শেষ শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি ভেজা সিলেট-তামাবিল সড়কের আঁকা-বাঁকা সড়ক পেরিয়ে জৈন্তা উপজেলায় পৌঁছার আগেই হাতছানি দেয় আকাশে হেলান দেয়া বিশাল খাসিয়া পাহাড়। কয়েক হাজার ফুট উঁচু থেকে সেই পাহাড়ের গা বেয়ে অবিরাম নামছে ঝরনা ধারা। সবুজ পাহাড়ের গায়ে একাধিক সফেদ ঝরনা ধারার দৃশ্য মোহনীয়। যেন স্বর্গীয় রূপ। নয়ন কাড়া এমন দৃশ্য পর্যটকদের বিস্মিত করে। প্রকৃতি কন্যা জাফলং ও পাহাড়ী নদী পিয়াইন এই পাহাড় আর ঝরনার পদতলেই রূপ লাবণ্য নিরন্তর ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু পর্যটকরা যতই কাছে যান ততই অবাক বিস্ময়ে তাকান সড়কটির বেহাল অবস্থার দিকে। ভাঙ্গাচুড়া সড়কটি যেন দাঁত বের করে সুন্দরের প্রতি ব্যঙ্গ করছে। বিশেষ করে জৈন্তা-তামাবিল ১৫ কি.মি. সড়ক দিয়ে সাধারণ যানবাহন চলা দূরের কথা ট্রাককেও গর্তে আটকে থাকতে দেখা যায়।
সিলেট-তামাবিল-জাফলং ৫৭ কি.মি. সড়কটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের দেখভালের দায়িত্ব। মাস খানেক আগেও এই সড়কটি ছিল চলাচল উপযোগী। বৃষ্টির মৌসুমে সময় যত গড়াচ্ছে সড়কের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। ভাঙ্গাচুড়া বিস্তৃতি লাভ করছে। এক সময় মামার দোকানের কাছে কয়েক মিটার সড়ক ছিল ভাঙ্গা-যা ছিল পর্যটকদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তি।
মূলত:এই সড়কটি ধ্বংসের উপক্রম হয়েছে সড়কের উভয় পাশে প্রতিদিন নতুন নতুন অবৈধ ক্রাসার মেশিন বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনার ফলে। পাহাড়ী সড়কটিতে পানি আটকে সংকট বাড়ছে। এছাড়া অব্যাহতভাবে ধারণক্ষমতার বেশি পাথর ও বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে নয়নাভিরাম সড়কটি বিনাশ হচ্ছে। ‘‘পর্যটন এলাকা গোয়াইনঘাট, জাফলং, রাতারগুল, পান্থু মাই দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছে। কিন্তু রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে মানুষ চরম হতাশ।” আক্ষেপের সুরে বলেন, গোয়াইনঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হেকিম চৌধরুী, ঝালকাঠির কামরুল ইসলাম, পটুয়াখালীর আঁখি, ময়মনসিংহের ফরিদ আহমদ ও লাবণী একই সুরে বলেন, ‘‘আমাদের বহুদিন থেকে জাফলং দেখার ইচ্ছা, তা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু এখনকার রাস্তাঘাটের যা অবস্থা তাতে মনে হয় না এগুলো দেখার কোন লোক আছে।’’
‘‘সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, জাতীয় সড়কের ধারণক্ষমতা ২০ টন। কিন্তু এই সড়ক দিয়ে সব সময় ৪০-৫০ টন পাথর কয়লাসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করা হয়। ফলে সড়কটি ভেঙ্গে যাচ্ছে দ্রুত’’, মন্তব্য করে সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মীর নিজামউদ্দিন বলেন, শ্রীপুর, আলুবাগান, বিজিবি ক্যাম্প, জেলা পরিষদ রেস্ট হাউজ, তামাবিল কয়লা ডাম্পিংস্থলসহ বিভিন্ন স্থানে যেভাবে গর্ত হয়েছে তার হিসাব করলে অর্ধ কিলোমিটারেরও বেশি গর্ত হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি জমি দখল করে সড়কের উভয় পাশে পাথর স্তূপিকৃত করে রাখায় এবং পাথরে ডাস্ট জমে সড়কে বৃষ্টির পানি নিষ্কাষণ বাধাগ্রস্ত হয়। পাহাড়ী এই সড়কে বৃষ্টির পানি নিষ্কাষণের জন্য যে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে তাও দখলে চলে গেছে। এতে সড়কে পানি জমে বিটুমিনের কার্পেটিং উঠে বড় বড় গর্ত হয়েছে। এসব গর্তে অনবরত যানবাহন আটকা পড়ছে।
‘‘সিলেটের এমন প্রকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু এর কোন যত্ন নেই’’,এই মন্তব্য করেন স্কটল্যান্ড থেকে সপরিবারে আসা মোবরক আলী ও তার স্ত্রী রিনা বেগম। তারা বলেন, দেশের এই সম্পদ অযত্নে ধ্বংস হচ্ছে। প্রবাসী এই দম্পতি মনে করেন, জাফলং-এর অবকাঠামোর উন্নয়ন করলে এখানে প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসবে।
