গাছগাছালি, জমিজমা রেখে হবে কী, বাড়ির অংশীদার বলে এখানে কেউ নেই, ছয় যুগ আগে মা-বাবা মরেছেন, একে একে ভাইবোন দেশত্যাগ করে ভারতে গিয়ে ওখানেই তাঁরা প্রতিষ্ঠিত। শতবার হাত ধরে তাঁদের কত অনুরোধ, কখনো ভাই-ভাইপোরা বেড়াতে এসে কেঁদেকেটে উপর্যুপরি অনুনয় করেছে—কিসের কী, তাঁর সাফ কথা, ওই পারে গিয়ে স্থায়ী হতে অনিচ্ছুক, একা হলেও এখানেই থাকবে। দাদাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতর রেখে মহাবিরক্ত আত্মীয়-স্বজনরা যাঁর যাঁর ডেরায় ফিরে গেছেন।

এজিবি অফিসের উল্টো পাশে দুর্বল পুরনো দেয়ালের বাইরে বড় বড় পাতার কয়েকটা মোটা উঁচুগাছ, তার ওধারে বাঁশের বেড়ার জংধরা টিনের ছাপরা, বাস অনুপযোগী জায়গাটা আদৌ রাজধানীর বুকের অংশ বলে ভ্রম হয়। বরাবর আড়ালে মুখ ফিরিয়ে রাখা এখানের ছুটা বাসিন্দারা একপাল গরু পোষে, রোজ বালতি ভর্তি দুধ বেচে। দুপুরের চড়া রোদে এই গরু ও গোবরের মিলিত দুর্গন্ধে গোটা এলাকা নির্যাতিত হয়, তখন পথচারী, টং দোকানি কি অফিসের মানুষজন নিয়মিত গালিগালাজ করে মুখ সচল রাখে।

এখানকার সবচেয়ে কাছের একটানা গৃহবাসী দাদা কিন্তু চুপ। ওই চালা অংশের ঢোলা নোংরা জামাপ্যান্ট পরা মলিন চেহারার বাচ্চাকাচ্চা কতগুলো বুকে বইখাতা জড়িয়ে দাদার কাছে লেখাপড়া শিখতে আসে। দাদা নিজ শরীরের হাল বুঝে ফ্লোরে বসিয়ে অকাতরে জ্ঞানদান করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বইয়ের চেয়ে বাচ্চাগুলোর নজর রান্নাঘরের উদ্দেশে বেশি বেশি যায়। দাদা কখন তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবেন। দাদাও এই দুস্থ বাচ্চাদের খাইয়ে দারুণ আনন্দ পান। রান্নার মহিলা যে দিন আসে না, লোকের অভাবে দাদা শরীরের কাঁপুনি ঠোঁটেমুখে চেপে বাচ্চাদের জন্য লজেন্স-বিস্কুট, নিজের জন্য রুটি নিয়ে আসেন। এই শিশুদের সঙ্গে খাইয়ে আছে আবার বিড়ালগুলো। বিড়ালগুলো বছর বছর বাচ্চা দিচ্ছে আর তাদের হারিয়ে ফেলছে। কয়েকটা বয়সী বিড়াল দাদাকে ছেড়ে কোথাও যায় না। কখনো দাদা নিচে এলে বিড়ালগুলোও নেমে তাঁর পায়ের পাশে ঘুরঘুর করে। বিড়ালদের জন্য আছে দুধের খরচ। সপ্তাহে দিনদুই মাছের বরাদ্দও থাকে। দাদার দোতলার সোজাসুজি সামান্য তফাতে অফিসের পিয়ন সালামতকে তিনি বারান্দায় এসে ডাকেন। বিষয় কী? ‘দ্যাখো, বিড়ালের জন্য ভালো কিছু খাবার না আনলে নিরীহ প্রাণীগুলো অভুক্ত থেকে নাকি অভিমান প্রকাশ করে।’ সালামত তাঁর চোয়ালের হাসি পারলে সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে চায়। দাদা একা মানুষ, তাঁর টাকা খাবে কে, এখন বিড়ালই খাচ্ছে।

হঠাত্ হঠাত্ রাতের আড়ালে দু-তিনজন যুবক ফুর্তিবাজ দাদার বাসায় এসে হাজির হয়। এঁরা জানে, বহুদর্শী মানুষটা এখনো ঘুমায়নি, তাঁকে সঙ্গে রেখে জোর দুই-তিন ঘণ্টা আমোদ করা যাবে। তাঁরা ড্রিঙ্কসের বোতল, পরাটা-কাবাব, চানাচুর-চিপস্ নিয়ে আসে। বোতল না আনলেও ভোগ সন্তোষে ঘাটতি নেই। নিয়মিত ঝাঁট না-পড়া দাদার ভেতরের রুমের কাঠের আলমারি নামের দাঁড়ানো তক্তার খোসার মধ্যে তাঁরাই বিভিন্ন সময়ে কিছু না কিছু হুইস্কি-ভদকা-জিন তুলে রেখে গেছে। ওই যথেষ্ট। এক বা আধ পেগ, কোনো বোতলের তলানি ঢেলে-ঝেড়ে নিলে কজনের দিব্যি চুর নেশা জমে। দাদার ছোট্ট ফ্রিজটা অনেকদিন ধরে নষ্ট; আর মেরামত হয়নি। অচল ফ্রিজটা রুমের এককোণে পড়ে আছে। ঠাণ্ডা জলের বোতলের জন্য ফ্লোরে শুয়ে রাত পার করা নিজাম ছেলেটাকে পেছনে বাড়িওয়ালার বাসায় পাঠাতে হয়। মরহুম বাড়িওয়ালার দুই ছেলের মধ্যে কাবু-কাতরা ছোটটা সাইফুল এখন বাড়ি দেখভাল করে। ঠাণ্ডা জলের বোতল দরকার শুনে সে পরিষ্কার বোঝে—দাদার বাসায় মউজ করা মেহমান এসেছে। দুটো কচি বয়সের ছেলে রেখে বাড়িওয়ালা আকস্মিক মারা গেলে এই দাদাই এঁদের আগলে রেখেছেন, ট্যাটন আত্মীয়দের ছোঁ-মারা ফন্দি থেকে সহায়শূন্য দুই বালকের সম্পত্তি রক্ষা করেছেন। দাদার জন্য এঁদের তাই আলাদা মহব্বত আছে। কিন্তু আজকাল ছোটটা—ইঁচড়েপাকা সাইফুল হুটহাট বেয়াড়া আচরণ কি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা লঘু কথা বললে দাদা সিদ্ধান্ত নেন, না আর ঢাকায় না, এবার গ্রামে ফিরবেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

বছর এগারো আগে, এই পাইওনিয়র এলাকায় এত কোলাহল, যানবাহন, উঁচু উঁচু নতুন বিল্ডিং ছিল না; অনেকটা নিরিবিলি পরিবেশ ছিল, তখন দাদা থাকতেন নোনাধরা বাড়িটার নিচতলার সিঁড়িলাগোয়া পাশের রুমে। এক রুমে একে অন্যের নিঃশ্বাসের ছোঁয়ার মধ্যে থাকত তাঁর দুই ভাইপো। বাসা থেকে গিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তারা পড়াশোনা করত। তাঁদের থাকা, খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ অকাতরে দাদা ব্যয় করেছে। পাশের পর চাকরি পেয়ে এক ভাইপো বউ নিয়ে এখন আছেন ইন্দিরা রোডে, আরেক ভাইপো দেশের বাইরের এক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছে। ক’বছর পর পর দেশে এলে অবশ্যই সে কাকার কাছে দীর্ঘসময় কাটায়। ইন্দিরা রোডের ভাইপো যদি শোনে কাকা অসুস্থ, উড়াল দিয়ে সে চলে আসে। জোর করে বাসা থেকে উঠিয়ে নিজের কাছে নিয়ে রাখে। কিন্তু দিন দুইয়ের মধ্যে দাদা যথারীতি তাঁর আস্তানায় ফিরে আসেন। আরো দুটি বাড়তি মানুষ আছে, যাঁরা রক্তসম্পর্ক তো দূর ধর্মসম্পর্কেরও কেউ না, এঁদের একজন মোসলেম দুপুরে, একজন নিজাম রাতে—দাদার বাসায় প্রায়ই ফ্রি খায়। প্রতিদিন বাসার সামনের ফুটপথের ডানে দেয়াল ঘেঁষে একটা টং দোকান নিয়ে মোসলেম পান-বিড়ি-সিগারেট বেচে। বাড্ডা না রামপুরার কোন চিপা গলির মধ্যে সপরিবারে তার বসবাস পরিষ্কার করে বলে না সে। সকালে অফিস চালু হওয়ার আগেই তাঁর লালরঙের টং দোকানটা দাদার সিঁড়ির নিচ থেকে টেনে ফুটপথে সেট করে। এই বেটার চোখে ছানি জমেছে, পরিষ্কার নাকি দেখতে পায় না। তার চোখ পরিষ্কারের খরচ সে দাদার কাছে চেয়ে রেখেছে। তার একটাই কথা—বাবু টাকা দিলেই অপারেশনের জন্য হাসপাতালে চলে যাবে। নিজাম ছেলেটা সারা দিন টো-টো করে রাতের বেলা এসে হাজির, ঠোঁটে-মুখে ভাত গুঁজে দিয়ে দাদার বাসার ফ্লোরে পড়ে টানা ঘুম। এর বাপ সিরাজ ছিল বইয়ের বাইন্ডার। দাদা একসময় পুরানা পল্টনের যে অফসেট প্রেসে কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন, সিরাজ ওখানেই কাজ করত। সিরাজ অচল হয়ে নিজের গ্রামে ফিরে গেলে তার ছন্নছাড়া ছোট ছেলেকে দাদার হতে সঁপে দিয়ে যায়। এখন অবস্থা হলো মোসলেম ও নিজাম বাড়তি এই দুজনের ঈদ-কোরবানির যাবতীয় খরচও দাদার জোগান দিতে হয়।

অকৃতদার দাদার মৌন একাকী জীবন, উপযোগী নিরিবিলি বাসা, নিরুপদ্রব পরিবেশ বেশ পছন্দ তাঁর যুবাবয়সী বন্ধুদের। এদের কেউ কেউ সাংবাদিক। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুপুরের মধ্যে রিপোর্টার সালাম তাঁর পত্রিকা অফিসে আসে, এই সে মধ্যরাতে জয়কালি মন্দির এলাকা থেকে শেষ বাসে বাসায় ফেরে। এই সালাম তাঁর চেয়ে বয়সে বড় অন্য দুই দৈনিকের রিপোর্টারের সঙ্গে দাদার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে রাতে একত্রে বসা, পানাহার, গুলতানি করে এখন তাঁদের বেজায় মাখামাখি। এদের মধ্যে হুমায়ুনের গুণপনা অনেক :সে শুধু সাংবাদিক না, ব্যবসায়ীও, লোক রেখে রড-সিমেন্ট-বালি-ইট ছাড়াও অন্য ব্যবসা করছে। তদবিরে বুদ্ধি বলো, ফন্দি বলো, পেছনের পরামর্শ দানে হুমায়ুন ওস্তাদ। এখান থেকেও কমিশন থাকে। কালোপনা লম্বা ছিপছিপে চশমা পরা এই মানুষটির বহু সেক্টরে যোগাযোগ, নানা কিসিমের মানুষের সঙ্গে খাইখাতির। ওয়্যার হাউস থেকে কন্ট্রোল দরে হার্ড ড্রিঙ্কসের বোতল সে জোগাড় করে থাকে। তাঁদেরও হুমায়ুনকে হাতে রাখা দরকার। কখন কোন কালো খবর সে ফাঁস করে দেয়। কোনো কোনো সাংবাদিক বন্ধু তার থেকে কম দামে বোতল কিনতে পারছে। হুমায়ুনের খরচের হাত উদার—টাকা তার কাছে যেন তেজপাতা, উড়িয়ে দিতে সে কার্পণ্য করে না। দাদা হুমায়ুনকে তাই স্নেহের নজরে দেখেন। তার বদৌলতে মুখরোচক খাদ্যের সঙ্গে কণ্ঠ তরল করতে পারছেন। শরীর যতই বিরুদ্ধে যাক, হাত-পা কাঁপুক কিংবা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাক, বোতল দেখলে দাদার পুরনো পিপাসা শনৈ শনৈ বেড়ে যায়।

কিন্তু গত পরশু থেকে দাদার মনের ক্ষতি হয়ে আছে। এই বাড়ির যে ছেলেকে তিনি হামাগুড়ি দিতে দেখেছেন, তাঁর কোলে যে পেশাব করে লুঙ্গি ভিজিয়েছে, যার মুখে সর্বক্ষণ ছিল দুধের গন্ধ, সেই ছেলে এখন ছ’ফুট ঢ্যাঙ্গা হয়ে তাঁকেই কিনা বাসা ছেড়ে দেওয়ার কঠিন কথা বলতে পারল! বিস্ময়ে দাদা বুজে যান। অনিয়মিতভাবে কিছু কিছু ঘর ভাড়া হালের বাড়িওয়ালা সাইফুলের হাতে তিনি দিয়ে আসছেন। গেল দুই মাস ঘর ভাড়ার কোনো টাকা তিনি দিতে পারেননি। হাতের টাকার বড় অংশ গেছে শরীরের চিকিত্সায়। পরিচিত ডাক্তারটা বাসা বদলে এখন থাকে কামরাঙ্গির চর, নিজের তৈরি নতুন বাড়িতে। চেম্বার এখনো শান্তিনগরের চৌরাস্তার বাঁ পাশে এক ফার্মেসির পেছনের খোপে। ওখান থেকে পাইওনিয়র রোডে দাদার বাসা দূর না। অথচ ডাক্তারের দাদাকে দেখতে আসার আগ্রহে ভাটা পড়েছে। অসচ্ছলতার কারণে এই আতাহার ডাক্তারের ছাত্রজীবন যখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন এই দাদা তিনজন দরদি মানুষ ধরে প্রতিমাসে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাস করার পর আতাহার ডাক্তার দাদার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে এসেছে। মনে হয়, দাদা ডাক্তারের মনোযোগ থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছেন। হতে পারে, বিকেল থেকে রাত দশ-এগারোটা পর্যন্ত রোগী দেখে দূরের বাসায় ফিরতে ফিরতে শরীর ও মনোঃসংযোগ ঠিক থাকে না। সবশেষ সালামতকে পাঠানোর পর ডাক্তার এক ফাঁকে নীরস মুখে বাসায় এসে দেখেশুনে কতগুলো টেস্ট দেয়। প্যাথলজির ওই টেস্টের খরচের জন্য সাইফুলের হাতে দাদা টাকা দিতে পারেননি। সাইফুল নাকি তার বাসার চৌহদ্দির আমমানুষদের শোনায়—নগদ টাকা পকেটে না থাকলে তার হাঁটতে-চলতেও ভালো লাগে না। এই বয়সে ছেলেটা টাকা চিনেছে। দুঃসময়ের হিতকারীর সঙ্গেও বেয়াদবি, বাসা ছাড়ার হুকুম দিতে দিতে আখেরে আরো ভয়ংকর হবে ছেলেটা। দাদার মনের চিকন-মোটা তারে খেদ-আফসোসের টোকা পড়লে রুমের পাতলা অন্ধকারে চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়েছিলেন। দুপুরের দিকে মোসলেম উপরে এসে একবার উঁকি মেরে নেমে গেছে। রান্নার মহিলা দাদার মাথার বালিশের নিচ থেকে নিজেই টাকা খুঁজে রাস্তা পার হয়ে ফুটপথের হকারের কাছ থেকে বাজার করে আনে। তরকারি, কুঁচো মাছ রান্না করে সে ঢেকে রেখে গেছে। একসময় খেয়ে নিলেই হবে। দাদার আজ উঠে বসার ইচ্ছা নেই। বিষাদ বুঝি অনুভূতির ওপর এমন দখল কায়েম করেছে যে, কোনো কিছু ভালো না লাগাই প্রধান হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাত আটটার দিকে দোতলার প্রবেশ মুখের গ্রিলে খুটখাট শব্দ হলে তিনি উঠে আসেন। এমন শব্দের হাতের মানুষটা দাদার মুখস্থ।

দাদার বাসায় কোনো টেবিল নেই। কখনো হয়তো ছিল, ব্যবহার অযোগ্য কিংবা ভেঙে যাওয়ায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। হুমায়ুনের সঙ্গে দুই বন্ধু এসেছে। পুরনো বেতের চেয়ার টেনে দুজনকে সে বসতে দেয়। এই বাসার সবকিছু ধরাধরির ওপর তার অধিকার তৈরি হয়ে আছে। চারদেয়ালের মধ্যে যা আছে, চোখ বন্ধ করে সে বলে দিতে পারে। পানির গ্লাস, পানির জগ সেই-ই টানাটানি করে, প্লেটে চানাচুর রেস্টুরেন্ট থেকে কেনা খাবার পর্যন্ত সাজায়। দাদার রাতের জন্য কোনো কাজের লোক নেই। নিজাম ছেলেটা যদি ঘুমানোর জন্য আগে আসে তবে তাকে কাজে লাগানো হয়। কাজ শেষ তো আসর না-ভাঙা অব্দি নিজাম ডাকের অপেক্ষায় বাইরে সিঁড়ির উপরের ধাপে অন্ধকারে বসে থাকে। খাওয়ার টুকরো-টাকরা তার ভাগে পড়ে। কখনো ফাই-ফরমায়েশ খাটা বাবদ পানের পর কেউ কেউ উদার হয়ে দশ-বিশ টাকা তাকে দেয়।

পানি মেশানো ড্রিঙ্কসের গ্লাস ফ্লোরেই নামিয়ে রাখতে হয়। নিচু হয়ে গ্লাস তুলে তবে সিপ টানা। দাদা পা-মুড়ে তাঁর খাটেই, কখনো বালিশে হেলান দিয়ে বসেন। কুলীন মানুষের ভঙ্গি এখানেও বুঝি শিষ্ট থাকে। মানুষের সাড়া পেয়ে বিড়ালগুলো শরীর ঘেঁষে যাতায়াত করে, কখনো লেজ শরীরে ছুঁইয়ে খামখা আদর যেন উপহার দেয়। বিড়ালের এমন বিরক্তিকর ঘোরাফেরা, পায়ের ফাঁকে অসহ্য চলাচল নিয়ে অতিথিদের একজন হুমায়ুনের মুখে ফোকাস দিলে সে চোখ টিপে ব্যাপারটা উপেক্ষা করার ইশারা দেয়। হুইস্কির গ্লাসটা চোখের সামনে ধরে দাদা পরখ করেন। রুমের দুর্বল হলদে আলোয় হুইস্কির রং তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়েছে কি না মুখ দেখে বোঝা গেল না। এবার গ্লাস নাকের কাছে এনে ভাঙা ভাঙা শ্বাস টেনে তিনি গন্ধ গ্রহণ করেন। হুইস্কি ডিলাক্স না। হার্ড হুইস্কির রুক্ষতা শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে চনমনে ভাব এনে দেয়। আজকাল পাজোড়া মাঝে মধ্যে শাসনে থাকছে না। এখন কড়া এই হুইস্কি পদক্ষেপ বেসামাল করে দিলে মুসিবত। নিজের থেকে দাদা খুব হুঁশিয়ার—গলা পর্যন্ত টেনেও নিচ থেকে কাঠের ভাজা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে একবারও পড়ে যাননি তিনি। পতন তাঁর পছন্দ না। বুড়ো কাহিল শরীর এখনো দৃঢ়। ঘাড় হেলে যাবে, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু মাল টেনে পড়ে গিয়ে তাঁর কুলমর্যাদার জাত শরীর গুঁড়া হয়ে যাবে, উঁহু, এমন নজির কস্মিনকালেও তিনি হতে দেবেন না। দাদার যাবতীয় স্নেহাষ্পদ সালামত, মোসলেম, নিজাম, গণি তাঁকে ওস্তাদ বিবেচনা করে, নিজেদের মধ্যে রসালাপ হয়—দাদা তালে ঠিক। তিনিও জানেন, তালে ঠিক থাকা বা নিজেকে ঠিক রাখা দোষ বা দুর্বলতা নয়। কেবল অধুনা মনের মধ্যগত অন্দরের বেশ গভীরে কোথাও ফাটল ধরেছে। ওই চির থেকে কষ্ট হাহাকার চুঁইয়ে চুঁইয়ে তাঁর ভেতরেই চাপ দিচ্ছে। ঢাকা তাঁর জন্য এখন বসবাসের উপযোগী নয়, একলা মানুষের জন্য দিনকাল বিরুদ্ধে, লোকজনের উল্টাপাল্টা খল স্বভাব ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। বাড়িওয়ালার ছোট ছেলেটাও তাঁর নিরুপদ্রব এখানের আশ্রয় আর পছন্দ করছে না। বুড়ো-হাবড়াটা কেটে পড়লে নতুন করে বেশি টাকায় ভাড়া দিয়ে মোটা আয়ের আমদানি করতে পারবে। ইন্দিরা রোডের ভাইপোও চাইছে সে ফেনীতে ফিরে যাক। কিন্তু নিষ্ফলা ওই গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আর ক’দিন, মন টেকে না। বয়সে ছোট হলেও এখানে হরেক জীবিকার মানুষ কেউ বাবু কেউ দাদা ডেকে তাঁর সময় ভরে দিচ্ছে, পুরনো বন্ধুদের কেউ খোঁজ-খবরের নামে এসে একপ্রস্থ আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে, তিনি কারো কারো পানাহারের সঙ্গী, কত মধুর এই বিনোদন, এ-সব কোথায় পাবেন। গ্রামের বিষয়-সম্পত্তির পনেরো আনাই ফুরিয়েছে, ওই একআনা বলতে আছে ছোট পানাভর্তি পুকুর, লম্বা দোচালা একটা টিনের ঘর, দক্ষিণে বাঁশঝাড় বাগান—চালতে, আমড়া, কামরাঙা, গোটা দশেক সুপারি গাছ। এই বাগানের একটা ছাইয়ের গাদার ভেতর ছিল লতানো মেটে আলুর গাছ। ছাইগাদা খোড়ল করে বড় বড় মেটে আলুর খণ্ডাংশ তুলে এনে ঢাকায় বিতরণ করে ঘনিষ্ঠদের তিনি মাত করে দিয়েছিলেন। এসবের এখন কোনো মূল্য নেই। শহর-গ্রাম সব একাকার। শহুরে ফুর্তিফার্তা অনায়াসে পাড়াগাঁর ভেতর ঢুকে ক্ষয় বলো, পচন বলো, মাটির গন্ধমাখা মনুষ্যিদেরও ফোপারা করে দিয়েছে। তাঁরাও হিসাব-নিকাশে ঘাগু। এ তল্লাটের মানুষজন মানে, বাবু প্রায় নিঃস্ব। কোনো কালে তিনি বড় পরিবারের মানুষ ছিলেন। ভক্তি-শ্রদ্ধাও তাই তলানিতে এসে ঠেকেছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা পথে-ঘাটে তাঁকে দেখে আগের মতো খাতির জমানো গলা কি শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ কিংবা ‘বাড়িতে বাবু থাকবেন তো’ ক’দিন বলে কোনো আগ্রহ কি আন্তরিকতা দেখায় না। তার চেয়ে ঢাকার পাইওনিয়র রোডের তুচ্ছ চুনকাম খসা বাসার নুন-ঝাঁজরা ঘেরে যথাসম্ভব একাকী সময় ফুরিয়ে দেওয়া ঢের ভালো। তাঁর দিন-দুনিয়ার হালহকিকত জানার জন্য খবরে কাগজের হকারের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। নিচের পিয়ন ছেলে গণিই যথেষ্ট। সকাল সকাল অফিসের কাগজটা পড়তে দিয়ে দশটার দিকে সে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর বাসায় আনন্দময় সময় ব্যয়ে আসা সাংবাদিকরা পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কখনোই রক্ষা করেনি। মালের ঘোর নিয়ে নিচে নামতে নামতে হয়তো দেয় কথা ওখানেই তারা ফেলে যায়। দাদার পুরনো ছোট একটা টিভি রুমে পড়ে আছে। টিভির পার্টসের কোথাও গোলমাল আছে, ছবি লাফায়, সাউন্ড পরিষ্কার না—গ্যা গ্যা করে। টিভি কোম্পানির মেকানিক মোটা-লম্বা শরীরের মাইকেল নামের যুবক শেষবার মেরামত এসে রায় দিয়ে গেছে, ‘দাদা, এরপর নষ্ট হলে ফিনিশ, আর চলবে না, বাতিল।’ ডিশলাইনের ব্যবসায়ী আবু দাদার বাসায় লাইন দিয়ে মাসে মাসে কখনো ভাড়া নেয়নি। দাদা বেশ মজার মানুষ, তাঁর থেকে কত রঙ্গ-কৌতুকের গল্প শুনে মন ফুরফুরে করেছে সে। এমন মানুষকে ফ্রি-সার্ভিস দিতে পেরে সে তৃপ্ত। কিন্তু আবু দাদাকে তো টিভি দিতে পারে না। এ নয় টেলিভিশনের ব্যাপার, টি অ্যান্ড টির ল্যান্ডফোনের সংযোগ সাত মাসের বিল বাকি পড়ায় বিচ্ছিন্ন। এখন সময়ের সঙ্গে পারা মুশকিল—কী আর করা! হয়তো বিরক্ত বোধে বারান্দায় চেয়ার নিয়ে রাস্তার উদ্দেশে দৃষ্টি ধরে রাখেন। কিছু কি দেখছেন তিনি, না নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে স্মৃতি টুকরো খুলে আড়ম্বরের সুখশান্তির অতীত ধরতে চাইছেন—বোঝা যায় না। একান্ত দাদা তখন নিজস্ব স্মরণ নিয়ে এতই বিভোর যে বিড়ালগুলো পায়ের পাশে বসে জ্বলজ্বলে চোখ তুলে নীরব আবদার জানালেও তিনি সাড়া দেন না। কেন দেবেন? সামনে অপলক নজর ফেলে তিনি খুঁটিনাটি হিসাবকিতাব করে চূড়ান্ত উপলব্ধি করতে পারছেন—বয়সের তিনকাল চলে গেলে শরীর ভাঙবেই, কিন্তু মন ভেতরে ভেতরে জখম হয়েছে বেশি। বিরাশি বছরে মনের ওপর দিয়ে তো কম ধকল যায়নি। এই যে আটচল্লিশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবকিছু ফেলে জীবন বাঁচাতে বর্ডার পার হয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে জানা গেল, তাঁদেরই মাঠে-ঘাটে কামলাখাটা খুদকুড়োর জন্য ক্ষেতের ঢেলায় মুগুর মারা, সামান্য একটা পরগাছা মোজাম্মেল দলবল নিয়ে বাড়ি লুট করেছিল। শুনে মন তাঁর মচকে যায়। সেই থেকে মন আর মজবুত, স্ফীত, তাজাও হয়নি। তাঁর বিমর্ষ মুখ পড়ে শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই অনেক পরামর্শ দিয়েছে—একলা মানুষের জীবন যাপনে কত দুর্ভোগ, অন্তহীন সমস্যা, বলা তো যায় না কোন সময়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তাঁর উচিত ভিটেমাটির মায়া ছেড়ে রক্তসম্পর্কের কাছে থেকে জীবনের বাকি দিন গুজরান করা।

তৃতীয় পেগের শেষ ফোঁটা জিভে নিয়ে হুমায়ুন শূন্য গ্লাসটা ফ্লোরে রেখে মুখ তুলতেই উপরমুখো নজরসহ সে জমে যায়—ঘটনা কী, দাদার মুখ কেমন থমথমে। সে কি ঠিক দেখছে? অন্য দিন মুখের আঠা ভেঙে দাদার কথার পিঠে কথা, কত নিংড়ানো স্মৃতি, স্বচক্ষে দেখা নেতাদের কাণ্ডকারখানা বয়ান করেন তিনি। আজ হুইস্কি তাঁর পেটে কি কোনো ক্রিয়াই করছে না? মাল কি ভেজাল? উঁহু, এই তো তার নিজের শরীরের অলিগলিতে, মাথার খুলির নিচে চমত্কার বাজনা তুলছে। তাহলে? নির্ঘাত্ দাদা কোনো কারণে বিষণ্ন হয়ে আছেন। নাকি, তাঁর শরীর বয়সের ভার ও পীড়ন ধারণে এখন আগের চেয়ে অক্ষম? তাই যদি হয়, ড্রিঙ্কস নিয়ে দাদার এখানে আসা ঠিক হচ্ছে না। অযোগ্য এই বাসায় দাদার একা বসবাসও ঠিক না। দাদার অকথিত কষ্ট নিজের মধ্যে লতিয়ে ওঠার জন্য পরিবারশূন্য বুড়ো মানুষটাকে নিয়ে হুমায়ুন টের পায়—মায়া-মহব্বতের এক ফিনফিনে বাষ্প দ্রুতই তাঁর মধ্যে ঘণীভূত হচ্ছে। না, দাদার সঙ্গে হুইস্কি খাওয়া ঠিক না। অসমর্থ কাঠামোর মানুষ, হাড়-মাংসে শাঁসের অভাব, শুকিয়ে দিন দিন তিনি ক্ষীণ হচ্ছেন, এই মানুষটা পানের প্রতাপে হঠাত্ অসুস্থ হলে দুর্নামের ভাগীদের হবে তারাও।

হুমায়ুন দাদার হাতের শূন্য গ্লাসটা নিচে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলে, ‘আজ আর থাক।’ দাদার মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ যেন খসে আসে। এর অর্থ একটাই—বলো কী, সবে শুরু, আরো পেগ দুই পেটে না পড়লে শরীর বলো মেজাজ বলো উত্তম কিছুই থাকবে না। হুমায়ুনের স্বর হালকা করুণ হয়ে বুঝি রেহাই খোঁজে, ‘আরেক দিন ঠাণ্ডা দেখে বসা যাবে।’ ঘাড় কাত করে ফ্লোরে রাখা বোতলের পরিমাণ দাদা জরিপ করেন। হাত তুলে এবার গ্লাসে মাল ঢালার ইশারা রাখতেই তাঁর চিবুক যেন ঝুলে পড়ে। হুমায়ুনের ইচ্ছা হয় না। না জানি বিপদ আজই ঘটে যায়। দেখো, অনুমান করার কী ক্ষমতা, মনের তলদেশ অব্দি শুধু চাহনি টেনে কথা ধরতে দাদা এখনো বাহাদুর, ‘হুমায়ুন, আমি পুরো ফিট আছি, ভয় নেই, ঢালো।’ বলেই তিনি খাটে সরে বসার উপক্রম করে, প্রায় ঢলে পড়া হন। খপ্ করে হুমায়ুন তাঁকে ধরে ফেলে। ‘না দাদা। বোতলের বাকিটুকু তো আপনার থাকছে। তবে, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি।’

এরপর চুপ। শব্দশূন্য রুমের নীরবতা মুহূর্তে যেন গাঢ় হয়েছে। হুমায়ুন একটা কথা বলা নিয়ে কি দ্বিধায় আছে? সঙ্গী দুজনের গ্লাস এখনো খালি হয়নি, তারা বিরতি দিয়ে সিপ টেনে চলেছে। ‘বলো।’ মাথা নেড়ে দাদা সায় দিলে হুমায়ুন তাঁর হাতের আঙুল দাদার আঙুলের ফাঁকে রেখে স্বর নিবিড় করে, ‘আমার মনে হয়, আপনার শরীরের যা অবস্থা, আর একা থাকা ঠিক না। যদি সুযোগ দেন আমরাই আপনাকে ওই পারে রেখে আসতে পারি।’ দাদার ব্যাকব্রাশ পাকা চুলের ওপর দিয়ে রুমের হলদে আলো বুঝি পিছলে যাচ্ছে। ফর্সা মুখের সুঁচালো নাকের ডগায় যে ফোঁটা আলো, তা দিয়ে চেহারাও ধরা যাচ্ছে না। তাঁর দৃষ্টি সামনের লবণাক্ত দেয়ালের ম্যাড়ম্যাড়ে চুন রঙের ওপর স্থির। ধীরে ধ্যানীমূর্তি মৌনভাব ভেঙে গেলে শোনা গেল খুব শান্ত কণ্ঠ, ‘দেখো, চারাগাছ মাটি থেকে তুলে আরেক জায়গায় লাগালেও বাঁচানো যায়, বড় হয়, শেকড় ছড়াতে পারে। কিন্তু গাছ বুড়ো হলে আরেক জায়গায় পুঁতে গোড়ায় শত জল ঢাললেও বাঁচানো যায় না। আমি বুড়ো বয়সের গাছ, ওই পারে গিয়ে কি বেশি টিকব?’ এমন জবানির পর নিজস্ব থাকার ব্যাপক ব্যাকুলতা রুমের মধ্যে হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। v