কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য চাই

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৪, ১৯:২১
সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সদ্য সমাপ্ত ২০১৪ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরলয়ে গতিশীল হয়েছে। মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল স্থিতিশীল, বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি ছিল নিয়ন্ত্রণে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। কৃষিখাতের উত্পাদন ভালো হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলোও বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রেটিং করেছে। তবে শিল্প খাতের অবদান আরও ভালো হওয়া প্রয়োজন ছিল। অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তা ভালো হয়। সেবাখাত কিছুটা ভালো করলেও গতবছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এ খাতটি যে ক্ষতির শিকার হয়েছে তা সামাল দিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে এবং কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা খুবই দরকার। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি ও সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। কারণ গত অর্থবছরে উদ্যোক্তারা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শিকার হওয়ায় গোটা অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে মার খেয়েছে। নতুন বিনিয়োগে উত্সাহ হারিয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। সরকারি বিনিয়োগ বাড়া সত্ত্বেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এক্ষেত্রে ‘ধীরে চল’ নীতি গ্রহণ করেন। ২০১৪ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে আসার প্রাক্কলন করেছে বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)। যা এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং অর্থবছরের ছয় মাসে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রয়োজন। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর হলে একদিকে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়বে। অন্যদিকে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। নিম্নে অর্থনীতি নিয়ে এমসিসিআইয়ের খাতভিত্তিক আলোচনা তুলে ধরা হলো। কৃষি: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও ২০১৪ অর্থবছরে দেশের কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। যা ২০১৩ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ফসল উত্পাদন এবং মত্স্য খাতে ভালো প্রবৃদ্ধির কারণেই কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এখনও বাংলাদেশের সাড়ে ৪৭ ভাগ শ্রম শক্তি কৃষিখাতে কাজ করে। শিল্প: বিবিএস’র তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ অর্থবছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিদ্যুত্ ও গ্যাসের অভাব, রাজনৈতিক সংকট, গার্মেন্টেস শ্রমিক অসন্তোষ, অপর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প স্থাপনে জমির অভাবে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি ২০১৪ অর্থবছরে হয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ। ছোট ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদানেও বড় রকমের ছেদ পড়েছে। নির্মাণ, বিদ্যুত্ এবং সেবাখাত: ২০১৪ অর্থবছরে নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যা ২০১৩ অর্থবছরে ছিল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। গেল প্রান্তিকে রিয়াল এস্টেট, ভাড়া এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। যা ২০১৩ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে গেল প্রান্তিকে বিদ্যুত্ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে অনেক। এদিকে ২০১৪ অর্থবছরে সেবাখাতের অবদান আগের বছরের তুলনায় ভালো। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও সেবাখাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। যা আগের বছরে ছিল ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। মুদ্রা ও পুঁজিবাজার: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈদিশিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ায় দেশে ঋণের প্রবাহ কমেছে। মে মাস শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। যা গতবছরের একই সময়ে ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। এদিকে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং সেক্টরে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। যা ২০১৩ সালের জুনশেষে ছিল ৭৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ অর্থবছরের ৬ মাসে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিল্পখাতে টার্ম লোন বিতরণ কমে গেছে। এর পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলেও তা এখনও অনেক কম। এদিকে ২০১৪ অর্থবছরে পুঁজিবাজারেও নিম্নমুখী ধারা বিরাজমান। নির্বাচনমুখী অর্থনীতিতে নানা ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায় লেনদেন তলানিতে নেমে আসে। ২০১৩ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ অনেক কমে যায়। সরকারি আয় ব্যয়: ২০১৪ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আদায় করেছে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। যা সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৩ ভাগ। সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ার পেছনে এনবিআর দায়ী করছে রফতানি আয়ে উেস কর হার হ্রাস, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকোচন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে যাওয়াকে। সরকার ২০১৪ অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৯৫ ভাগ বাস্তবায়ন করেছে। বহিঃখাত: গেলো জুনে রফতানি আয় হয়েছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। যা আগের তুলনায় সাড়ে ৩ শতাংশ বেশি। তবে রফতানির মাসিক রফতানি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ কম। এর একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। তবে ২০১৪ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে রফতানি আয় আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জুলাই-মে সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। রমজান মাসকে কেন্দ্র করে খাদ্যশস্য এবং ভোগ্যপণের আমদানি বাড়ার সাথে সাথে মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। তবে এ সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। কারণ এই সময়ে রফতানি আয় তুলনামূলক বেড়েছে। এদিকে ২০১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় কমেছে। বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তি ১৫ ভাগ বেড়েছে। তবে কমেছে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ। অর্থনীতিতে পূর্ণ গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের চ্যালেঞ্জ হলো- বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি সীমার মধ্যে রাখা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।