ক্রিকেটার, জাতীয় ক্রিকেট দল
সেটা ১৯৯৬ সাল; আমার বয়স তখন দশ বা এগারো। এর আগ পর্যন্ত আমি এই মহানায়কের নাম হয়তো দু-একবার শুনেছি। কিন্তু সেভাবে বুঝে উঠতে পারিনি; বলা ভালো কখনো বুঝতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু সেই প্রথম এসে আমি বুঝতে পারলাম, তিনি কে ছিলেন। ১৯৯৬ সাল থেকে আসলে আমরা এই প্রজন্মের তরুণরা প্রথম চিনতে শিখলাম তাকে। প্রথম বুঝতে শিখলাম যে, আমাদের জাতির একজন মহান নেতা ছিলেন, যার নেতৃত্বে আমাদের এই বাঙালির, বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তি হয়েছে—তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আমি অন্তত একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের যে ঋণ তা বাঙালি জাতির পক্ষে শোধ করা সম্ভব না। ব্যক্তিগতভাবে মহান এই নেতার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা, যে ভালোবাসা সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, বলে বোঝানোর মতো না। আমি মনে করি শুধু আমার নয়; পুরো বাংলাদেশেরই তার প্রতি এই অসীম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা আছে।
আমি যদি খুব সংক্ষেপেও বলি, তাহলে বলতে হবে, বঙ্গবন্ধু না এলে আজও এই বাঙালি জাতিকে হয়তো পরাধীন হয়ে থাকতে হতো। মহান আল্লাহ্ নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুকে বেছে নিয়েছিলেন আমাদের এই জাতিটার জন্য। আর বঙ্গবন্ধু তার অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। আপনি ভাবুন, আমাদের যে একটা নিজেদের দেশ, নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা; এগুলো নিয়ে আমরা আজ বুক উঁচু করে বাঁচতে পারছি; বঙ্গবন্ধু ছাড়া এটা কল্পনাও কী করা সম্ভব?
আমি বলি, পলাশীর পর থেকে বাঙালি শুধু স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখে গেছে। আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনোই কম ছিল না। বঙ্গবন্ধু যদি না থাকতেন, আজও হয়তো সেই আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নই থেকে যেত। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মানুষের নেতৃত্বই আমাদের এই কয়েক যুগের স্বপ্নটাকে সত্যি করেছে।
আজ যখন মহান এই নেতাকে নিয়ে বলছি, দিনটা আসলে আমাদের জাতির জন্য সবচেয়ে শোকের দিন।
ষোলোই ডিসেম্বর আমাদের যেমন সবচেয়ে গর্বের দিন, অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য, বাঙালি জাতির জন্য ১৫ আগস্টের চেয়ে শোকের দিন আর হতে পারে না। যেই মানুষটার হাত ধরে, যেই মানুষটার নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেলাম; সেই মানুষটাকেই স্বাধীনতার সাড়ের তিন বছরের মাথায় এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো! যে পরিবারটা সারা জীবন এই দেশের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে গেছে, তাদের শিশুদের, নারীদের সহ এইভাবে হত্যা করা হলো! এর চেয়ে শোকের ব্যাপার একটা জাতির ইতিহাসে আর কী থাকতে পারে?
আমি বিস্মিত হয়ে যাই, আশ্চর্যবোধ করি যে, এরকম একটা নৃশংস, বিশ্বাসঘাতকতার কাজের পরিকল্পনা এই বাংলাদেশের কিছু মানুষই কিভাবে করতে পারে! যাদের জন্য বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন উত্সর্গ করেছেন, তাদের একজন মানুষও কী করে এই পরিকল্পনা করে?
বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর বাঙালির প্রতি বিশ্বাসটা দেখুন। বারবার বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা তাকে বলছে, এমন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আর তিনি হেসে বলছেন, ‘পাকিস্তানিরা পারেনি, বাঙালিরা আমাকে মারবে কেন? বাঙালি আমাকে মারবে না।’
এই বিশ্বাসের কী ভয়ঙ্কর প্রতিদান দেওয়া হয়েছে।
দেখুন ১৫ আগস্ট শুধু কয়েকটি হত্যা করা হয়নি, এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসের পথই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। প্রথমত দেশের সবচেয়ে গৌরবের সন্তান, আমাদের সবচেয়ে বলিষ্ঠ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে তিনটি উজ্জ্বল পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর যে কাজটা হয়েছে—বাংলাদেশে বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আজ আমরা কথায় কথায় বলি—বাংলাদেশে বিচার পাওয়া যায় না। এই বিচারহীনতা শুরু হয়েছে ১৫ আগস্ট থেকে। ১৫ আগস্টের খুনিদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে, তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আরও ভয়ানক হলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে সঙ্গে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হয়ে গেছে। একটা জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটি ম্যাসাকারের বিচার না করে, আপনি খুনিদের উল্টো পুরস্কৃত করলে বিচার আর কিভাবে থাকে?
আমি সরকারকে ধন্যবাদ দিই। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে হলেও বঙ্গবন্ধুকে যারা সরাসরি খুন করেছিল, তাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। সেই সঙ্গে অবিস্মরণীয় ব্যাপার যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর শুরু হয়েছে। এখন দরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা।
আমি কোনো রাজনৈতিক কথা বলছি না। একটা জাতির বিকাশের জন্য এটা দরকার। আমরা এই কাজগুলো সম্পন্ন না করতে পারলে সামনের দিকে এগোতে পারব না। আমি আশাবাদী, এই এগোনোর কাজটা এখন শুরু হবে।
শাহরিয়ার নাফীস :জাতীয় দলের ওপেনার। জাতীয় দলের হয়ে
এ পর্যন্ত ২৪টি টেস্ট ও ৭৫টি ওয়ানডে খেলেছেন।
