পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট বয়া নেই নৌযানগুলোতে

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৭
শুধু লাইফ জ্যাকেট থাকলে নৌ দুর্ঘটনায় ৯০ ভাগ যাত্রী বেঁচে যাবে। ১০ ভাগ মারা গেলেও তাদের লাশ ভেসে উঠবে। পর্যাপ্ত বয়াও থাকতে হবে নৌযানে। সমপ্রতি ডুবে যাওয়া এমএল পিনাক-৬ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া অনুসন্ধানকারী দলের সদস্যরা এই তথ্য জানান। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে, সব নৌযানে যাত্রীদের সমান সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট থাকতে হয়। একজন যাত্রীও লাইফ জ্যাকেট না পড়লে সেই নৌযান ছাড়া হয় না। এছাড়া ফিটনেস ও মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী লঞ্চে রয়েছে কিনা তা কঠোরভাবে তদারকি করা উচিত কর্তৃপক্ষের। অথচ বাংলাদেশের নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও বয়া নেই। কর্তৃপক্ষ এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে। তারা অভিযোগ করেন, পিনাকের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল যাত্রী অনুযায়ী লাইফ জ্যাকেট রয়েছে কিনা, যাত্রীরা লাইফ জ্যাকেট পরেছে কিনা এবং লঞ্চটির ফিটেনস পরীক্ষা করা ও ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী নিয়েছে কিনা পরীক্ষা করা। তারপর ঘাট থেকে লঞ্চটি ছাড়ার অনুমতি দিলে নৌ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। ৪ আগস্ট পদ্মা নদীতে এমএল পিনাক-৬ আড়াইশ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী লাশ উদ্ধার হয়েছে ৪৮টি। নিখোঁজ রয়েছে ৬১ জন যাত্রী। ৭দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে উদ্ধারকারী দল লঞ্চটির সন্ধান পায়নি। অষ্টম দিন উদ্ধার অভিযান প্রশাসন পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এ লঞ্চ অনুসন্ধানে নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সাইড স্ক্যান সোনার ও সাববটম প্রোফাইলার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধানকারী দলে বিদেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও ছিলেন। পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবে যাওয়া ও খুঁজে না পাওয়ার বিষয়ে কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, যাত্রীদের তুলনায় লঞ্চটিতে লাইফ জ্যাকেট ও বয়া ছিল সীমিত। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, লঞ্চে কোন লাইফ জ্যাকেটই ছিল না। ৮৫টি জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন লঞ্চটিতে তিনগুণ বেশি যাত্রী উঠানো হয়। ফিটনেসও ছিল না লঞ্চের। কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে লঞ্চটি চলাচল করতো। এ লঞ্চটি দেশিও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নৌ পথে চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য। পিনাক লঞ্চটি মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাট ছাড়ার অনুমতি প্রদান করায় কর্তৃপক্ষও এ লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে উদ্ধারকারী দলের একজন কর্মকর্তা বলেন। অনুসন্ধানকারী দলের কয়েকজন সদস্য বলেন, লঞ্চের চালক ও অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রথমেই লাইফ জ্যাকেট পড়ে যাত্রীদের লঞ্চে উঠানোর নিয়ম। কিন্তু লঞ্চ মালিকরা এগুলো মানেন না। একটি লাইফ জ্যাকেটের মূল্য চারশ থেকে পাঁচশ টাকা। ১০-১২ বছর পর্যন্ত ওই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা যায়। অনুসসন্ধানকারী দলের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীরা নিরাপদে চলাচলে নিজেরাই সঙ্গে একটি লাইফ জ্যাকেট রাখতে পারেন। ভালো মানের একটি লাইফ জ্যাকেটের মূল্য ১০০০ টাকা। এটি খুব সহজেই বহন করা যায়। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ভাড়া হিসেবেও লঞ্চে লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ করতে পারে। বিশ্বে নৌপথে চলাচলে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। নৌ দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য নিয়মনীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় সব দেশে। শুধু এই দেশে তা করা হয়নি। বিধায় নৌ পথে দূর্ঘটনা একের পর এক ঘটেই যাচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে সর্বশেষ পিনাক লঞ্চ পর্যন্ত ৩৬টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছে প্রায় চার হাজার যাত্রী। পদ্মা, মেঘনা ও চাঁদপুর মোহনায় এ সব দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট চাদপুর লঞ্চ টার্মিনালের অদূরে মেঘনার মোহনায় দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে এমভি দিনার লঞ্চ ডুবে যায়। এর হদিস মেলেনি। ২০০৩ সালের ৯ জুলাই একই স্থানে ৮০০ যাত্রী নিয়ে এমভি নাসরিন লঞ্চটি ডুবে যায়। এরও কোনো সন্ধান মেলেনি। নৌ দূর্ঘটনার পর বিআইডব্লিউটিএ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্পরতা কিছুদিন বেড়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো তত্পরতা থাকে না। মালিকরা এ সুযোগে নিয়ম কানুন উপেক্ষা করে লঞ্চ চালাচ্ছে। আর কত লাশ হলে নিয়ম কানুন মানতে বাধ্য করা হবে এ দাবি স্বজনহারা পরিবারগুলোর। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামসুজ্জোহা বলেন, লাইফ জ্যাকেট প্রতিটি যাত্রীর পরা নিশ্চিত ও ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী না নিলে এবং ফিটনেস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে লঞ্চ ছাড়ার অনুমতি মিলবে। এ নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ব্যর্থ হলে চাকরি হারাতে হবে।