চলনবিলের একটি অনুন্নত গ্রামের নাম পলাশপুর। প্রতিবছর বর্ষার পানিতে তলিয়ে যায় গ্রামটি। ফলে পুরো বর্ষা মৌসুমে সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়। তবে চিরায়ত এই নিয়মের বিরুদ্ধে একাই লড়াই শুরু করেন স্থানীয় শিখন স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোঃ সাইফুজ্জামান মিলন। প্রকৃতির বাধাকে জয় করে তিনি হাসি ফুটিয়েছেন কোমলমতি শিশুদের মুখে। বর্ষাকালে এখন আর তাদের ঘরে বসে থাকতে হয় না বরং মিলনের নৌকায় করে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে। বিনোদনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হূদয়ে পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার আলো।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন খানমরিচ ইউনিয়নের এই গ্রামটিতে ২০১৪ সাল থেকে চালু হয় শিখন স্কুলের কার্যক্রম। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় সেভ দ্য চিলড্রেন এর ব্যবস্থাপনায় এবং ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টারের সহযোগিতায় শুরু হয় শিখন স্কুলটি। বর্ষাকাল বাদে বাকী সময়টাতে ছেলে-মেয়েরা আনন্দ নিয়ে স্কুলে আসলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় এ সময়টাতে। কখনো কখনো উপস্থিতি শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোঃ সাইফুজ্জামান মিলনকে। শিক্ষার্থীদের দরিদ্র বাবা-মায়ের আর্থিক দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে তাদের স্কুলে যাওয়ার উপায় হিসাবে তিনি চার হাজার টাকায় কিনে ফেলেন একটি নৌকা। অভিভাবকদের ডেকে জানিয়ে দেন পরিকল্পনার কথা। মিলনের কেনা নৌকা দেখে সানন্দে ছেলে-মেয়েদের তুলে দেন মিলনের হাতে। শুরু হয় তার নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি গিয়ে নৌকায় তুলে নেন আবার স্কুল ছুটির পর পৌঁছে দেন যার যার বাড়িতে।
নিজের ব্যতিক্রমধর্মী কাজ সম্পর্কে মিলন জানান, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করার তাগিদ থেকে বিএ পাস করেও কোন চাকরি করতে চাননি তিনি। তার স্বপ্ন গ্রামের এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা পড়ালেখা শিখে স্বনির্ভর হয়ে দরিদ্র বাবা-মায়ের পাশে থাকবে।
জানা গেছে, পলাশপুরের মতোই চলনবিল অঞ্চলের অনেক গ্রামে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা লেখাপড়া শিখছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে সেভ দ্য চিলড্রেন এর ব্যবস্থাপনায় ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার কর্তৃক চলনবিল অঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে শিখন স্কুলের কার্যক্রম। চাটমোহর উপজেলায় ১৩৩টি, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ২১ এবং তাড়াশ উপজেলায় ৪টি স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। এ সকল স্কুলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ হাজার ৫৬ জন। শিখন কর্মসূচির মাঠ সমন্বয়কারী শেখ আরিফ হোসেন জানান, শিখন (কেন্দ্র) বিদ্যালয়ের কোন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার কোন সুযোগ নেই। কোন বাধাই শিখন কর্মীদের দমিয়ে রাখতে পারে না। শিখন কর্মীদের সঠিক গাইড লাইন দিয়ে ও সার্বক্ষণিক তদারকির মাধ্যমে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর বাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে এবং প্রতিমাসে মাসিক সভার মাধ্যমে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
