সম্প্রচার নীতিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, নিয়ন্ত্রণমূলক

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৫
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা সংবিধান, তথ্য অধিকার আইন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সার্বিকভাবে এই নীতিমালা গণমাধ্যমের উপর সরকারের এক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। তাই একুশ শতকের এই সময়ে নিবর্তনমূলক এই নীতি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নীতিমালার বিষয়ে টিআইবির অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল এ কথা বলেন। এ বিষয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, পরিচালক (আউটরিচ ও যোগাযোগ) রিজওয়ান-উল-আলম, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মীর আহসান হাবিব প্রমুখ। সুলতানা কামাল বলেন, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় ‘কিছু ইতিবাচক’ দিক থাকলেও নেতিবাচক দিকও অনেক। এর মাধ্যমে সম্প্রচার গণমাধ্যমকে ‘ঝুঁকির’ মধ্যে ফেলা হয়েছে। তাই এই নীতিমালা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এভাবে কোনো গণমাধ্যম চলতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, তথ্য অধিকার আইনে বিশেষ বাহিনীর বিষয়ে কোনো তথ্য জানার সুযোগ রাখা হয়নি। আর এ নীতিমালায় জুড়ে দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এর মাধ্যমে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হবে। তখন তারা দুর্নীতি, অনিয়মসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, নীতিমালায় যেসব বাহিনীর কথা বলা হচ্ছে, তারা সরকারি বাহিনী নয় বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি-ই স্বচ্ছতা ও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার স্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এর মাধ্যমে এক ধরনের দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যারা ক্ষমতায় আসে তারা দেশ, সরকার ও রাষ্ট্রকে একসাথে গুলিয়ে ফেলে। তারা মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলা। অবশ্যই আমরা দেশের বিরুদ্ধে কথা বলব না। তবে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করব। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নীতিমালা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। নীতিমালার ইতিবাচক দিকগুলোকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব নীতি নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলোকে অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। নীতিমালার বাস্তবায়নে স্বচ্ছ কমিশন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪ বিষয়ে টিআইবির অবস্থান ব্যাখ্যা করেন রিজওয়ান-উল-আলম। টিআইবির অবস্থানপত্রে বলা হয়, ১৩টি লক্ষ্য ও চারটি কৌশলের মাধ্যমে সম্প্রচার নীতিমালা বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও অনেকগুলোর ব্যাখ্যা নীতিমালায় নেই। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কীভাবে সম্প্রচার মাধ্যম শক্তিশালী করা হবে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আবার সম্প্রচার মাধ্যমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার যে ‘উদ্ভাবনী’ মডেলের কথা নীতিমালায় এসেছে তা আগে কখনো কেউ শোনেনি। নীতিমালার তৃতীয় অধ্যায়ের সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার অংশের ৩.২.১ ধারায় বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনভাবেই দেশ এবং জনস্বার্থ বিরোধী বক্তব্য প্রচার করা যাবে না (নতুন সংযোজন); কিন্তু দেশ এবং জনস্বার্থ বিরোধী বক্তব্য সম্পর্কে নীতিমালায় স্পষ্ট করে কিছু না বলায় এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার একটা সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে প্রচার মাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে এবং ভীতিমূলক সেলফ সেন্সরশিপ চেপে বসবে। ৩.২.২ ধারায় আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে কোন প্রকার বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য বা উপাত্ত দেয়া যাবে না বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত টক শোকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে উল্লিখিত ১২টি বিষয়ের মধ্যে যে ৭টি বিষয় “করা যাবে না” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যার বেশিরভাগই বাক স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। উল্লেখিত বিষয়গুলোর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় তা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের আশঙ্কা অমূলক নয়। এর মধ্যে ৫.১.১ -এ বলা হয়েছে ‘জাতীয় আদর্শ বা উদ্দেশ্যের প্রতি কোন প্রকার ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপ, বাংলাদেশের জনগণের অবমাননা অথবা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অখণ্ডতা বা সংহতি ক্ষুণ্ন হতে পারে এমন দৃশ্য বা বক্তব্য প্রচার পরিহার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচারিত অনুষ্ঠানে জাতীয় আদর্শ ও উদ্দেশ্য অনুসরণ করা হচ্ছে কী না তা কোন প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হবে তা স্পষ্ট নয়। ৫.১.৫ ধারায় কোন অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপনে সশস্ত্র বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কোন সংস্থা এবং অপরাধ রোধ, অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং অপরাধীকে দণ্ড প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতি কটাক্ষ বা বিদ্রূপ কিংবা তাদের পেশাগত ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পারে এমন কোন দৃশ্য প্রদর্শন কিংবা বক্তব্য প্রচার করা যাবে না (সম্পাদিত)। এই ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করায় প্রচার মাধ্যমসহ সকল প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ৫.১.৭ ধারায় বলা হয়েছে, একটি বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের সমালোচনা করা যাবে না; কিন্তু বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের সকল আচরণ সমালোচনার ঊর্ধ্বে এমন ভাবার কোনো যুক্তি নেই। ৫.১.৯ ধারায় বলা হয়েছে, জনস্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোন বিদ্রোহ, নৈরাজ্য এবং হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন পরিহার করতে হবে (নতুন সংযোজন)। অনুমোদিত নীতিমালায় এই ধারাটি সংযুক্ত করায় জনস্বার্থ শব্দটি সরকারের স্বার্থের সমার্থক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার যথেচ্ছার ব্যবহারে সম্প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নীতিমালাকে একটি অনুসরণীয় নিয়মাবলী করতে ছয় দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে, একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর সম্প্রচার কমিশন গঠন, সার্চ কমিটি গঠনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ বন্ধ করা, লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার স্বার্থে এ সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা, বিজ্ঞাপন নীতিমালাকে সম্প্রচার নীতিমালা থেকে আলাদা করা।