বিজয় চন্দ্র। অজপাড়াগাঁয়ের একজন কাঠমিস্ত্রি। দিন আনেন, দিন খান। চাইলেই হয়তো আরেকটু বাড়তি উপার্জন করতে পারেন। কিন্তু সেদিকে একবারের জন্যও তার মন যায় না। কীভাবে যাবে? তার মন-প্রাণজুড়ে আছে যে কেবল কবিতা আর গান লেখার নেশা! এই নেশাকে তিনি না পারেন ছাড়তে, না চান ছাড়তে। লেখালেখির জন্য উন্মাতাল এই তরুণকে নিয়ে লিখেছেন ইকবাল খন্দকার
বিজয় চন্দ্রের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার নাপিতের চর গ্রামে। ঠিক কত সালে তিনি জন্মেছিলেন, তার জানা নেই। তবে ধারণা করেন ১৯৮৩ সালের দিকে হবে হয়তো। বিজয়ের হতদরিদ্র বাবা মনোরঞ্জন বিশ্বাসের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। সেই ইচ্ছেকে বুকে ধরে বিজয়কে তিনি ভর্তি করিয়েছিলেন ২৭ নং নাপিতের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু ইচ্ছে অপূর্ণই থেকে যায়। বিজয়ের বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখন তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান ওপাড়ে। বিজয় প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন হাইস্কুলে। কিন্তু যার বাবা নেই তার পড়াশোনার খরচ যোগাবে কে? একদিকে বাবার অভাব, অন্যদিকে সংসারের অভাব। ৩ ছেলে আর ২ মেয়েকে নিয়ে মা সুশীলা বালা তখন অভাবের চাকায় পিষ্ট হয়ে চলেছেন প্রতি মুহূর্তে। বিজয় মাত্র কয়েকটা দিন হাইস্কুলে ক্লাস করার সুযোগ পান। তারপর স্কুল আর পড়াশোনার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় তাকে। মায়ের হাতে সামান্য পয়সা তুলে দেওয়ার আশায় তিনি যোগ দেন কাঠমিস্ত্রির পেশায়। বিজয় চন্দ্রের বয়স তখন ১৫ কি ১৬। সে সময় একটা মেয়েকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। মেয়েটিকে তিনি ডাকতেন ‘বান্ধবী’ বলে। ‘বান্ধবী’ও তাকে ভালোবাসত। হঠাত্ করেই বান্ধবী সব সম্পর্ক ছিন্ন করে পাড়ি জমায় ভারতে। মনের চাপা বেদনাকে একটু হলেও প্রকাশ করতে বিজয় হাতে কলম তুলে নেন। তিনি লিখে ফেলেন ‘নিষ্ঠুর ভারতী’ নামে একটি কবিতা। সেই শুরু। এ পর্যন্ত বিজয়ের লেখা কবিতার সংখ্যা ১৯০০। আর গানের সংখ্যা ৪৮০০। মজার ব্যাপার হলো, বান্ধবীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর বিজয় তার নিজের নামের সঙ্গে ‘বান্ধবী’ নামটি জুড়ে নেন। অর্থাত্ বিজয় চন্দ্র বান্ধবী। এখন এলাকার মানুষ তাকে আর বিজয় চন্দ্র নামে ডাকে না। ডাকে বান্ধবী বলে। বিজয় প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি করে গান লিখেন। তিনি আশা করছেন খুব শিগগিরই তার গানের সংখ্যা ৫০০০ ছাড়াবে। তবে তার দুঃখ, আজ পর্যন্ত কেউ তার গান কিংবা কবিতা প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। অনেকে অনেক আশা দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেই আশা রূপ নিয়েছে হতাশায়। তবু বিজয় আশা ছাড়েন না। রুটিন মোতাবেক প্রতিদিন তিনটি করে গান লিখে যান। তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন তার কবিতাগুলো জাতীয় পত্রিকার পাতায় পাতায় শোভা পাবে। তার গানগুলো ধ্বনিত হবে দেশের নামজাদা শিল্পীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। আমরাও চাই বিজয়ের স্বপ্ন পূরণ হোক। হতাশা আর দুর্গম পথকে জয় করে বিজয় এগিয়ে যাক তার চূড়ান্ত লক্ষে। বিজয়ের জন্য অনেক শুভ কামনা।
বিজয় চন্দ্র
নাম :বিজয় চন্দ্র
ডাকনাম :বান্ধবী
বাবা :স্বর্গীয় মনোরঞ্জন বিশ্বাস
মা :সুশীলা বালা
গ্রাম :নাপিতের চর
ডাকঘর :নলবাইদ
উপজেলা :কুলিয়ারচর
জেলা :কিশোরগঞ্জ
ভাইবোন :৩ ভাই, ২ বোন।
