ভ্রমণ

সান্তা ফের হট স্পা ও চিত্রধ্যান

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৩৯

আজকের পুরো দিনটা আমাদের কেটেছে সান্তা ফে নগরী থেকে বেশ দূরে আমেরিকার যশস্বী চিত্রকর জর্জিয়া ও’কিফের স্টুডিও হোমে আর্ট-ট্যুর করে। এ চিত্রসফরে আমার সঙ্গী হয়েছিলেন মিস রুবারটা ত্যালমস। এক জামানায় আমি সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া নগরীর ভিলা ক্রিসনথিমাম নামে একটি বাড়িতে বসবাস করতাম। প্রতিবেশী রুবারটা ছিলেন ভিলাটির মালকিন। বাড়িওয়ালী হিসেবে তাঁর মতো রহম দিল মহিলা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রিটোরিয়া বাসের প্রথম দিকে (মাস ছয়েক) আমার কোনো বাহন ছিল না, বেকার হালতে গাড়ি খরিদ করার মতো আর্থিক তাকদও ছিল না, তাই কম্বি বলে এক ধরনের মাইক্রোবাসে চলাফেরা করতাম। বিষয়টি রুবারটার নজরে পড়লে তিনি আমাকে একখানা লক্করঝক্কর গোছের ভক্সহল গাড়ি ধার দিয়েছিলেন। তো বর্তমানে আমি সান্তা ফে নগরীর প্রান্তিকে বাস করছি। যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে এসে রুবারটা আমার ভদ্রাসনে মেহমান হয়েছেন। চিত্রকলার প্রতি এ রাশভারি মহিলার আকর্ষণ অবসেশনের পর্যায়ে পড়ে। তো আমি মেজবান হিসেবে আজ তাঁকে নিয়ে যাই জর্জিয়া ও’কিফের স্টুডিও হোমে।

দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের শাসনামলে রুবারটা ছিলেন সবচেয়ে কমবয়স্ক দুঁদে ডিপ্লোম্যাট। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে ওখানে কৃষ্ণাঙ্গদের দাঁব-রোয়াব কায়েম হলে চাকরিচ্যুত হন তিনি। তারপর থেকে মহিলা তাঁর জীবন ও অতিক্রান্ত যৌবন উত্সর্গ করছেন চিত্রকলার সমঝদারিতে। হামেশা তিনি ফ্রান্স, ইতালি বা ভারতের কোনো না কোনো গ্যালারিতে ঘুরপাক করেন। চিত্রকলার স্লাইড তুলেন, ভিডিও বানান। তারপর জানাশোনা পঞ্চজনকে তাঁর ছনে ছাওয়া সুপরিসর ভিলাতে জিয়াফত করে এসব দেখনদারির বন্দোবস্ত করেন।

জর্জিয়া ও’কিফকে বিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী মনে করা হয়। তাঁর জগতজোড়া পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে আঁকা কিছু ফুলের চিত্র। তবে সমঝদাররা রঙতুলি বিষয়ক ভাবনার শক্তিমত্তা উপস্থাপনার জন্য তাঁর অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন। পুষ্পের বর্ণাঢ্য চিত্রকলা ছাড়াও নাটকীয় ভঙ্গিতে আঁকা নগরদৃশ্য, বিজন মরুর আলোয় উদ্ভাসিত ল্যান্ডস্কেপ এবং পশুর হাড় ও করোটিকে এঁকেছেন তিনি একাধিকবার হাই ডেজার্টের দিকচক্রবালে নেমে আসা বর্ণিল আকাশের প্রেক্ষাপটে।

তো আমরা ও’কিফের স্টুডিও-হোমে অনেকগুলো অরিজিনাল চিত্রকলা পর্যবেক্ষণ করে গোধূলি লাগার লগ্নে ফিরে আসি সান্তা ফে শহরে। অতঃপর নগরীর আপস্কেইল রেস্তোরাঁ জেরোনিমোতে আসা হয় মূলত রুবারটার উত্সাহে। ডিনারের অর্ডার নিতে এসে বো-টাই পরা কেতাদুরস্ত খানসামা আমাদের গ্লোব শেইপ গ্লাসে ‘অন দি হাউস’ বলে পরিবেশন করেন বাতাবি লেবুর সৌরভ ছড়ানো মারগারিটা। তারপর ডিনারের স্টেক ঝলসানোতে সময় লাগবে জানিয়ে, শিষ্টাচারসম্মতভাবে ক্ষমা চেয়ে আমার দিকে তাকান।

তিনি আমার দিকে দিশা ধরে তাকিয়ে অতঃপর ডান চোখে তিন বার পলক ফেলে বলেন, ‘স্যার, আমাদের রেস্তোরাঁয় ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেন আপনার দেশের একটি মেয়ে। এখন তার অফ ডিউটি চলছে। দ্য গার্ল ইজ ভেরি লোনলি। দেশের লোকজনের সঙ্গে এখানে তো তার দেখা হওয়ার কোনো উপায় নেই। আপনি কী মেয়েটির সঙ্গে কাইন্ডলি একটু কথা বলতে আগ্রহী হবেন?’ আমি রুবারটার দিকে তাকালে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘যাও না, শুনে এসো.. হোয়াট দ্য গার্ল হ্যাজ টু সে। আমার অনেকগুলো ইমেইলের উত্তর দেওয়া হয়নি আজ, আমি এ ফাঁকে আইফোনে একটু কাজ সেরে নিই।’ রুবারটার সম্মতি পাওয়ায় আমি নির্ভারভাবে উঠে পড়ি।

খানসামা করিডোর ধরে আমাকে নিয়ে এসে ব্যাকইয়ার্ডের দোরগোড়ায় ছেড়ে দিয়ে ফের ডান চোখে একসঙ্গে একাধিক পলক ফেলে বলেন, ‘হিয়ার ইজ দ্য লাভলি গার্ল ফ্রম পাকিস্তান, এর নাম আয়নুর, আমরা বলি আয়নুর :দ্য ট্রাইভাল বিউটি ফ্রম ওরিয়েন্ট।’ আমি খানসামাকে ‘থ্যাংকস অ্যা বাঞ্চ’ বলে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে ফের বলি, ‘একটু খোঁজ নিয়ে দেখি আয়নুর কোথাকার মেয়ে, আমাকে তার বলার কী আছে। ওকে দ্যান, সি ইউ।’

অতঃপর আমি সিঁড়ি বেয়ে রেস্তোরাঁর ঘাসে ছাওয়া লনে নেমে আসতে আসতে আয়নুর নামের অজানা তরুণীটির কথা ভাবি। রেস্তোরাঁয় ঢুকে করিডরে দাঁড় করানো লাইফ সাইজের দুটি পেল্লায় তৈজসের কারুকাজ আমরা নিরিখ করে দেখছিলাম। পোড়ামাটির পাত্রদুটির গায়ে আমেরিকার আদিবাসী নাবাহোদের কিংবদন্তির কেচ্ছা-কাহিনি, জ্যামিতিক প্যাটার্নের নানাবিধ প্রতীকে আঁকা। তাদের ঠিক মাঝ বরাবর পিকচার পারফেক্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দীর্ঘাঙ্গী একটি মেয়ে। তার কামিজ ও ওড়নায় বসানো অনেকগুলো ছোট ছোট আয়না। খুব নির্ভারভাবে পিঠজুড়ে কালো চুল ছড়িয়ে দিয়ে সে চকোলেট বার ভেঙে খাচ্ছিল। তার অন্য হাতে ধরা জিনজার অ্যাইলের বড় একটি বোতল। আমি তার দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম—যুবতীটি কী নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে রাজপুত নাকি সে ভাঙরা গোত্রের কন্যা? তার বস্ত্রের রঙচঙ ও দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এমন এক ধরনের সরলতা আছে যে মনে হয়, নারীটি বাস্তব জীবনে আমুদে প্রকৃতির। আমি যে তাকে নিরিখ করে দেখছি, বিষয়টি তার চোখ এড়ায় না। সে হাত দিয়ে মৃদু ওয়েভের ভঙ্গি করে, আমিও অন্যমনস্কতার ভান করে হালকাভাবে হাত নাড়ি, কিন্তু কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার কোনো উদ্যোগ নিই না। বরং আমি অন্যদিকে তাকানোর চেষ্টা করি। মেয়েটি দারুণ কালো দুচোখে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে ঠোঁট সামান্য বাঁকায়।

ঘাসের সবুজ লনে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার খানিক দূরে দাঁড় করানো তিন চাকার একটি হোন্ডা গোল্ডউইং মোটর সাইকেল। চাকার সংখ্যা তিন বলে এ ধরনের বাহনকে বাইক না বলে ট্রাইক বলার চল আছে। যা হোক, ওই জায়গার কাছে একটি পিকনিক টেবিলের লাগোয়া বেঞ্চে বসে আয়নুর ফাইল দিয়ে ঘষে ঘষে মসৃণ করছিল তার নোখ। আমাকে দেখতে পেয়ে সে উঠে দাঁড়ায়, তার চোখেমুখে যেন পরীক্ষায় কোনো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছে এরকম খুশি খেলে যায়। সে হাত বাড়িয়ে দিলে আমি হ্যান্ডশেইক করার জন্য ঝাঁকাতেই নিজের কাছেই পুরো বিষয়টা একটু অস্বস্তিকর লাগে। কিন্তু সে সাবলীলভাবে চোখে মৃদু দুষ্টুমির ঝিলিক ফুটিয়ে বলে, ‘জাস্ট টেল মি ইউ আর নট অ্যা পাকিস্তানি। পাকিস্তানি কারো সঙ্গে কথা বলতে আমার দারুণ ভয় হয়।’ আমি তাকে ভরসা দিয়ে বলি, ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ অরিজিনালি। তবে অনেক বছর আফ্রিকাতে কাজ করে সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছি। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালোই লাগবে।’ সে আমার হাতে ধরা মারগারিটার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসে, তারপর মিনমিনিয়ে বলে, ‘আমিও কথা বলতে চাই। আমার হাজবেন্ড আসবে সন্ধ্যার পর। একা বসে থাকতে ভালো লাগছে না।’ এটুকু বলে সে আমার দিকে লাজুকভাবে তাকায়। আমি তাকে কাছ থেকে অবলোকন করছি। বোধ করি, আমার দৃষ্টিপাতে তার দেহমনে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মেকআপহীন গণ্ডদেশ ভরে ওঠে গোধূলির অরুণিম আভায়। সে জিনজার অ্যাইলের বোতলটি তুলে চুমুক দেয়। তার তৃষিতভাবে পান করার ভঙ্গিটি আমি নিরিখ করে অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি—আয়নুর হালকা ড্রাংক হয়ে আছে। সে আরেক ঢোঁক জিনজার অ্যাইল খেয়ে আমার দিকে তার সুরমা-বিধুর চোখ তুলে তাকায়, তখন আমি সরাসরি প্রশ্ন করি, ‘কৌন হ্যায় তুম? বাতাও মুঝে।’ নিজের কথা বলতে এবার তার তেমন কোনো হেলদোল হয় না। যেন অনেকদিন পর খালাতো ভাইয়ের সাক্ষাত্ পেয়েছে, এমনভাবে সে বলে যায় সান্তা ফেতে তার দিনযাপনের কথা। বছর দুয়েক আগে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ একটি ছেলেকে বিয়ে করে সে এখানে এসে থিতু হয়েছে। ছেলেটির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় অনলাইনে। আমি তার স্বামীর পেশা জানতে চাইলে, সে ব্যাকইয়ার্ডে পার্ক করা তিন চাকার একটি ট্রাইক দেখিয়ে জানায়, তার স্বামী প্রফেশনাল মোটরবাইকার। মোটরবাইক গ্যাংয়ের সদস্য। মাঝেমধ্যে সার্কাসে তরুণটি বাইক দিয়ে কসরত দেখায়। এখন সার্কাসের অফ সিজন চলছে। এ সময় সে কারো বাইকে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে বাড়ি গিয়ে তা সারাই করে দেয়। এতে তার বাড়তি কিছু উপার্জনও হয়। আয়নুর কথা বলার ফাঁকে কব্জির কাছে এক গোছা চুড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করে। তখন আমি তার নিরাবরণ বাহুর ভেতর দিকে উল্কি করে আঁকা করোটি, ড্রাগনের বাঁকানো লেজ, শনি গ্রহের বলয় ও মোটর সাইকেলের চাকা দেখতে পেয়ে তাজ্জব হলাম! সে তেমন কিছু বলছে না, তাই আলাপের বিষয়বস্তু পাল্টানোর জন্য বলি, ‘আয়নুর, দ্য ফাইনেস্ট গার্ল আই এভার মেট ফ্রম পাকিস্তান, প্লিজ টেল মি সামথিং ইন্টারেস্টিং অ্যাবাউট ইউরসেল্ফ।’ চোখের পাপড়িতে রাজ্যের বিস্ময় মাখিয়ে সে জবাব দেয়, ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু নো?’ আমি ছোট্ট একটি অনুরোধ করি, ‘জাস্ট টেল মি ট্রুথফুলি, আমেরিকাতে এই যে বসবাস করছ, এখানকার কোন জিনিসটি তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে?’  ফিক করে হেসে সে জবাব দেয়, ‘ড্রিংকিং অ্যালকোহল। সবচেয়ে ভালো লাগে ভোদকা পান করে মোটরবাইকের পিছন সিটে বসে আইপডে বব ডিলানের গান শুনতে শুনতে—হাওয়ায় চুল উড়িয়ে দিয়ে হাইওয়েতে লং ড্রাইভে যাওয়া।’ আমি এবার প্রশ্ন করি, ‘সো ইউ আর ড্রিংকিং অ্যা বিট রাইট নাউ, রেস্তোরাঁয় কাজের সময় তো তোমার ড্রিংক করার কথা না।’ সে জিনজার অ্যাইলের শিশি থেকে আরেক ঢোঁক পান করে জবাব দেয়, ‘কাজের সময় ড্রিংক করার কোনো উপায় নেই, কিন্তু কাজের পর যখন হাজবেন্ডের জন্য অপেক্ষা করি, একটু নার্ভাস লাগে, তাই জিনজার অ্যাইল মিশিয়ে সামান্য একটু ভোদকা নিই। সে এলেই তো আমাকে কাছে চাইবে, একটু টিপসি হলে... আই ক্যান গিভ হোয়াট হি ওয়ান্টস, নো প্রবলেম।’ আমি এবার গ্লোভ শেপের গ্লাসটি দেখিয়ে বলি, ‘তোমাকে এক গ্লাস মারগারিটা কিনে দিই। হাউ অ্যাবাউট দিস আয়নুর?’ সে মাথা ঝাঁকিয়ে অসম্মতি জানিয়ে বলে, ‘নো, দিস মারগারিটা ইজ ফেন্সি অ্যান্ড এক্সপেনসিভ।’ আমি এবার তাকে বিয়ার অফার করি, আয়নুর প্রস্তাবে খুশি হয়ে বলে, ‘আই লাভ বিয়ার! খেলে তো আরো টিপসি হয়ে পড়ব। অ্যান্ড ইউ নো মাই হাজবেন্ড ইজ গোনা লাভ দিস।’

আমি বার কাউন্টার থেকে এক মগ ফেনা উপচানো কার্লসবার্গ নিয়ে এসে দেখি, আয়নুর তার নখে নেল পালিশের ব্রাশ দিয়ে রীতিমতো ছবি আঁকছে। খুব উত্সাহের সঙ্গে সে বিয়ার খায়, এবং থেকে থেকে চোখের পাপড়ি তুলে আমার মুখে কী যেন দেখে নেয়। তারপর আমি কিভাবে আমেরিকাতে এলাম, কার সঙ্গে বিবাহিত হয়েছি, এই যে আমরা দুই দেশের দুজন নারী-পুরুষ মিলে একটি ক্রস কালচারাল সংসার গড়ে তুলছি—এতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না ইত্যাদি খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করে। বিয়ার-মগের বেশ খানিকটা খেয়ে হাতের তেলো দিয়ে ঠোঁটে লেগে থাকা ফেনা মুছে সে। চুল থেকে রাবার ব্যান্ড খুলে নিয়ে ফের তা অন্যভাবে পরতে পরতে ঠোঁটে যেন অভিমান ফুটিয়ে তুলে বলে, ‘ইউ ডিড নট আস্ক মি এনিথিং অ্যাবাউট মাই ফ্যামিলি ইন পাকিস্তান, তোমার জানতে আগ্রহ না হলে থাক...।’ তাকে কথার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলি, ‘আয়নুর, দ্যাটস্ হোয়াট আই অ্যাম রিয়েলি ইন্টারেস্টেড টু নো, তুমি পাকিস্তানের কোথা থেকে এসেছ, ওখানে তোমার পরিবারে কে আছে, যদি কোনো আপত্তি না থাকে, বল না আমাকে একটু কাইন্ডলি...।’  সে ফিক করে হেসে ফের রাবার ব্যান্ড খুলে নিয়ে এক রাশ চুল পিঠে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ‘কেউ তো এত লম্বা-চওড়া কাহিনি শুনতে চায় না।’

বেশ কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে কথা বলে যায় আয়নুর। তার ঘটনা আমি যা শোনলাম, তার ভেতর থেকে মূল তথ্যগুলো শুনতে শুনতে নিজের মাথায় গোছানোর চেষ্টা করি। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের মেয়ে সে। মাতৃভাষা হিন্ডকো। মাসওয়ানি উপজাতীয় গোত্রের প্রথা অনুযায়ী খুব অল্প বয়সে তার বিয়ে হয় অবসরপ্রাপ্ত এক পশু-ডাক্তারের সঙ্গে। ডাক্তার যথেষ্ট বৃদ্ধ এবং চলাচলে তেমন সক্ষম না হলেও তার মেষের খামার ও মহিষের বাথান থেকে আয়-উপার্জন ছিল প্রচুর। আয়নুর পশু-ডাক্তারের সংসারে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বাস করে প্রায় তিন বছর।

বৃদ্ধ পশু-ডাক্তারের সঙ্গে আয়নুরের বিবাহের প্রেক্ষাপটও ছিল দুঃখজনক। সে যখন ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, তখন বছর দুয়েক ক্যান্সারে ভুগে তার মা মারা যান। তার বাবা ভিস্তিওয়ালা হিসেবে শহরতলীর একটি বাজারের দোকানে দোকানে খচ্চরের পিঠে করে খাবার পানি সরবরাহ করতেন। ভদ্রলোকের আর্থিক সঙ্গতি ছিল না স্ত্রীর চিকিত্সা করানোর। তো তিনি পশু-ডাক্তারের কাছ থেকে সুদে প্রচুর টাকা কর্জ করে চিকিত্সার খরচ জোগান। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে, মাসওয়ানি গোত্রের মাতব্বররা জিরগা বা পাঞ্চায়েতি বিচার বসিয়ে ‘ভানি’ পালন করার বিধান দেয়। ভানি প্রথা হলো, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণদাতার পরিবারে মেয়ে-সন্তানের বিয়ে দেওয়া। বৃদ্ধ পশু-ডাক্তার তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে আয়নুরের সঙ্গে তেমন কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি। তাকে দরাজ হাতে কিনে দিয়েছেন জামাকাপড়, অলংকার, গান শোনার জন্য টেপ রেকর্ডার ইত্যাদি। স্বামীর প্রথম তরফের মেজো ছেলেকে ইংরেজি পড়াতে আসত একজন প্রাইভেট টিউটর। ছেলেটি বয়সে আয়নুরের চেয়ে বছর দুয়েক বড়। সে আয়নুরের সঙ্গে শোভন ব্যবহার করত। তো ছেলেটির উত্সাহে আয়নুর ইংরেজি শিখতে চাইলে, পশু-ডাক্তার মেজো ছেলের সঙ্গে প্রাইভেট মাস্টারের কাছে তাকে পড়তে কোনো বাধা দেননি। মেজো ছেলেটির আইপ্যাড ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে সে শিখে নেয় ইন্টারনেটের বিষয়-আশয়। পশু-ডাক্তার উইল করে মৃত্যুর কিছু আগে তাকে বেশ কিছু সয়সম্পত্তিও দান করেন। কিন্তু বৃদ্ধের মৃত্যুর পর অন্য দুই স্ত্রী মেজো ছেলের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের অভিযোগ তুলে তাকে মারপিট করে এবং পরে শরীরে পোড়া লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে বাড়ি ছাড়া করে।

তার পরের ঘটনা আয়নুর খুব সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করে। অনলাইনে সান্ত ফের এক মোটরবাইকারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ছেলেটি তার কাহিনি শুনে লাহোরে আসে। আয়নুর তার বাবাকে ডজ দেয়, বলে যে, অনলাইনে দরখাস্ত করার ফলে সে আমেরিকার একটি স্কুলে পড়ার জন্য তার বান্ধবী রোকসানার সঙ্গে বৃত্তি পেয়েছে। রোকসানার সহায়তায় সে লাহোর আসে। তারপর গোপনে বিবাহ, ইন্টারভিউয়ের জন্য আমেরিকার কনস্যুলেটে যাওয়া ইত্যাদি। সে আর অ্যাবোটাবাদে ফিরে যায়নি। এক পর্যায়ে মোটরবাইকওয়ালা ছেলেটির সঙ্গে অভিবাসী হিসেবে সে পাড়ি দেয় যুক্তরাষ্ট্রে।

আমাদের কথাবার্তার এক পর্যায়ে সে তার স্বামীর কাছ থেকে রিসিভ করে টেক্সট ম্যাসেজ। ছেলেটি কাজ সেরে ফিরে আসছে জেরোনিমো রেস্তোরাঁয় মিনিট দশেকের মধ্যে। সুতরাং আমাকে আলোচনার এখানেই ইতি টানতে হয়। আমি আয়নুরকে তার জীবনের কাহিনি আমার সঙ্গে শেয়ার করার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশ্ন করি, ‘গুডলাক উইথ ইউর লাইফ ইন সান্তা ফে, তোমার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন হলো, ওই যে তোমার বাহুতে অনেকগুলো উল্কির চিহ্ন দেখছি, এগুলো কি তোমাদের মাসওয়ানি উপজাতীয় সংস্কৃতির প্রতীক?’ সে ম্লান হেসে জবাব দেয়, ‘আমাদের ট্রাইভাল কালচারে শরীরে টাট্টু করে কিছু আঁকার প্রথা নেই। তোমাকে তো বলেছি, আমার হাজবেন্ড একটি মোটরবাইক গ্যাংয়ের সদস্য। সান্তা ফেতে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে মোটরবাইকের চাকা ও করোটির চিহ্ন শরীরে আঁকিয়ে আমিও এ গ্যাংয়ের মেম্বার হই। এতে গ্যাংয়ের বাকি সদস্যরা আমার নিরাপত্তার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়।’ আমি এবার জানতে চাই, ‘ড্রাগনের লেজ ও শনি গ্রহের বলয়—এ দুটি উল্কি-চিত্রের বিশেষ কোনো অর্থ আছে কী আয়নুর?’ সে একটু অধৈর্য হয়ে বাহু বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘জাস্ট লুক কেয়ারফুলি হিয়ার।’ আমি উল্কি চিহ্নের নিচে ছ্যাঁকা দিয়ে পোড়া খানিকটা দাগ দেখতে পাই। বুঝতে পারি, ড্রাগন ও শনি গ্রহের নকশা দিয়ে মেয়েটি ঢাকছে তার দেহে নির্মম নির্যাতনের অশোভণ চিহ্ন। তার সঙ্গে আমার আর তেমন কোনো কথা হয় না। আয়নুর হ্যান্ডশেইকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘ইট ইজ টাইম টু গেট রেডি ফর মাই লাভলি হাজবেন্ড। যেকোনো মুহূর্তে সে এখানে এসে পৌঁছাবে।’

আমি হলকক্ষে ফিরে আসি। ফায়ারপ্লেস থেকে সামান্য দূরে একজন চেলো বাদক বাজনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পিয়ানোতেও বসেছেন আরেক সংগীত সাধক। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে বাদ্যযন্ত্রের ওয়ার্ম-আপ করা দেখতে দেখতে আয়নুরের কথা ভাবি। আজকের কিছু ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে ইন্টারলিঙ্কড হয়ে আছে যে বিষয়টি আমাকে অবাক করে! যেমন রুবারটার সঙ্গে জর্জিয়া ও’কিফের বাড়িতে না গেলে জেরোনিমো রেস্তোরাঁয় আসা হতো না, এখানে ডিনারের জন্য না এলে আয়নুরের জীবনের ঘটনা সম্পর্কে আমি কিছু জানতে পারতাম না।

আমি এবার ব্যাকরুমের দিকে আসি। দেখি, রুবারটা গভীর মনোযোগের সঙ্গে আইফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে টাইপ করে চলেছেন। ভাবি, আরেকটু সময় এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করে কাটিয়ে দিই। ডিনার সার্ভ হওয়ার পর না হয় ফিরে আসব ব্যাকরুমে। করিডোরের এল শেইপ রেখা ধরে একটু সামনে বাড়তেই চলে আসি পেছন দিকের আরেকটি খোলা বারান্দায়। এদিকে অ্যাডোবি কেতার কাদামাটিতে লেপাপুছা ছাদহীন একটি সুনসান বেলকনির দেয়ালে জ্বলছে ফায়ার প্লেসের ধিকিধিকি আগুন। সন্ধ্যা হতে চলেছে, তাই জ্বলে ওঠে বাতি। প্রৌঢ় এক দম্পতি ওয়াইন গ্লাস হাতে রিলাক্সড ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন দূরের বাতি-জ্বলা ক্যাথিড্রালের দিকে।

খোলা বারান্দা থেকে হলকক্ষে ফেরার পথে কিভাবে যেন করিডোরের গোলকধাঁধায় তালগোল পাকিয়ে চলে আসি আবার ব্যাকইয়ার্ডের দোরগোড়ায়। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে দেখি, স্কেটবোর্ডে চড়ে ফিরে এসেছে আয়নুরের স্বামী। মাথা থেকে হ্যালমেট খুলে নিয়ে গ্রিক দেবতার মতো দেখতে সুদর্শন তরুণটি তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে প্যাশনেটলি চুমো খায়। তারপর আয়নুরকে পাঁজাকোলা করে তুলে বসিয়ে দেয় ট্রাইকের সিটে। ছেলেটি এবার হাঁটু গেড়ে ঘাসে বসে কিছু বলে—আয়নুর খিলখিলিয়ে হেসে তার দু পা তুলে দেয়। ছেলেটি তার পা থেকে মেকি পাথর বসানো হাইহিল স্যান্ডেল জোড়া খুলে নিয়ে ঘাসে ছুড়ে ফেলে। তারপর আয়নুরের পা-দুটি তুলে নেয় তার ঘাড়ে। আমি তাদের দাম্পত্য অন্তরঙ্গতার দর্শক হতে চাই না, তাই ফিরে আসি ব্যাকরুমে।

পিয়ানোর মৃদু সংগতে চেলোর বাদন জমে উঠছে। ধ্রুপদীর ধারার এ ইউরোপীয় সংগীত-বাদনের লয়-ছন্দ আমার চেনা মনে হয়। কিন্তু কম্পোজারের নাম ঠিক মনে করতে পারি না। রুবারটা মুগ্ধ হয়ে বাজনা শুনতে শুনতে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলেন, ‘তোমার মনে আছে, প্রিটোরিয়ার টেনিস ক্লাবে আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম ব্রামসের চেলো সোনাটা নম্বর ওয়ান শুনতে।’ চোখে কালো প্যাচ পরা খানসামা নিয়ে আসেন ড্রিংকস। কাচের বেশ বড়সড় বেল-জারের ভেতর ভরে আছে পোড়া টোব্যাকোর ধোঁয়ায়। তার মধ্যিখানে পরিবেশিত হয়েছে একটি ওল্ড-ফ্যাশন গ্লাসে বার্বোন হুইস্কির সঙ্গে অ্যারোমেটিক বিটার। এ পানীয়তে যত্সামান্য ক্লাব-সোডা মিশিয়ে ভাসানো হয়েছে কমলালেবুর একটি চাকতি, তাতে রুপালি বুদ্বুদ উঠছে প্রচুর। খানাসামা জাঁক করে বলেন, ‘ককটেলটিতে তামাক পাতার পোড়া ধোঁয়া মেশানোর ফলে পানীয়তে এসেছে স্মোকি সৌরভ এবং এর বর্ণ হয়েছে কালচে-লাল।’ রুবারটা বেল-জারের ঢাকনা উঠাতে উঠাতে ‘এক্সলেন্ট আইডিয়া ফর আমেরিকান ওয়াইল্ড ওয়েস্ট ককটেল,’ বলে ঘাড় হেলিয়ে খানসামার উপস্থিতিকে নাকচ করে দেন। ‘চিয়ার্স’ ধ্বনিতে আমরা স্মোকি শরাবে চুমুক দিই। ব্রামসের সোনাটা চন্দ্রমল্লিকার ঝাড়ে উড়ে আসা বিরল প্রজাতির প্রজাপতির মতো আমাদের মনের নরম কোরকে তাদের হুঁল ফোটায়। প্রিটোরিয়ার টেনিস ক্লাবে এ সোনাটা শোনার পর ককটেল বিরতিতে শ্রোতাদের মাঝে যে বিতর্ক হয়েছিল, আমি তা রুবারটাকে স্মরণ করিয়ে দিই। তাঁর পরিচিত সফেদ বো টাই পরা এক বুয়ার সাহেব বলছিলেন, ব্রামস এ সোনাটি রচনা করেছিলেন কালোয়াতি সংগীতের গুরু বাক সাহেবের সম্মানার্থে। রুবারটা পাল্টি দিয়েছিলেন, নিঃসঙ্গ ব্রামস সাহেব চেলো ও পিয়ানোর সমবায়ে এ যুগলবন্দিটি কম্পোজ করেন তাঁর বন্ধু সংগীত কলাকার রবার্ট শুম্যানের পত্নী ক্লারা শুম্যানকে উদ্দীষ্ট করে। ক্লারা ছিলেন রোমান্টিক ধারার জার্মান মিউজিশিয়ান, যিনি স্বামী ছাড়াও দিনযাপনে বিমর্ষ পরপুরুষ ব্রামসকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন ভালোবাসার জীয়নকাঠিতে। এ তথ্য দুটির কোনটা সঠিক—তা নিয়ে রুবারটা ও বুয়ার সাহেবের মধ্যে এক বোতল শ্যাম্পেনও বাজি ধরা হয়েছিল। তো আমি রুবারটার কাছে জানতে চাই, ‘শ্যাম্পেনের শিশিটি কি কেনা হয়েছিল?’ রুবারটা ন্যাপকিন নাড়িয়ে টোব্যাকো পোড়ার তাজা গন্ধকে হালকা করতে করতে বলেন, ‘হু কেয়ার্স আবাউট হোয়াট ইজ দ্য রিয়েল স্টোরি বিহাইন্ড দ্য কম্পোজিশন অব অ্যা সুপার ফাইন মিউজিক। সংগীত প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তা উপভোগ করতে শেখা।’

কাউবয় টাইপ এক ওয়েটার ট্রলি ঠেলে নিয়ে আসেন মেইন কোর্স। রেডওয়াইনে চিলি সস মিশিয়ে জারিত এল্ক জাতীয় হরিণের মাংসকে গ্রিলে ঝলসানো হয়েছে। সঙ্গে সাইড হিসেবে এসেছে পেঁয়াজ ও রসুন দিয়ে ভাজা মাশরুম। রুবারটা কাঁটা দিয়ে মাশরুম মুখে তুলে নিতে নিতে জানতে চান, আমি কখনো টেন থাউজেন্ড ওয়েভ নামক জাপানি কেতার হট স্প্রিং স্পাতে গেছি কি না? সান্তা ফে শহর থেকে সামান্য দূরে, বাল্ডি পাহাড়ের একেবারে ভেতর মহলে ঝুলে থাকা একটি প্লাটোতে উষ্ণ প্রস্রবণের জলে অবগাহনের এ স্থাপনাটির অবস্থান। ওখানকার সিরামিকের চৌবাচ্চায় খনিজ জলে ঘাড় অব্দি চুবিয়ে বসে থাকার আকর্ষণে হামেশা পর্যটকেরা দূরদূরান্ত থেকে আসে। আমি এরমধ্যে বার দুয়েক টেন থাউজেন্ড ওয়েভে ঘুরে এসেছি। একবার উষ্ণ জলের চৌবাচ্চায় বসে থেকে সামনের জুনিপার ও পাইন বনে খেলে যাওয়া হাওয়ায় এমন মুগ্ধ হয়েছিলাম যে— পরে প্রচুর পয়সা গচ্চা দিয়ে ওখানকার মুন হাউস বলে একটি কটেজে রাত কাটিয়ে। কটেজের উঠানে বাসানো চৌবাচ্চায় ভাপ উঠা জলে বসে পাইন বনের ওপর চাঁদ উঠার অভিজ্ঞতা আমি রুবারটাকে বলি। তিনি ছুরি দিয়ে হরিণের স্টেক থেকে এক টুকরা মাংস কেটে নিয়ে জানতে চান, ‘টেন থাউজেন্ড ওয়েভ স্পাটির যে সেটিংয়ে তুমি পুরো একরাত্রি কাটিয়ে দিলে, কী কী জিনিস তোমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, প্লিজ ডেসক্রাইব।’ আমি নদীর তলদেশ থেকে সংগ্রহ করে আনা মসৃণ পাথর দিয়ে সাজানো একটি গার্ডেন-পাথের কথা বলি। পায়ে চলা এ পথে আছে কাঠের তৈরি মিনিয়েচার একটি সাঁকো। ছোট্ট এ ব্রিজটি অতিক্রম করতেই আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন দিনদুনিয়ার তাবত্ স্ট্রেস, গ্লানি ও নানাবিধ কাজকর্মে হামেশা লিপ্ত থাকার প্রবণতা থেকে মুক্ত হয়ে প্রবেশ করলাম—ঝিঁঝি পোকার শব্দে ভরপুর কুয়াশামাখা শ্যামল এক ভুবনে। আমি থামতেই, তীর্থযাত্রীর কাছ থেকে যে রকম ভক্তরা তিব্বতের মানস সরোবরে পৌঁছে যাওয়ার গল্প শুনেন, সে রকমের নিবিষ্টতা নিয়ে রুবারটা আমাকে বর্ণনা কন্টিনিউ করতে বলেন। গার্ডেন-পাথ ধরে আরেকটু এগিয়ে গেলেই পথের লাগোয়া একটি কৃত্রিম ঝরনা। তা থেকে ফাঁপা বাঁশের ছিদ্র দিয়ে ঝরে পড়া জল জমছে বড়সড় একটি গামলায়। স্পাতে আসা পর্যটকেরা উষ্ণ জলের চৌবাচ্চায় পৌঁছার আগে এ গামলার পাশে দাঁড়ান। তারপর স্বচ্ছজলে তাদের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ছুড়ে দেন একটি ধাতব পয়সা। আমিও বাস্তবায়িত হয়নি এ রকম একটি বাসনার কথা মনে করে ওখানে ছুড়েছিলাম চকচকে রুপালি একটি কয়েন। পয়সাটি ডুবে ডুবে যেতে যেতে তার চারদিকে তৈরি করেছিল চূর্ণিত জলের বৃত্ত। আর মনে হচ্ছিল, বৃত্তের ভেতর থেকে ক্রমাগত বেরিয়ে আসছে ছোট ছোট বৃত্ত।

আমি থেমে পানীয়তে চুমুক দিতেই দেখি, রুবারটা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি মৃদু দীর্ঘশ্বাস চেপে বলেন, ‘টেন থাউজেন্ড ওয়েভ সাউন্ডস সো ওয়ান্ডারফুল।’ আমি তার কৌতূহলের ইন্ধনকে উসকে দিতে সেলফোনে তোলা একটি জাপানি লণ্ঠনের ছবি দেখাই। জলের নহরের ভেতর সিমেন্টে তৈরি বাতিটিতে লেপ্টে আছে সবুজ শ্যাওলাময় মস। রুবারটা জানতে চান, ‘তুমি তো মুন হাউসে এক রাত কাটালে, লণ্ঠনের আলোয় সবকিছু নিশ্চয়ই জাদুময় দেখাচ্ছিল?’ আমি জবাব দিই, ‘সন্ধ্যার পর চাঁদ ওঠার আগে আমি সামান্য সময় এ নহরের পাড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। জলে প্রতিফলিত টিমটিমে আলোকে দেখাচ্ছিল—যুগ যুগ ধরে পর্বতগুহায় ধ্যানস্থ কোনো শ্রমণের জ্যোর্তিময় চোখের মতো।’ লণ্ঠনের বর্ণনা শেষ হতেই রুবারটা জানতে চান, ‘দেন হোয়াট? গার্ডেন-পাথের শেষ প্রান্তে কী আছে?’ আমি জবাব দিই, ‘গার্ডেন-পাথ থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় একটি কাঠের ব্রিজে, তার পাশে আছে জাপানি কেতার প্যাভিলিয়ন, ওখানে টাটামি ম্যাটে পাতা কুশনে আয়েশ করে বসে আপনি পান করতে পারেন এক পেয়ালা সবুজ চা। তারপর ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দেখতে পারেন, নিচের চৌবাচ্চায় সাঁতরে বেড়ানো সোনালি-লোহিত কই ও কার্প মাছ।’ রুবারটা হাত তুলে আমাকে বর্ণনার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কপট রোষে বলেন, ‘দিস ইজ এনাফ। আমি আর টেন থাউজেন্ড ওয়েভের কথা শুনতে চাই না। আই মাস্ট গো দেয়ার।’

মেইন কোর্সের পর ডেজার্ট হিসেবে আসে লেমন ম্যারেঙে। রুবারটা তার এক টুকরা মুখে দিয়ে খানিকটা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ জর্জিয়া ও’কিফের বসতবাড়িটি দেখলাম। এ এলাকায় তাঁর জীবন-যাপনের বেশ কিছুটা জানলামও, কিন্তু তাঁর চিত্রকলার মর্মমূলে যাওয়া হলো না।’ লেমন ম্যারেঙ্গে খেতে খেতে আমিও তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করি, ‘ও’কিফের রঙতুলির রেখাবিন্যাস বুঝতে হলে প্রয়োজন তাঁর চিত্রকলা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার।’ আমার মন্তব্যের রেশ ধরে রুবারটা প্রস্তাব করেন, ‘চিত্র নিয়ে সিস্টেমেটিক্যালি ভাবনার এবং এর ডেপেথ যাওয়ার জন্য প্রয়োজন আর্ট মেডিটেশনের। ও’কিফের বাড়িতে যাওয়ার স্মৃতিটুকু আমাদের মনে ফ্রেশ থাকাবস্থায় আমি আয়োজন করতে চাই মেডিটেশনের। আশা করি এ চিত্রধ্যানে তুমি সহযোগিতা করবে।’ আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি, আর্ট মেডিটেশনের আয়োজন করতে হলে সমঝদার গোছের লোকজনকে দাওয়াত করতে হবে। তাদের আপ্যায়নের জন্য কিনতে হবে রেড ওয়াইন, চিজ ও অলিভ। আমার অত ঝামেলায় যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। তাই কাউন্টার পয়েন্ট উত্থাপনের ভাবনা থেকে তাঁকে প্রশ্ন করি, ‘সবকিছুর যে সবসময় গভীরে যেতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। এ ধরনের চিত্রধ্যান করা আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন রুবারটা?’ ভেবেচিন্তে গুছিয়ে তিনি জবাব দেন, ‘তুমি ছবিতে যা দেখছ ভিজ্যুয়ালি, তা হলো আদতে তার বহিরঙ্গ, চিত্রধ্যান হলো বাইরের লেফাফা অতিক্রম করে রঙরেখার ভেতর-মহলে ঢুকে পড়ার একটি মানসিক প্রক্রিয়া। তোমাকে উদাহরণ দিই, নতুন কোনো শহরে তুমি যদি কোনো রহস্যময় চকমিলান ভিলার সন্ধান পাও, তোমার তো ইচ্ছা হতে পারে ইমারতটির ভেতরে ঢুকে ইনটিরিওর ডেকোরেশনটা দেখে নিতে।’ আমি ফের এঁড়ে তর্ক জুড়ার চেষ্টা করে বলি, ‘রুবারটা, আমি ঘোড়দৌড় দেখা খুব পছন্দ করি, তাই বলে কি হর্সরেসের বিষয়-আশয় খুঁটিয়ে জানার জন্য ঘোড়াকে ডালাই-মালাই করা শিখব? নাকি হর্স মেডিটেশন বলে বিচিত্র কিছুর আয়োজন করে ধ্যানস্থ হয়ে কল্পনা করব, নিজে সহিস হয়ে ছুটাচ্ছি তাজি ঘোড়াটি।’ রুবারটা এবার স্পষ্টত বিরক্ত হন। তিনি খাপ থেকে খুলে হাইপাওয়ারের রিডিংগ্লাসটি চোখে পরে ঝাপসা কাচের ভেতর দিয়ে তাকান। তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে ডিপ্লোম্যাট গোছের চাতুরি। গলার স্বর খাটো করে তিনি বলেন, ‘ওই যে পাকিস্তানি মেয়েটার সঙ্গে তুমি ঘণ্টাখানেক গল্প করলে, আই মাস্ট সে দিস গার্ল ইজ সুপার অ্যাট্রাকটিভ। ধরা যাক, কাকতালীয়ভাবে তুমি তার প্রতি আসক্ত হলে, তখন তো তোমার তাকে নিয়ে ভাবতে, মনছবি আঁকতে ভালো লাগবে, এমন কি তার নিরাবরণ দেহের গভীরে চলে যেতে তোমার বাসনা হতে পারে। আর্ট মেডিটেশনও হলো কোনো চিত্রকলার প্রতি তোমার ভালোবাসা হলে তার অন্তর্গত বিষয়বস্তু বুঝতে পরার প্রচেষ্টা। এতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। আর্ট মেডিটেশন ইজ অ্যা টোটালি নরমাল থিং ফর অ্যান আর্ট-লাভার।’ তিনি এ মুহূর্তে আমার এমন এক তন্ত্রীতে আঘাত করেছেন যে, এ ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। বিষয়টাকে নিভৃত রাখাই আমি শোভন মনে করি। তাই চুপচাপ লেমন ম্যারেঙ্গের টুকরা চিবাই। রুবারটার সঙ্গে সামাজিকভাবে আমার বন্ধুত্ব অনেক বছরের। তাঁর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার একটা প্রবণতা আছে। মন যা চায়, তা করতে তিনি পছন্দ করেন। যেমন ডিনারের ব্যাপারে আমি কী খেতে চাই বা না চাই—তা আমার সঙ্গে পরামর্শ করার তিনি কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি। আবার তিনি আমার ওপর আর্ট মেডিটেশনের মতো উত্কট একটা ব্যাপার চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। বিষয়টা আমি মেনে নিতে পারি না, আবার তাঁর ব্যক্তিত্বের তুলনায় আমি মানসিকভাবে কমজোর কিসিমের পুরুষ। তাই তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখ ফুটে দ্বিমতও প্রকাশ করতে পারি না।

ডেজার্টের পর পরিবেশিত হয় জিনজার টি। টিপট থেকে  পেয়ালায় ঢেলে তা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রুবারটা ফের কথা বলেন, ‘আমি জানি, তুমি উষ্ণ জল পছন্দ করো। প্রিটোরিয়ায় খেয়াল করেছি, তুমি ছুটিছাটায় চলে যেতে বেলাবেলা বলে একটি প্রস্রবণে, ওখানকার হটস্প্রিং স্পাতে একবার আমিও তোমার সঙ্গী হয়েছিলাম।’ আমাদের সাউথ আফ্রিকার দিনযাপনের স্মৃতিচারণে আমি খুশি হই। তো জিনজার টিতে চুমুক দিতে দিতে আমি তাঁর মন্তব্যের সঙ্গে যোগ করি, ‘বেলাবেলার উষ্ণ প্রস্রবণের খবর আমি পেয়েছিলাম আপনার কাছ থেকে। আমার তখন গাড়ি ছিল না, কোথায় যেন যাওয়ার পথে আপনি আমাকে বেলাবেলাতে ড্রপ করে দিয়েছিলেন। সারাদিন উষ্ণ জলে অবগাহনের পর বিকালবেলা আপনার ড্রাইভার আমাকে পিক করে প্রিটোরিয়াতে ফিরিয়ে এনেছিল।’ রুবারটা তাঁর চায়ে সামান্য একটু মধু ঢেলে তা চামচে নাড়তে নাড়তে জানতে চান, ‘ভাবছি, অনলাইনে টেন থাউজেন্ড ওয়েভে একটি জাপানি কেতার প্রাইভেট চৌবাচ্চা রিজার্ভ করব। আগামী পরশু নাগাদ তুমি কি কাইন্ডলি আমাকে সময় দিতে পারবে? আমি চৌবাচ্চার খনিজ জলের উষ্ণতায় বসে এবারকার আর্ট মেডিটেশনের আয়োজন করতে চাই। হোয়াট ডু ইউ থিংক অ্যাবাউট দিস আইডিয়া?’ শুনে আমি জানতে চাই, ‘চিত্রধ্যানে আপনি কি অন্য কাউকে ইনভাইট করার কথা ভাবছেন?’ তিনি পেয়ালায় চুমুক দিয়ে জানান, ‘সান্তা ফেতে আমি তো শিল্প সমঝদার গোছের কাউকে তেমন করে চিনি না। তবে এ এলাকার দুজন চমত্কার মানুষের সঙ্গে আমার অনলাইনে যোগাযোগ হয়েছে। এদের আমি টেন থাউজেন্ড ওয়েভের হট স্পাতে আর্ট মেডিটেশনের কথা বলেছি, তারাও উত্সাহ দেখাচ্ছেন।’ আমি এবার স্পেসিফিক্যালি প্রশ্ন করি, ‘হোয়াট ডু উই নো অ্যাবাউট দিজ টু পারসনস? কী ধরনের মানুষ এরা, এদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে আপনি কী জেনেছেন রুবারটা?’ তিনি আর্ট মেডিটেশনের সম্ভাব্য দাওয়াতি পুরুষ সম্পর্কে কিছু তথ্য দেন। অতীতে ভদ্রলোকের নাম ছিল রবার্ট হোফার। মিশনারি হয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি বছর দশেক আগে ভারত যান। অমৃতসরে গোল্ডেন টেম্পোল দেখতে গিয়ে শিখ ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হন রবার্ট। শিখদের গ্রন্থসাহেব পাঠ, তাদের সংগীত ও ধ্যানের পদ্ধতি তাঁর মনে এমনই অভিঘাত সৃষ্টি করে যে—রবার্ট স্বর্ণমন্দিরের এক গুরুর কাছে মাথা কামিয়ে ধর্মান্তরিত হন। বর্তমানে তিনি গুরমিত সিং খালসা নাম নিয়ে সান্তা ফের কাছেই এসপানিওলা শহরে তৈরি করেছেন একটি গুরুদুয়ারা। তার স্ত্রী, ধর্মবিশ্বাসে যিনি রোমান ক্যাথলিক, দুটি সন্তানসহ তাঁকে ধর্মান্তরিত হওয়ার অপরাধে ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর আত্মীয়স্বজনরাও তাঁকে ত্যাগ করেছেন, কিন্তু খালাসা সাহেব গুরুনানকের ধর্ম-দর্শন থেকে সরেননি এক বিন্দু। রুবারটা সেলফোনের স্ক্রিনে দীর্ঘ দাড়ি, মাথায় পাগড়ি বাঁধা গুরমিত সিং খালসার ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘তাঁর জীবনে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে নানা ধরনের সামাজিক দুর্যোগ। গুরমিতের মনে স্ট্রেস যখন প্রবল হয়ে ওঠে, তখন তিনি জর্জিয়া ও’কিফের চিত্রকলায় খুঁজেন ত্রাণ।’

দ্বিতীয় যাকে রুবারটা চিত্রধ্যানে দাওয়াত করতে চান, সে মহিলার নাম আবিমবোলা ওলাডাপো। আদিতে তিনি ছিলেন নাইজেরিয়ার মানুষ। স্বামীর সুবাদে তিনি অভিবাসী হয়ে বর্তমানে সান্তা ফের শহরতলীতে বাস করছেন। ইউরোবা গোত্রের এ নারী যেন সুখের ঝরনাধারায় পূর্ণিমার আলো দেখতে গিয়ে পা ফসকে পড়েছেন দুঃখের অথৈ জলে। তাঁর স্বামী মি. আবিগুনদে ওলাডাপো ইউনিভার্সিটিতে পড়ার উছিলায় স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। কিছু দিনের মধ্যে দেশে পাঠাতে শুরু করেন প্রচুর পরিমাণে টাকা-পয়সা। তিন বছর পর স্ত্রী মিসেস আবিমবোলা একটি চার বছরের শিশুপুুত্র নিয়ে স্বামীর সঙ্গে যোগ দিতে আসেন সান্তা ফে শহরে। এ দেশের আসার পর দিন তিনেক তাদের পুনর্মিলনের আনন্দে কাটে। তারপর স্বামী মি. আবিগুনদে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বেরোন। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ এসে স্ত্রী মিসেস আবিমবোলাকে নিয়ে যায় মর্গে, গুলিবিদ্ধ মৃত স্বামীর দেহ শনাক্ত করতে। অবশেষে মিসেস আবিমবোলা জানতে পারেন, মি.আবিগুনদে যুক্ত ছিলেন অবৈধ ড্রাগস ব্যবসার একটি গ্যাংয়ের সঙ্গে। প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি গ্যাংয়ের সঙ্গে গোলাগুলিতে তার মৃত্যু হয়। বিধবা মিসেস আবিমবোলা শিশুসন্তানটিকে নিয়ে এদেশেই থেকে গেছেন। আজকাল প্রায়ই তিনি ভোগেন ডিপ্রেশনে। বিষণ্নতা চূড়ান্ত হলে, তিনি নগরীর জর্জিয়া ও’কিফ মিউজিয়ামে গিয়ে ধুন ধরে তাকিয়ে থাকেন তার চিত্রকলার দিকে।

রুবারটা ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করেন ডিনারের বিল। আমরা জেরোনিমো রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে পার্কিংলটে আসার পথে টেন থাউজেন্ড ওয়েভে চিত্রধ্যানের অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে টুকটাক কথা বলি। ওখানে আছে ‘ইজানামি’ বলে একটি জাপানি খাবারের রেস্তোরাঁ। কথা হয়—দুপুরের দিকে সবাই ইজানামিতে জড়ো হয়ে সুশি দিয়ে সেরে নেব লাঞ্চ। চাই কি এক পেয়ালা সাকে পান করে প্রস্তুত হওয়া যেতে পারে চিত্রধ্যানের। গাড়িতে উঠে রুবারটা তাঁর আইফোনের স্ক্রিনে ইজানামি সম্পর্কে আরেকটি ইন্টারেস্টিং তথ্য দেখান। আগামী পরশু—যেদিন আমরা টেন থাউজেন্ড ওয়েভে চিত্রধ্যানের প্রস্তুতি নিচ্ছি, ওইদিন ইজানামির দেয়ালে প্রর্দশিত হবে জাপানি ক্যালিওগ্রাফার কজি কাকিনুমের চারটি হস্তলিপি। মনোক্রম ব্রাশওয়ার্কের জন্য বিখ্যাত এ হস্তলিপি বিশারদের নাম আমিও শুনেছি। রুবারটা মেঝেতে লোহিত বর্ণের বিশাল পোস্টার পেপারে কজি কাকিনুমের পেল্লায় ব্রাশ দিয়ে হস্তলিপি নির্মাণের একটি ছবি আমাকে স্ক্রিনে দেখান। কাকিনুমের উঁবু হয়ে আঁকতে থাকার আলোকচিত্রটির দিকে তাকিয়ে আমি মনোযোগী হয়ে উঠি। মনে হয়, পথ চলতে অজানা কোনো বাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পড়া ছায়ার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল চকিতে। কাকিনুমের আঁকাঝোঁকার ভঙ্গি আমাকে মোহাবিষ্ট করে। আমি গাড়ির ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে টার্নঅন করতে করতে ভাবি, ক্যালিওগ্রাফ করা হস্তলিপির তুলিতে টানা লীলায়িত রেখাচিত্রের ভেতরকার শূন্যতায় হয়তো দেখতে পাব, আঁকা হয়নি এমন কোনো চিত্রের অব্যক্ত ধারণা। v