শিল্পের জন্য শেখ মুজিব

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৫
শিল্প-সাহিত্যের প্রতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যেমন গভীর ভালোবাসা ছিলো, তেমনি শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতি ছিলো তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মজীবনীতে সেই স্বাক্ষর পাওয়া যাবে। তিনি তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতাতেও প্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্র-নজরুলের কবিতা তুলে ধরে বক্ত্যবকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতেন। ‘আমার সোনার বাংলা’... গানটিকেই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেন। স্বাধীনতার পর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকায় এনে ‘জাতীয় কবির’ সম্মান দেন। ১৯৯১ সালে ‘শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব’ বইটি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এ ধরনের অজস্র দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে নানামুখী সংকট-সমস্যা সত্ত্বেও নজর দিয়েছেন সাংস্কৃতিক জগতে। এক প্রতিবেদনে যত্সামান্য চিত্র তুলে ধরছি। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকা সত্ত্বেও অভাব-অনটনে থেকে কবি ফারুখ আহমদকে ব্যাগ ভর্তি টাকা পাঠিয়েছিলেন লেখক মাহবুব তালুকদারের মাধ্যমে। যুদ্ধোত্তর দেশে শিল্পী কমল দাশগুপ্তকে রেডিওতে, পল্লী কবি জসীম উদদীনকে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। অসুস্থ কবি হুমায়ূন কবির, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা এঁদেরকে সুচিকিত্সার জন্য বার্লিন-মস্কো-লন্ডন পাঠান। একটি কবিতা লেখার ‘অপরাধে’ দাউদ হায়দারকে মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করে নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতা পাঠান। সে নিয়ে দাউদ লিখেছেন :‘তুমি আছো বলে অমোঘ পুরস্কার নিয়ে/ বেঁচে আছে কবি ও কবিতার দাউদ হায়দার।’ ১৯৭৪ সালে জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়ে ম্যাট্রিক পাশ কবি আল মাহমুদকে শিল্পকলা একাডেমীর মতো প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। তা নিয়ে আল মাহমুদের স্বীকারোক্তি, ‘আমার মতো একজন নগণ্য কবির জন্য একটি যোগ্য পেশা ও পদের অনুসন্ধান করে কেবিনেটের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীকে আমার সাক্ষাতেই টেলিফোনে ডেকে পাঠিয়েছেন।’ এবং সাথে সাথেই তার চাকরি হয়ে যায়! বঙ্গবন্ধু বিটিভি পরিদর্শনে গিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে জানতে পারেন, সেন্সরশিপ আর প্রমোদ করের জন্য নাটক প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। পরদিন গণভবনে সংশ্লিষ্ট সচিবকে ডেকে এই প্রশাসনিক জটিলতা দূরের নির্দেশ জারির আদেশ দেন। ছাপান্ন সালে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বল্পকালীন সময় ক্ষমতায় ছিল। তখন মন্ত্রী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেই সময় শহীদ মিনারের ভিত্তি ও মঞ্চ নির্মাণের কাজে বিরল ভূমিকা রাখেন। এবং সাতান্ন সালের ৩ এপ্রিল আইন সভায় ‘বাংলা একাডেমী অ্যাক্ট ১৯৫৭’ পাস হয়েছিলো। মাত্র ১৪ মাসের মন্ত্রিসভার সদস্য হয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক কাজ করেছেন। যেমন—বাদল রহমানের লেখা থেকে জানা যায়, ‘পূর্ব বাংলার চলচিত্র নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করতে এগিয়ে এলেন তত্কালীন আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক আইন পরিষদের মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার সহায়তায় ‘চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’ বিল উপস্থাপন করেন। এবং এই সংস্থা গঠনের মাত্র দেড় মাসের মধ্যে ফতেহ লোহানী শুরু করলেন ‘আছিয়া’ নির্মাণ। বঙ্গবন্ধু প্রেরণায় ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে যে আন্তরিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে বহু বিদেশি কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। স্পম্মেলন উদ্বোধন কালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক থেকে দরিদ্র নই। আমাদের ভাষার দু’হাজার বছরের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। আমাদের সাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর’। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনাও সেই ধারা বহন করে যাচ্ছেন। তিনিও এ দেশের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিকদের আপন জন হয়ে আছেন। তাঁদের সব সময় পাশে রাখছেন। অসুস্থ হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে গিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেন চিিকসার জন্য সামান্য অর্থ। তাঁকে বানান জাতি সংঘ মিশনের উপদেষ্টা। এভাবেই কবি মহাদেব সাহা সুচিিকসার ব্যবস্থা করেন। অভিনেতা খলিলের হাতে তুলে দেন দশ লাখ টাকা। যা পেয়ে আপ্লুত হয়ে খলিল বলেন, ‘আমি তো একদিনেই ধনী হয়ে গেলাম।’ এ রকম দৃষ্টান্তের শেষ নেই। হাসিনা সংসদের দিকে তাকালেও দেখা যায়, অনেক শিল্পী-সাহিত্যিককে মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন—অভিনেতা ও মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, কবরী, তারানা হামিল, শিল্পী মমতাজ বেগম, সদ্য প্রয়াত লেখক-সাংবাদিক বেবী মওদুদ, কবি রুবী রহমান, কাজী রোজী প্রমুখ। লেখক :কথাসাহিত্যিক, দৈনিক ইত্তেফাকের কানাডা প্রতিনিধি