যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আর পাঁচজন বাঙালির মতোই আমি মনে করি না। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙালি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে আসছিল। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে।
আমার সৌভাগ্য আমি আমার ছোটেবেলা থেকেই তার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। তার চেহারা দেখে মুগ্ধ হলাম, তার কথা ভাল লাগতো। ১৯৪৮-৪৯ সালে সদরঘাটে রূপমহল সিনেমার সামনে অথবা নবাবপুরে রিকশার উপর দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন। এই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। আমার বাবা মো. আরিফ চৌধুরীকে তিনি ধনুভাই বলে ডাকতেন। মনে আছে একদিন বাবা ১৫০ নম্বর মোগলটুলি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, আর তিনি সাইকেলে বসা, সেই পাজামা, সেই হাফ শার্ট, সেই মিষ্টি চেহারার মানুষটি বাবাকে দেখেই ধনুভাই ধনুভাই বলে চিত্কার করছেন। সেই দৃশ্যটি আমার মনে গেঁথেছিল বলেই সাইকেল পর্যায় নামের একটি কবিতা অনেক পরে লিখেছিলাম। সেই ৭১ নম্বর রাধিকা মোহন বসাক লেনের বাসায় আমরা ছিলাম, তিনিও ছিলেন। সে অনেক বৃত্তান্ত।
বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আরমানিটোলার ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভায় কথা বলতে গিয়ে তিনি বাবার কথা খুব সুন্দরভাবে বলেছেন।
যে স্বপ্ন বাঙালি দেখে আসছিল, দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ঘোষিত পাকিস্তান সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছিল সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের শোষণ শুধু রাজনৈতিক ছিল না। আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি- সবখানেই প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। ৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের জন্যই পুলিশের আঘাতে আহত হয়ে জেলে গেলেন। অন্তত ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত তার জেলে-জেলেই জীবন কেটেছে। তার বড় ছেলে কামালও তাকে চিনতে পারেনি। ঘরের ভাত কদিন খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল? ডিএল রায় লিখেছিলেন- “সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি” রবীন্দ্রনাথ, নজরুল দেশ বন্দনায় অজস গান লিখেছিলেন- চিত্তরঞ্জন দাস, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু- এদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করতে গিয়ে এই মানুষটি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তার মূল্যায়ন আমরা করিনি।
আমাদের শ্রদ্ধেয় মনীষী ড. মোহাম্মদ এনামুল হক তাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলেছিলেন। আজ বিবিসির জরিপেও এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাজনীতিতে ভুল হতেই পারে, তার সমালোচনাও হতে পারে; কিন্তু তিনি যে মনে প্রাণে গণতান্ত্রিক ছিলেন তা ছিল চরম সত্য। তিনি গণতান্ত্রিক ছিলেন বলেই সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারতেন। আমি আশা করি, সম্পূর্ণ দলীয় রাজনীতি থেকে তাকে বের করে আনা উচিত। তিনি বাংলার, তিনি বাঙালির। তিনি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বলেছিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার স্বাধীনতার স্বপ্নও শেষ হয়নি। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই আমরা পেয়েছি। মুক্তি সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।
আজ ১৫ আগস্ট। আমাদের শোকের দিন, দুঃখের দিন। এই দিনে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি।
