রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাবুলিওয়ালা গল্পে বলেছেন, ‘আমার পাঁচ বছরের মেয়ে মিনি একদণ্ড কথা না বলিয়া থাকিতে পারে না।’ এটি মানব জাতির সহজাত প্রবৃত্তি— শব্দের পর শব্দ মিলিয়ে মানব শিশু যখন কথা বলতে শুরু করে তা শুনতে কার না ভালো লাগে ? শিশুদের কথা নিয়ে কোনো জটিলতা হয় না, জটিলতা যত হয় প্রাপ্তবয়স্কদের কথায়। হয়তো কথা বলতে গিয়ে বক্তা খুব মজা পাচ্ছে, অথচ শ্রোতা তেমন মজা পাচ্ছে না। তাই কথা বলার সময় শ্রোতার বিষয়টি বক্তাকে মাথায় রাখতে হবে। অনেক সময় বকবক করে অনেক কথা বললেও কাজের কথাটি বলা হয় না। গোপন কিছুই পছন্দ নয় সাংবাদিকদের। সাংবাদিকদেরকেই বুঝি উত্সাহ জোগাতে কবিগুরু বলেছেন— গোপন কথাটি রবে না গোপনে। তবে অনেকেই অনেকের সঙ্গে কথা বলে না, এমনকি তাদের মুখে হাসিও ফুটে ওঠে না। তাই তো ছড়ার ভাষায় শুনি— রামগরুরের ছানা হাসতে তাদের মানা।
একটা সময় ছিল যখন অনেকেই অনেকের সঙ্গে কথা বলতো না। কথোপকথনে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ছিল। সুয়োরানীর সঙ্গে ঘুটেকুড়ানির কথা হয়েছে একথা কেউ বলতে পারবে না। এখন তো গণতন্ত্রের যুগ। নেতা বস্তিবাসীর জীর্ণ লোকদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললেই ব্যালটে-ব্যালটে ভোট-বাক্স ভরে যায়। তাছাড়া এখন কথার যুগ, এখন পয়সা ব্যয় করে সারারাত মানুষ কথা বলে। কিন্তু মজলিসে বসে অনেকেই কথা-বিষের যাতনায় অস্থির হয়ে ওঠে। কথার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে কেউবা বলে ওঠে— এত কথার পর আর এখানে থাকা যায় না। অনেকেই আরেকজনের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েও নিজের লেখার কথায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। শুধু কথায় চিড়া না ভিজলে অনেকেই আবার সন্তোষ্ট হতে পারে না। অল্প বয়সী মেয়ের মুখে অনেক কথাই মা-বাবা শুনতে পছন্দ করেন না। তাই তো বলতে শোনা যায়— এইটুকু মেয়ের মুখে কেমন কথা ফুটেছে দেখো! কথায় অনেক সময় শারীরিক শক্তির জোগানও হয় বৈকি। তাই তো কথায় কথায় অনেকে বহুদূর চলে যায়। কথায় কথায় মান-অভিমান হয় নতুন দম্পতির।
সারাদিন ঘুমিয়ে মাঝরাতে টিভি টক-শোতে অফুরন্ত কথা বলার শক্তি রাখেন আমাদের রাজনৈতিক কুশীলবগণ। এদের অনেকেরই কথা কারো কারো ঘুম হরণ করে নেয়। ঠান্ডা মাথার অনেকেই এসব কথাকে কথার কথা ভেবে স্বস্তি পায়। দেশের সুধীজনরা কাজের কথা বললেও রাজনীতিবিদরা অনেক সময় তাদের কথার ধার ধারে না। অনেক সময় কারো কূটকৌশলপূর্ণ বাক্যজাল সত্যিই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে না। নাকে মুখে কথা বললে শ্রোতা সেটি অনেক সময় ভালো করে বুঝতেও পারে না। অনেক সময় সত্যি কথা কঠোর হয়। এক কথার মানুষদের নিয়ে সমাজ-সংসারে অনেক কষ্ট বিরাজ করে। অনেক কথা না বলাই ভালো, কথা বলে ফেলেই অনেকে বিপদে পড়ে। কেননা অনেক বেফাঁস কথা নিজের বিরুদ্ধে চলে যায়। তাই তো সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে যারা জটিলতা পছন্দ করে না তারা অনেকেই সাধা-সিধে কথা বলতে, লিখতে ও পড়তে ভালোবাসে। কেননা কথা অনেক সময়ই মানুষকে কষ্ট দেয়। কথায় মন ভেঙে কাচের মতো টুকরো-টুকরো হয়ে গেলে সেটি আর জোড়া লাগে না। কথায় সম্পর্ক নষ্ট হয়। অনেক ভদ্রলোকই চিবিয়ে চিবিয়ে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে প্রাণবন্ত বাক্যালাপে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকাংশই কথা বলে চেঁচিয়ে। কিন্তু আস্তেই বলেন আর জোরেই বলেন সব কথা কি বলা যায় ?
শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে, তাঁকে দিয়েই শেষ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন,
‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে।
ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা,
কেবল বলে গেলাম বাঁশির কানে কানে\
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
