চলতি মূলধন ঋণের পরিমাণ বাড়ায় সামগ্রিকভাবে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। তবে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছে না। বাড়ছে না নতুন শিল্পে ঋণ বিতরণও। যে কারণে বিদায়ী অর্থ বছরে মেয়াদী ঋণ বিতরণ কমেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো আস্থা না ফেরায় নতুন শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে না বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে সবচে বেশি ভূমিকা রাখে মেয়াদী শিল্পঋণ। দেশে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গত অর্থ বছরে (জুলাই-জুন) ৪২ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। যা এর আগের অর্থ বছরের একই সময়ে ছিলো ৪২ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মেয়াদী শিল্পঋণ বিতরণ শূন্য দশমিক ৫১ শতাংশ কমেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মেয়াদী শিল্প খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সবচে কম। আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মেয়াদী খাতে ঋণ বিতরণ করেছে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। যা আগের অর্থ বছরের একই সময়ে ছিল ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। এতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের মেয়াদী ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ৭৬ শতাংশ। মেয়াদী শিল্পের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট শিল্পঋণ বিতরণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এসব ব্যাংকে শিল্পঋণ বিতরণ আগের অর্থ বছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ কমেছে।
এদিকে বিদায়ী অর্থ বছর শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প খাতে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। যা এর আগের অর্থ বছরে ছিলো ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে অর্থ বছর শেষে প্রায় ১৬ শতাংশ ঋণ বিতরণ বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাছুম পাটোয়ারী ইত্তেফাককে বলেন, বিগত অর্থ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নতুন সরকারের প্রথম বছরের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উদ্যোক্তাদের মাঝে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। তবে পুরোপুরি অনিশ্চয়তা না কাটায় নতুন শিল্প স্থাপনে মেয়াদী ঋণ বিতরণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, দেশের চলমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প খাতকে চাহিদা মাফিক ঋণের জোগান দিতে পেরেছে। এতে ঋণ বিতরণে বেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থ বছর শেষে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। যা আগের অর্থ বছর শেষে ছিল ১৫ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে চলতি অর্থ বছর শেষে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ দুই শতাংশ কমেছে। একইসঙ্গে বেড়েছে শিল্প খাতে ঋণ আদায়ের পরিমাণও। বিদায়ী অর্থ বছর শেষে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। যা আগের অর্থ বছর শেষে ছিল এক লাখ ২২ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে অর্থ বছরের ব্যবধানে শিল্পঋণ আদায় বেড়েছে ২৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে বকেয়া ঋণ স্থিতির পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে মোট শিল্প ঋণের বকেয়া স্থিতির পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যা আগের অর্থ বছরের একই সময়ে ছিল এক লাখ ৭৯ হাজার ২০৪ কোটি ১২ লাখ টাকা। সে হিসেবে ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
