তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা সোনার দেশ হিসেবে এ দেশটি বিশ্বের দরবারে পরিচিত। এদেশের মাটির উপরে যত সম্পদ আছে তার চেয়ে বেশি সম্পদ সংরক্ষিত আছে মাটি ও পানির নিচে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পার হলেও কেবল দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশটি আজও পরনির্ভরশীল হয়ে আছে।
সকল চড়াই-উতরাই এবং ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে যাত্রা করেছে। সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ১১৮০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে অর্থাত্ যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯২,৩৪৪ টাকা (১ ডলার =৭৭.৬৯৮)। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশাব্যঞ্জক এ পরিসংখ্যানের পরে দেশকে গরীব বলা সমীচীন নয়। তারপরেও বলতে হচ্ছে, দেশের শতকরা ৩৭% মানুষ বর্তমানে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মানুষের মৌল-মানবিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা ও শিক্ষার) কোনোটিই তারা সঠিকভাবে পূরণ করতে পারে না।
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে শক্তিশালী করার জন্য সর্বাগ্রে দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হবে। লজ্জার হলেও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথেই দুর্নীতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সমাজে যা দু’একজন মানুষ দুর্নীতি থেকে পরিত্রাণ পেতে চাচ্ছেন তারাও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সত্ভাবে টিকে থাকতে পারছেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ ব্যবস্থা তাদেরকেও দুর্নীতির দিকে পা বাড়াতে বাধ্য করছে।
বৈদেশিক শ্রমবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। নির্বাচনের আগে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল, সে সময় রেমিট্যান্স না আসলে দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়তো। অথচ প্রবাসীরা কেমন আছেন সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। বিদেশে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কোথায় কোথায় সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গত ৩০ বছরে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ ব্লাডে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বর্তমানে চীন এবং ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের সর্বমোট ২৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে এককভাবে শতকরা ৮০ ভাগ অর্জনের পাশাপাশি গার্মেন্টস খাত প্রত্যক্ষভাবে ৪০ লাখ দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। আশার কথা হল, এ ৪০ লাখ দরিদ্র মানুষের মধ্যে ৮০% নারী শ্রমিক। এছাড়াও গার্মেন্টস শিল্পে পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ২ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে সর্বমোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯,০৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১,৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ৯৬৫৩.২৫ মার্কিন ডলার। রপ্তানি আয় বাড়ার সাথে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ব্যবসায়িক সংগঠন বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ৪ হাজার ৩শ’ কারখানা রয়েছে। এছাড়াও এর বাইরে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত কারখানা প্রায় ১ হাজার।
উল্লেখ্য, মোট দেশজ আয়ের ১৬.৫% আসে এই গার্মেন্টস শিল্প থেকে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর যখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের কদর বেড়েছে তখন পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের পোশাক খাতকে অস্থির করে তোলার পাঁয়তারা করছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেশী দেশ প্রতিদ্বন্দ্বী নেপথ্য কারসাজিতে গার্মেন্টস শিল্প ফের অস্থির ও অশান্ত হয়ে ওঠেছে বলে অভিযোগ আছে। সে দেশটি তাদের উদ্দেশ্যে সফল হয়ে বাংলাদেশকে হটিয়ে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দুই নম্বরে উঠে এসেছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান ছিল। সুতরাং যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এখনই দেশের পোশাক শিল্পের সকল সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী না হয় তবে অচিরেই রাষ্ট্রকে মারাত্মকভাবে খেসারত দিতে হবে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে যাবে। কাজেই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য পোশাক শিল্পের সকল সমস্যার সমাধান করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ কোনো অবস্থায় যৌক্তিক নয়। রাষ্ট্র যত দ্রুত এটা অনুধাবন করতে পারবে ততই রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা সমুন্নত হবে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পিছনে সবচেয়ে বড় অন্তরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা। হরতাল, অবরোধের নামে দেশের অর্থনীতির চাকাকে মূলত স্থবির করে দেয়া হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একদিনের হরতালে বাংলাদেশের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কাজেই রাষ্ট্রের স্বার্থে রাজনীতিকদের সহনশীল হতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যদি পারস্পরিক সহনশীল না হন, তবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কামনা করা প্রায় অসম্ভব। সুতরাং রাষ্ট্রের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে হরতালের মত সহিংস আন্দোলন পরিত্যাগ করে অহিংস কিংবা ভিন্ন কোনো আন্দোলনের কথা ভাবা উচিত। হরতাল শুধু রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয় না বরং বিদেশে রাষ্ট্রের ব্যাপক দুর্নাম করে। হরতাল, অবরোধ রোধে বিরোধী দলকে যেমন রাষ্ট্রের কল্যাণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে তেমনি দল-মতের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে সরকারি দলকে রাষ্ট্রের সকলের মঙ্গলের জন্য চিন্তা করতে হবে। সরকার যদি তার দলের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন তবে রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার থেকে তারা নিজেদেরকে নির্দোষ দাবি করতে পারেন না। সুতরাং সরকারি, বিরোধী এবং সকল রাজনৈতিক দলের কাছে অনুরোধ, রাষ্ট্রের কল্যাণের স্বার্থে অনমনীয় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন এবং দেশের কল্যাণার্থে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। সরকার যেমন তাদের অবস্থান ধরে রাখতে ঢালাওভাবে অন্যায়-অবিচার করতে পারেন না তেমনি বিরোধী পক্ষও জনগণকে জিম্মি করে ধ্বংসাত্মক কিংবা সহিংস কোনো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাষ্ট্রের কোনো অকল্যাণ বয়ে আনতে পারেন না।
সর্বোপরি কথা হলো, রাষ্ট্রের সকল সমস্যার অন্তরালে কলকাঠি নাড়ছে দুর্নীতি। রাষ্ট্রের সকল অপরাধের মূল বলেই দুর্নীতি চিহ্নিত। কাজেই একটি রাষ্ট্র যতদিন সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত না হবে ততদিন রাষ্ট্রের কোনো কল্যাণ বা উন্নতি আশা করা যায় না। দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে স্থানীয় সরকারও যদি গণতান্ত্রিক পন্থায় সরবভাবে কাজ করতে পারে তবে অচিরেই দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ক্ষমতাধরদের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীলতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মানসিকতা থাকতে হবে। যতদিন সরকার এবং প্রশাসনের মধ্যে এ মানসিকতা সৃষ্টি করা সম্ভব না হবে ততদিন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে না। কখনো যদি বাহ্যিকভাবে মনেও হয় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে তবে তা স্থায়ী হবে না। কেননা দুর্নীতি এক্ষেত্রে ভাইরাসের মত কাজ করছে। অর্থ-বিত্তের প্রতি মানুষকে লোভাতুর করার মাধ্যমে নানা প্রকার অপরাধমূলক কাজ করতে উত্সাহী করবে। সুতরাং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য পরনির্ভরশীলতা বর্জন করে কঠোর শ্রমের মাধ্যমে এগুতে হবে। বিবেকের জবাবদিহিতা ও নৈতিক শিক্ষাই কেবল দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করতে পারে। যখন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন নিশ্চিত হবে, তখন অনায়াসে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে।
লেখক :নিবন্ধ লেখক
raju69mathbaria¦gmail.com
