আমি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আবার বাবা গ্রামের হাইস্কুল শিক্ষক। মা বংশীয় ঘরের মেয়ে। আমি হয়েছি মায়ের মতো। আমার গায়ের রং কালো। অথচ নাম রাখা হয়েছে পরিমনি। কেন! বাবার গায়ের রং পেলে আমার নাম রাখা যথাযথ হতো।
আমার চেহারা সুন্দর এটা ঠিক! কিন্তু পরির মতো তো না! কালোর মেয়ের চেহারা সুন্দর হলেই কী, না হলেই বা কী! কেউ কি কালো মেয়েদের পছন্দ করে! শুধু মুখে বলে, আমার চেহারা সুন্দর। আমার ঘন কালো লম্বা চুল দেখে সবাই মুগ্ধ। অথচ বিয়ের বাজারে আমার কোনো কদর নেই।
ফর্সা মেয়ের কোনো গুণ নেই। পড়ালেখায়ও তেমন ভালো নয়। তাতে কী? চেহারা তো সুন্দর! বিয়ের বাজারে তার কদর অনেক বেশি। গায়ের রং কি এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ! হায় খোদা! কেন তুমি আমাকে কালো রং দিয়ে দুনিয়াতে পাঠালে! তুমি আমাকে মেধা দিয়েছ। সুন্দর চেহারা দিয়েছ। ঘন কালো লম্বা চুল দিয়েছ। অনেক গুণে গুণান্বিত করেছ। শুধুমাত্র গায়ের রংটাই কালো করে দিয়েছ। আর তাতেই আমার এত দুর্গতি! কেন তুমি আমারে গায়ের রং কালো করে দিলে?
আসলে আমি আমার মায়ের মতো হয়েছি। মা-র গায়ের রং কালো। সে কারণে মা উচ্চ বংশের মেয়ে হয়েও বাবাকে বিয়ে করতে রাজি হন। বাবা দেখতে সুন্দর। গায়ের রং ফর্সা। বিএ পাস করে হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। গ্রামে বিএ পাস হাইস্কুল শিক্ষকের মর্যাদাই আলাদা। মাও গ্রামের কলেজ থেকে বিএ পাস করেছেন। বিয়ের পর তিনি সংসার সামলানো আর রান্নাবান্না ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারলেন না।
না পারার কারণও ছিল। বাবার জমিজমা, টাকা পয়সা কম। টানাটানির সংসার। মা কীভাবে যে সংসারটা আগলে রাখেন তা বলে বোঝানো যাবে না।
আমার ছোট দুই ভাই আছে। তারা হয়েছে বাবার মতো। বাবা ওদেরকে যখন বেশি বেশি আদর করে তখন আমার খুব ঈর্ষা হয়। মনে মনে বলি, আমি কালো বলে বাবাও আমাকে পছন্দ করেন না। আমাকে আদর করেন না। আমি অনেক সময় মা-র কাছে নালিশ করেছি। তাকে বলি, মা জানেন! আমি কালো বলে বাবা আমাকে পছন্দ করেন না!
মা বলতেন, না রে! তোর ওভাবে ভাবা উচিত না। তুই বড় হচ্ছিস তো! তাই তোর বাবা একটু দূরত্ব বজায় রাখছে। ছেলেকে যেমনভাবে জড়িয়ে ধরতে পারে, তোকে কি তেমনভাবে পারে?
কেন? কী হয়েছে? আমি তো তার মেয়ে!
হ্যাঁ। তুই বড় হচ্ছিস না! আমি তোকে আদর করছি না? তোর সঙ্গে আমি যেমন মাখামাখি করি, তোর ভাইদের সঙ্গে কি আমি তেমনভাবে করতে পারি?
মা যে কী বলে কিছুই বুঝি না।
আসলেই আমি মা-র কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে যেতাম।
আমি যখন ক্লাস সিক্সে হাইস্কুলে ভর্তি হই তখন আমরা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়তাম। আমার স্কুলের নাম কাউরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। আমার সঙ্গে কয়েকজন বান্ধবী ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ মেধার মেয়েটি ছিল অপূর্ব সুন্দরী। তার নাম বিউটি। ক্লাস পরীক্ষায় সে বেশিরভাগ বিষয়ে ফেল করত। বার্ষিক পরীক্ষায় টেনেটুনে সে পাস করে। তার রোল ছিল বত্রিশ। অথচ আমি ফার্স্ট হয়ে সেভেনে উঠি। সেই সময়েই দেখেছি, সেফালির প্রেমে গদগদ ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয় জোবায়ের।
ফার্স্টবয় ফার্স্টগার্লকে পছন্দ করার কথা। অথচ আমাকে তার পছন্দ নয়। এজন্য আমি মনে মনে সেফালিকে ঈর্ষা করতাম। মনে মনে বলতাম, সেফালির মতো চেহারা আমার কেন হলো না! আমি বাড়িতে গিয়ে আয়নায় নিজের চেহারা দেখি। মায়াবী চেহারা যাকে বলে! আয়নাটা স্থির ধরে রেখে ডানে মুখ ঘুরাই। বামে ঘুরাই। দাঁত বের করে হাসি। আমার দাঁতগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। ধবধবে সাদা। কত না সুন্দর আমার চেহারা। আমার এই সৌন্দর্য কারো চোখে পড়ে না কেন!
ঈর্ষার কারণে আমি কিছুদিন সেফালিকে দেখতে পারতাম না। আমার পাশে বসতে দিতাম না। ওর সঙ্গে কথাও বলতাম না। মনে মনে বলতাম, ওকে কেন ছেলেরা বেশি পছন্দ করে। আমাকে কেন নয়! আমি ক্লাসের ফার্স্টগার্ল! আমাকে নিয়ে স্যারদের এত গর্ব! আর ছেলেগুলা ওর পেছনে ঘোরে! না না! এটা হতে পারে না।
সেফালিকে আমি এড়িয়ে চলি—এটা সে বুঝতে পেরে আমার সঙ্গে বেশি বেশি মিশত। নানা অজুহাতে আমাদের বাড়িতে আসত। আমার সঙ্গে দেখা করত। নানাভাবে বোঝাত, সে আমার ভক্ত। আমি পরে বুঝলাম, ওর সঙ্গে আমি যা করছি সেটা ঠিক না। আমার কাজ হবে লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আমি তাতেই বেশি মনোযোগ দিলাম।
আমি ক্লাস নাইনে ওঠার পর আমার জীবনে নেমে এল এক অমাবস্যার অন্ধকার। হঠাত্ এক রাতে মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমার জন্মের পর থেকে দেখে আসছি মাকে। মা একটু জ্বরেও ভোগেননি। কাশিও দেননি। কোনো রকম শারীরিক অসুস্থতা তার ছিল না। রাতে ঘুমানোর আগেও কোনো কিছু টের পাইনি। মা-র হঠাত্ কী হলো? কোথায় তার অসুবিধা হচ্ছে? কিসের কষ্টে ভুগছেন মা? আমরা কেউ কিছু বুঝতে পারছি না। ওই রাতে কোথায় নেয়া হবে, কীভাবে মা-র কষ্টের উপশম হবে তা নিয়ে সবাই রীতিমতো অস্থির। মা-র কষ্ট দেখে আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কিন্তু আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই।
আমরা সবাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, ভালোয় ভালোয় যেন রাতটা পার হয়। কষ্টের সময় যেন কিছুতেই পার হতে চায় না। তখন আমাদের কাছে প্রতিটা সেকেন্ডও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দম বন্ধ করা পরিস্থিতি! উদ্বেগের পারদ চড়তে থাকে প্রতি মুহূর্তে। গভীর উত্কণ্ঠার মধ্যে ভোর হয়। মাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার সাহেব মাকে দেখে বললেন, দ্রুত বরিশাল শেরে বাংলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে। বাবা দেরি করলেন না। তিনি মাকে নিয়ে বরিশাল রওয়ানা হলেন। আমাকে বলে গেলেন, মা তোর ওপর সব দায়িত্ব থাকল। ছোট ভাইদের নিয়ে থাক।
মনে মনে দোয়াদরুদ পড়ছি আর বলছি, হে বিধাতা তুমি আমার মাকে সহিসালামতে ফেরত এনো। তিনদিন পর মা বাড়িতে এলেন লাশ হয়ে। মাকে হারিয়ে আমরা তো বটেই বাবাও অসহায় হয়ে পড়লেন। বাড়ির সবকিছু আমাকে সামলাতে হয়। আমি ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারি না। স্কুলেও অনিয়মিত। স্যাররা আমাকে নিয়ে চিন্তিত।
একদিন হেডস্যার আমাকে ডেকে বলেন, পরিমনি তোমার কী হয়েছে বলো তো! দিন দিন তোমার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। তুমি স্কুলেও অনিয়মিত হয়ে পড়েছ! আমাকে খুলে বলো। আমি কি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারি?
আমি স্যারকে আমার পারিবারিক সমস্যার কথা খুলে বললাম। আমার সমস্যার কথা শুনে স্যার নিজেও উদ্বিগ্ন। তিনিও বুঝতে পারছেন না; এ সমস্যার সমাধান কী? তিনি আমাকে সমবেদনা জানালেন। অন্য স্যাররাও তাই করলেন। তাদের আর কী-ই বা করার আছে!
মা সবকিছু খুব ভালোভাবে সামলাতেন বলে বাবা টেরই পেতেন না, সংসার কীভাবে চলছে। তিনি যা বেতন পেতেন তা মা-র হাতে তুলেই দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতেন। মা পুরো মাস খুব সুন্দরভাবে চালাতেন। আমি কি আর মা-র মতো করে তা পারি!
আমার লেখাপড়া নিয়ে বাবাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। সবকিছু সামলে আমার পক্ষে স্কুলে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু তিনি চান, আমি লেখাপড়া করি। নিজের পায়ে দাঁড়াই।
বাবা একদিন লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে আমাকে বলে বসলেন, পরিমনি আমি কী করব বল তো! সংসার তো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তোর লেখাপড়াও ঠিক মতো হচ্ছে না।
আমি বুঝতে পারলাম বাবা কী বলতে চান। আমিও এটাই আশা করেছিলাম। মনে মনে ঠিক করেছিলাম, বাবা বিয়ে করতে চাইলে আমি না করব না। আমি তাকে বললাম, আপনি আরেকটা বিয়ে করেন বাবা। তা না হলে আমার পক্ষে লেখাপড়া করা কঠিন!
সংসারের কথা ভেবে এবং আমার সম্মতি পেয়ে বাবা বিয়ে করলেন। যাকে বিয়ে করলেন তার আগে আরেকটা বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়ে টেকেনি। কোনো সন্তানাদিও নেই তার। আমরা ভাবলাম, নতুন মা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের সব আশা দুরাশায় পরিণত হলো।
২.
নতুন মাকে আমরা আম্মা ডাকি। প্রথম প্রথম তিনি ভালোই ছিলেন। মায়ের মতোই আমাদের আদর করতেন। আস্তে আস্তে তিনি কেন যেন পাল্টে গেলেন। বিশেষ করে আমার সঙ্গে প্রায় দুর্ব্যবহার করা শুরু করলেন। মাঝেমধ্যেই আমাকে স্কুলে যেতে বাধা দেন। পড়তে বসলে নানা অজুহাতে ডাকাডাকি করেন। আমি ঠিকমতো পড়তে পারি না। তিনি প্রায়ই বলেন, মেয়েদের এত পড়ে কী হবে? সেই তো চুলো গুঁতানো, রান্নাবান্না করা আর থালাবাটি ধোয়া! এর জন্য কি এত শিক্ষার দরকার আছে?
এসব কথায় আমার খুব মেজাজ খারাপ হতো। আমার জেদ চেপে যেত। কিন্তু আমি কিছু বলতে পারতাম না। চুপচাপ সহ্য করতাম। মাঝেমধ্যে বাবার সামনেও আম্মার গা জ্বলা কথাগুলো শুনেছি। বাবা চুপিচুপি আমাকে ডেকে নিয়ে সান্ত্বনা দিতেন। বলতেন, তুই মন খারাপ করিস না মা। যার যেমন স্বভাব! তার কথায় তো আর তোর পড়া বন্ধ হবে না।
বাবার ওই সান্ত্বনাটুকু সত্যিই খুব ভালো লাগত। বাবা অবশ্য অনেক সময় আম্মাকে কটু কথাও শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেখ বিয়ের আগে কিন্তু তোমাকে বলেকয়ে আনা হয়েছে। এখন তোমার কোনো টিপ্পনি কাটা কথা শুনতে পারব না। তোমার কারণে আমার মেয়ের যেন পড়ার কোনো ক্ষতি না হয়।
আম্মা আব্বার কোনো কথা গায়ে মাখতেন না। তিনি যেন আমার বিরুদ্ধে মিশনে নেমেছেন। যদিও আমি কোনোদিন তার সঙ্গে কোনো বেয়াদবি করিনি। তার কথার অবাধ্য হইনি। তারপরও কেন যেন আমার পেছনে লেগেছেন বুঝতে পারি না।
নানারকম বাধাবিপত্তির পরেও আমি ভালোয় ভালোয় মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারলাম। রেজাল্ট তেমন খারাপ হয়নি। দুই বিষয়ে লেটারসহ ফাস্ট ডিভিশন। গ্রামের কলেজেই ভর্তি হলাম। বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক পাস করলেও কলেজে ভর্তি হলাম আর্টস বিভাগে। বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে প্রতিদিন ক্লাস করতেই হবে। তা না হলে রেজাল্ট ভালো হবে না। আম্মা যা শুরু করেছে তাতে আমার পক্ষে প্রতিদিন ক্লাস করা সম্ভব নাও হতে পারে।
আমার কলেজের প্রথম যেদিন ক্লাস ছিল—সেদিন আম্মা এমন এক কাণ্ড ঘটাল, আমার পক্ষে আর কলেজে যাওয়া সম্ভব হলো না। আমি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কান্নাকাটি করেছি। বাবাও ব্যাপারটা ভালোভাবে নেননি। আমার জন্য তিনি আম্মাকে অনেক বকাঝকা করেছেন। এসব বকা আম্মা গায়েই লাগান না। আম্মাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, কার বুদ্ধিতে উনি চলেন! আগে তো এমন ছিলেন না! তাছাড়া ইদানীং আমার দুই ভাই পলাশ ও শিমুলের সঙ্গেও তিনি দুর্ব্যবহার শুরু করেছেন। এটা দেখে আমার মেজাজ আরো চড়ে গেল। আমি এ নিয়ে আম্মার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটিও করলাম। কিন্তু তাতে কোনো ফল হলো না। তার স্বভাব মোটেও পাল্টাল না।
আমি একদিন আম্মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আম্মা আপনি তো এমন ছিলেন না। আপনি হঠাত্ এমন পাল্টে গেলেন কেন?
আম্মা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, তোমরা আমারে আম্মা ডাকো আর যা-ই ডাকো; তোমরা তো কোনোদিন আমার আপন হইবা না।
এই ধারণা আপনার কেন হলো? আমাদের আপন মা তো নেই! আপনিই তো আমাদের মা।
পর কোনোদিন আপন হয়?
ঠিকই বলেছেন আম্মা। পর আপন হয় না। তাকে আপন করে নিতে হয়!
আমার বইন আইস্যা বলল, তুমি কেন নিজে কষ্ট কইরা ওই মাইয়াডারে পড়াও। বিয়া দিলেই তো শেষ! পোলা দুইডা বড় হইলে দূরে চইল্যা যাইব। তোমারে ওরা দেখব? তারপর থাইক্যা আমার মনডা খারাপ। আমার কী হইব।
আমি যা মনে মনে ভাবছিলাম। কেউ আপনার মনে বিষ ঢুকিয়েছে। আমরা ওমন মানুষ না। বরং এখন আপনি যা করছেন তাতে আমাদের মনে দাগ লাগছে। আমরা কষ্ট পাচ্ছি।
আমি আম্মার সঙ্গে কথা বলার পর তিনি কিছুদিন ভালো ছিলেন। কয়েকদিন পর অন্য কাহিনি শুরু করলেন। আমাকে দিয়ে দেয়ার জন্য আব্বাকে নানারকমভাবে চাপ দিতে লাগলেন। বাবাকে কিছুতেই তিনি পটাতে পারলেন না। বাবা বলে দিয়েছেন, লেখাপড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাকে বিয়ে দেবেন না। পরে তিনি অসুস্থতার ভান করে সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকতেন। সংসারের কোনো কাজ করতেন না। সেই কাজের চাপ পড়ত আমার ওপর। বাধ্য হয়েই আমাকে করতে হতো। তাতে আমার লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটত।
অনেক কষ্ট সহ্য করে আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাও দিতে পারলাম এবং ভালোভাবেই পাস করলাম। আমার চিন্তা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। বাবাকে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। তিনি অমত করলেন না। আমি মনে মনে বললাম, বাবা যখন রাজি তখন আর আমাকে আর কে আটকায়। ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য বাবা আমাকে টাকা দিলেন। আর বললেন, আমি যেন পলাশকে নিয়ে যাই।
পলাশকে নিয়ে আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিই। শেষ পর্যন্ত আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। আমার বিষয়, সরকার ও রাজনীতি। প্রথম বছরই হলে ওঠার সুযোগ পাই। কাজেই আমার থাকা নিয়ে বাবা যে দুশ্চিন্তা করছিলেন তা কেটে গেল। আরেকটি সমস্যা নতুন করে দেখা দিল। বাবার পক্ষে আমাকে নিয়মিতভাবে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি আমাকে বললেন, দু-একটা টিউশনি যদি করাতে পারো তাহলে খুব ভালো হয়।
আমি চিন্তা করতে লাগলাম। ছোট দুই ভাই লেখাপড়া করে। ওদের খরচও কম না। পরিবারের সব খরচ সামাল দেওয়া বাবার পক্ষে সত্যিই অসম্ভব। আমি টিউশনি খুঁজতে থাকলাম। কিছুদিনের মধ্যে পেয়েও গেলাম। বিকেলে টিউশনি করাই। রাতে নিজের পড়া পড়ি। গ্রামে খুব একটা যাই না। টিউশনি থাকে, নিজের ক্লাস থাকে। আমি এখন ভীষণ মনোযোগী ছাত্রী।
অনার্স পরীক্ষায় আমি খুব ভালো রেজাল্ট করলাম সেকেন্ডে ক্লাস ফার্স্ট। ফার্স্ট ক্লাস একজনে পেয়েছে। আমি খুব খুশি। বাবা আমার রেজাল্টের খরব শুনে ভীষণ খুশি। আম্মাকেও খবরটা জানিয়েছি। কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি।
আমি মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। পলাশ এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেছে। শিমুল জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছে। এসব ভালো খবরের মধ্যে আমাদের জীবনে নেমে এল মহাবিপর্যয়। হঠাত্ আব্বার হার্ট অ্যাটাক করল। তাকে আর বাঁচানো গেল না। পরিবারের সমস্ত দায়দায়িত্ব আমার ওপর চাপল। আমি এখন পাঁচ-পাঁচটা টিউশনি করাই। পরিবারের খরচ, দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাই। কষ্ট কাকে বলে তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
কোনোমতে মাস্টার্স শেষ করেই আমি একটি এনজিওতে কাজ শুরু করলাম। সরকারি চাকরির জন্য আমি অপেক্ষা করলে হয়তো ভালো একটা চাকরি পেয়েও যেতাম। ভাইদের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভুলে গেলাম।
৩.
আমি সংসারের হাল ধরার পর আম্মা আর আগের মতো নেই। তিনি পাল্টে গেছেন। তিনি এখন আমাকে মা ডাকেন। আমার ছোট দুই ভাইকে নিজের ছেলের মতোই আদর করেন। ওদের লেখাপড়ার দিকে নজর রাখেন। আসলে উনার আর কোনো বিকল্প ছিল না। নিজের সন্তানাদি নেই। যে বয়স হয়েছে তাতে আর অন্যত্র সংসার করার অবস্থাও তার নেই।
পলাশ এইচএসসিতে খুব ভালো রেজাল্ট করে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পায়। আমি দারুণ খুশি। এখন শিমুল ভালো করতে পারলেই দুশ্চিন্তা শেষ। শিমুল সবার চেয়ে বেশি মেধাবী। ও নিশ্চয়ই ভালো করবে।
হ্যাঁ, শিমুলও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করে। সেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সে ভর্তি হয় প্রাণ রসায়নে। ওর এই খবর শোনার পর আমার কী যে আনন্দ হয়েছিল! আমার মনে হলো, এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কিছু নেই।
দুই ভাই আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে। আমার মনে হয়, এর চেয়ে আর কী পাওয়ার আছে আমার! নিজে বিয়ে করিনি বলে অনেকেই অনেক কথা বলে। কিন্তু দুই ভাই যখন মাথা উঁচু এবং বুক প্রসারিত করে আমার সামনে দাঁড়ায় তখন মনে হয় জগতের সবচেয়ে সুখি মানুষ আমিই।
পলাশ ও শিমুল আমার বিয়ের ব্যাপার নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলেছে। আমাকে বুঝিয়েছে। অনেক চেষ্টাও করেছে। কিন্তু পছন্দমতো পাত্র পাওয়া যায় না। আমার যে বয়স তাতে সবকিছু মেলানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। ছেলেরা এমন! গায়ের রং ফর্সা কি না সেটাই দেখে। মন ফর্সা কি না দেখে না।
কিছুদিন ধরে একটা ছেলে আমার পেছনে ঘুরঘুর করে। সে জানায়, আমাকে নাকি তার ভীষণ পছন্দ। সে অবিবাহিত। ভালো চাকরি করে। অনেক টাকা বেতন পায়। পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সে বিয়ে করেনি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। আমার দুই বছরের বড়।
আমি দেখলাম, ছেলেটা দেখতে শুনতে মন্দ না। শিক্ষিত বলেই মনে হয়। কথাবার্তাও গুছিয়ে বলে। পোশাক-আশাক দেখে মার্জিতই মনে হয়। আমি তাকে বিয়ে করতে রাজি হই। আমার দুই ভাই এতে কী যে খুশি হয়! তাদের খুশি হওয়ার কারণ, আমি পছন্দ করে বিয়ে করছি।
বিয়ের পর আমরা সুন্দর একটা বাসা নিই। সুন্দরভাবেই আমার পারিবারিক জীবন শুরু হয়। কিছুদিন পরই বুঝতে পারি, আমি একটা ফ্রডের পাল্লায় পড়েছি। ছেলেটি যে চাকরির কথা বলেছে তা পুরোটাই মিথ্যা। সে কোথাও চাকরি করে না। যদিও সে প্রতিদিন সকালে চাকরির নাম করে বাসা থেকে বের হতো।
গোপনসূত্রে জানতে পারলাম, সে আরো দুটি বিয়ে করেছে। সেই বিয়ের কথা আমাকে গোপন করেছে। আমি যখন তাকে শক্ত করে ধরলাম; সে বিয়ের কথা স্বীকার করল। আমি এ রকমভাবে প্রতারিত হবো তা কোনোদিন ভাবিনি। এত সত্ জীবনযাপন করে শেষ পর্যন্ত প্রতারকের পাল্লায় পড়লাম! মনের ভেতরে গভীর এক ক্ষতের সৃষ্টি হলো। ব্যাপারটা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারলাম না।
আম্মা, দুই ভাই আমাকে সান্ত্বনা দেয়। তারা নতুন করে শুরু করতে বলে। আমি হতাশায় ভেঙে পড়ি। এত ঘাত প্রতিঘাতের পর দুই ভাইকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করলাম। তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আমার আনন্দের কোনো সীমা ছিল না। কিন্তু নিজের জীবন এভাবে এলোমেলো হয়ে গেল কেন আমার!
যে কোনো মানুষের জীবনে খারাপ কিছু ঘটলে লোকে বলে, কপালের দোষ। কপালের দোষ কি কালো-ফর্সা দেখে হয়! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তো কৃষ্ণাঙ্গ। তিনি তো দুই দুইবারের প্রেসিডেন্ট! তার বেলায় তো ভাগ্যের চাকা ঠিকভাবেই ঘুরেছিল! আমার বেলায় কেন এমন হলো!
৪.
আম্মা অনেক দিন আমার সঙ্গেই ছিলেন। হঠাত্ একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু তাকে বাঁচানো গেল না। আম্মা মারা যাওয়ার পর আমি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। আমার নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটাতে শিমুল ও রাশেদ আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যাপক তত্পরতা শুরু করল।
প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আমি বিয়ে করতে মোটেই রাজি নই। তারপরও ভাইদের অনুরোধ রক্ষার জন্য বিয়ে করতে রাজি হই। কিন্তু এখন যে সব প্রস্তাব আসছে তাতে আমার কষ্ট আরো বেড়ে গেল।
ষাট পঁয়ষট্টি বছর বয়সের বৃদ্ধরা আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এর পেছনে অন্য কারণ আছে। আমার টাকা পয়সার প্রতি তাদের লোভ। আমাকে বিয়ে করতে পারলে বাকি জীবন সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারবে। কিন্তু আমি কেন এসব জঞ্জাল ঘরে ঢুকিয়ে নিজের শেষ সুখটুকুও বিসর্জন দেব!
আমি চোখে ঘোর অন্ধকার দেখছি। আর ভাবছি, জীবন এত জটিল কেন? v
