জীবন ও পরাবাস্তবতা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২০:১১
জুয়েল আইচ। যিনি নিমিষেই নিজের মন্ত্রবলে আর অসাধারণ উপস্থাপন ও বাচন ভঙ্গিতে মোহিত করে রাখেন হাজার হাজার দর্শককে। জাদু আর বাস্তবতার এই মোহনীয় জগত্ নিয়ে যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হলো ভৌতিকতা বা পরাবাস্ততার রকমফের তার জীবনে কেমন। তখন তিনি শোনালেন নিজের জীবন থেকে নেয়া কিছু ঘটনাক্রম। তার কথায়, ‘এগুলোই আমার কাছে এক-একটি পরম পরাবাস্তবতার জগত্। দারিদ্র্য, অসহায়ত্বের চেয়ে বড় ভৌতিকতা আর কী হতে পারে। লিখেছেন দিব্যজ্যোতি দত্ত বেড়ে ওঠার গল্প বাংলাদেশের নন্দিত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দুনিয়া জুড়ে তার খ্যাতি। জাদুর কারিশমা দেখিয়ে মানুষকে অবাক করার জুড়ি নেই দেশবরেণ্য এই জাদুশিল্পীর। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, বর্তমান নেছারাবাদে জন্ম নেওয়া জুয়েল আইচ শৈশবে ভাবেননি যে জাদুশিল্পী হবেন। ভালোবাসতেন বাঁশি বাজাতে। জাদু শেখার অনেক আগে থেকেই তিনি বাঁশি বাজাতেন। সেসময় নির্মল রায় ও নিতাই নামে তাদের গ্রামে দুজন অসাধারণ বংশীবাদক ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই শিখে ফেলেন বাঁশি বাজানো। গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন পিরোজপুর থেকে। জাদুর শুরু সেসময় গ্রাম-গঞ্জে সার্কাসের মেলা বসতো। সার্কাসে নাচ-গানের পাশাপাশি জাদুও দেখানো হতো। একদিন সার্কাসে জাদু দেখে ভালোবেসে ফেলেন জাদুকে। এরপর থেকে চলে জাদু সাধনা। ক্লাসে, বাসায়, বন্ধুদের আড্ডায় জাদু দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দিতেন জুয়েল আইচ। বাঁশি দিয়েও জাদু দেখাতেন তিনি। এভাবেই বংশীবাদক জুয়েল আইচ হয়ে উঠলেন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ! ভালোবাসা জুয়েল আইচের স্ত্রী বিপাশা আইচ। বিপাশার সঙ্গে যখন তার পরিচয় হয় তখন বিপাশা উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। বিপাশার বাবা ছিলেন জুয়েল আইচের কলেজের শিক্ষক। কিন্তু বিপাশার বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের সূত্রেই তাদের বাড়ি যেতেন জুয়েল আইচ। বিপাশার বাড়ির সবাই জুয়েল আইচকে বেশ পছন্দ করতেন। ফুলার রোডের সেই বাসায় প্রায় প্রতিদিনই বিপাশার বাবার সাথে বসতো আড্ডার আসর। ধীরে ধীরে বিপাশার সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে জুয়েল আইচের। নানা বিষয় নিয়ে কথা হতো তাদের মধ্যে । বিপাশাকে ঠাঁই দিয়ে ফেলেন মনের মাঝে। একদিন সাহস করেই জানিয়ে দেন মনের কথা। বিপাশাও সাত-পাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে যান! প্রায় এক যুগের পরিচয়ের পর ১৯৮৪ সালে প্রেম। আর এক বছর প্রেমের পরেই ১৯৮৫ সালে বিয়ে। প্রতিদিনের জীবন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের দৈনন্দিন জীবনও জুড়ে আছে জাদু। বাসার একটি কক্ষ জুড়ে রয়েছে তার জাদুর সরঞ্জামাদি। স্ত্রী বিপাশাই এর দেখভাল করেন। ঘরেও মাঝে মাঝে জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন স্ত্রী বিপাশা ও মেয়েকে। অবসরে মেয়েকে উপহার দেন জাদুর ফুল। সময় কাটান মেয়ের সাথে। দেশে থাকলে কিছুটা রুটিন মেনে চলতে চেষ্টা করেন তিনি। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতেও যান রাত ১০টার মধ্যে। রুটিন মেনে সকালে করেন শরীরচর্চা। পোশাকের বিশাল সংগ্রহ থেকে পছন্দের পোশাক পরেন তিনি। মাঝে মাঝে নাশতাও তৈরি করেন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী হলেও এখনো জুয়েল আইচ ভোলেননি প্রিয় বাঁশিকে। সময় পেলেই বাঁশিতে তোলেন মোহনীয় সুর। জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ জুয়েল আইচ মিডিয়ায় প্রথম জাদু প্রদর্শন করেন ১৯৭১ সালে। মঞ্চে প্রথম জাদু প্রদর্শন করেন ১৯৭২ সালে। দেশের বাইরে শো জুয়েল আইচের প্রথম শো ৪ঠা জুলাই, ১৯৮৪, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পাওয়ার প্লাজায়। এর পর শো করেছেন দুনিয়া জুড়ে। শো করেছেন কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ অনেক দেশে। মুক্তিযোদ্ধা জুয়েল আইচ বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় জুয়েল আইচও ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জুয়েল আইচ ৯ নম্বর সেক্টরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। তিনি একুশে পদক, সিজেএফবির আজীবন সম্মাননাসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। অন্যজগতের জুয়েল আইচ জাদুশিল্পী, বঁংশীবাদকের পর উপস্থাপক হিসেবেও নিজের নাম জুড়েছেন জুয়েল আইচ। উপস্থাপনা করেছেন মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, জীবনযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানে। এছাড়াও কাজ করেছেন বিজ্ঞাপনে। বিখ্যাত জাদু জুয়েল আইচের বিখ্যাত জাদু সমূহের মধ্যে রয়েছে কাগজ থেকে ডলার বানানো, চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো, কাটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া লাগানো ইত্যাদি। মানুষের জন্য জুয়েল আইচ মানুষের কল্যাণের জন্যও কাজ করেছেন দেশবরেণ্য এই জাদুশিল্পী। বাল্যবিবাহ রোধে এবং শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন ইউনিসেফের হয়ে। মৌসুমী ও সাকিব আল হাসানের সাথে হয়েছেন ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত। দর্শকদের জাদু দেখিয়ে আনন্দ দেন জুয়েল আইচ। মানুষ তার জাদু দেখে খুশি হয়, আনন্দিত হয়, অনেকে সমালোচনাও করে। কিন্তু নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়েই তিনি মানুষকে জাদু দেখান। করেন কঠোর পরিশ্রম। সকল বাঁধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি করেছেন তার জাদুর চর্চা, এখনো করছেন। জুয়েল আইচ জাদুর অন্য নাম। জুয়েল আইচ মানুষের আনন্দের নাম। এবারে দেশবরেণ্য জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের বয়ানেই শুনি সেই পরাবাস্তবতার কিছু অনুগল্প! দারিদ্র্য ও আমার আরেক পরাবাস্তবতা আমি তখন বংশালে থাকি। হঠা? বিদেশে যাওয়ার জন্য আমার একটি ব্যাগের খুব দরকার হয়। আমার এক তরুণ ভক্ত আমাকে তার লেদার কারখানায় নিয়ে যায়। সেখানে কাজ করে বেশ কিছু শ্রমজীবী শিশু। একটি ছেলে উঠে এলো আমার কাছে। ওর নাম আনোয়ার। ওখানে অনেকেই আমাকে চিনত। কিন্তু আনোয়ার চিনত কিনা তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমার পছন্দ দেশে তৈরি জিনিস। তাই ভাবলাম, ব্যাগটি এখান থেকেই বানিয়ে নেব। ব্যাগটির ডিজাইন আমি আনোয়ারকে বুঝিয়ে দিলাম। কয়েকদিন পর আমি সেখানে গিয়ে দেখি আনোয়ার নেই। দুদিন পরে আমার ফ্লাইট। এ সময় আনোয়ার নেই! তখন কারখানার এক চাচা এসে বলল, আপনার জিনিস তৈরি হয়ে গেছে। এই বলে ওপরের একটি তাক থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো একটি ব্যাগ বের করে। ব্যাগটি এত সুন্দর হয়েছে! আমি ঠিক যেমন বলেছিলাম তেমন হয়েছে! আমি অবাক। এটা যে এতটুকুন বাচ্চা একটা ছেলে বানিয়েছে, বিশ্বাস হচ্ছিল না। চাচার কাছে জানতে পারলাম কাজটি পাবার পরপরই ও তার মায়ের অসুখের খবর পায়। তাই সারারাত জেগে ব্যাগটি বানিয়ে রেখে তবেই বাড়ি যায়। তারপর আনোয়ারের আর কোনো খবর নেই। চাচা আমার হাতে আনোয়ারের লেখা একটা চিঠিও ধরিয়ে দেয়। অতি কাঁচা হাতের লেখা। সে যে বেশি দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি তা বোঝা যায়। কিন্তু ওর মেধা প্রকাশ পায় ওর ব্যাগটি বানানোয়। অবাক হয়ে ভাবলাম, অভাব-অনটনের ভেতর খেয়ে না খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগে যে ছেলেটি বেড়ে উঠেছে সে কেমন করে এমন মেধাবী হয়! আমি তার চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম। চিঠিটা এমন, ‘এলাাহি ভরসা ভাইজান, এই দুনিয়াতে আল্লাহ আর মা ছাড়া আমার কেউ নেই। সেই মা খুব অসুস্থ। তাই আমাকে কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হচ্ছে। সব কাজ ফেলে আপনার কাজটা করে দিয়ে যাচ্ছি। আপনার সাথে দেখা হলো না। আপনি দোয়া করবেন আমার মা যেন বেঁচে থাকে। কারণ, মা যদি চলে যায় তাহলে এ দুনিয়ায় আমার আর কেউ থাকবে না। আমি আর ঢাকায় আসব না।’ এতটুকু পড়েই আমার চোখ ছলছল করে ওঠে। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সে আর ফিরে আসেনি, মানে তার মা আর বেঁচে নেই! চিঠির পরের কথাগুলো আরও কষ্টের। ‘আমি খুব দুঃখী ছেলে। আপনাকে আমার খুব পছন্দ। জীবনে কখনো আপনাকে দেখতে পাব তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আল্লাহ ভাগ্যের জোরে আপনার সাথে দেখা করিয়েছে। এ সুখটা আমি সারাজীবন রাখতে চাই। আমি এ ব্যাগটা তৈরি করে যে আনন্দ পেয়েছি, কোনো টাকা দিয়ে আমার আনন্দ কেড়ে নিবেন না। —আপনারই আনোয়ার’ এরপরও কতবার যে আনোয়ারের খোঁজে সেখানে গিয়েছি, কতবার তার মহত্ত্ব নিয়ে ভেবেছি কিন্তু আনোয়ারকে আজও খুঁজে পাইনি! টাকা তো নয়ই, একটি ধন্যবাদও দেওয়া হয়নি ওকে!