ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সময়োচিত উদ্যোগ

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:১২
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন যাবত্ ভূমিকম্পের বিপদ সম্পর্কে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া আসিতেছেন। তাহারা সুনির্দিষ্টভাবে দুইটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। প্রথমত, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ভূমিকম্প-ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলির একটি। দ্বিতীয়ত, রাজধানী ঢাকাকেই সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলিয়া চিহ্নিত করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে যে, রিখটার স্কেলে ৭ বা ততোধিক মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর ৭০ শতাংশ ভবনই ধসিয়া পড়িতে পারে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইতে পারে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই মহানগরী। এই তালিকায় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং সিলেটের নামও রহিয়াছে। আরও আতঙ্কের বিষয় হইল, আমাদের প্রস্তুতির মারাত্মক অপ্রতুলতা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধরনের মহাবিপর্যয়ের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব যাহাদের পালন করিবার কথা, সেই সরকারি হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নূতন ও পুরাতন ভবনগুলির অবস্থা আরও শোচনীয়। ভূমিকম্পের প্রথম আঘাতেই সেইগুলি ধসিয়া পড়িতে পারে। আর জরুরি উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জামের অভাব কতোখানি প্রকট— তাহা তো সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায়ই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা জরুরিভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলিকে ভূমিকম্প-সহনশীল করিবার পাশাপাশি নূতন ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে বিল্ডিং কোড অনুসরণের তাগিদ দিয়া আসিতেছেন জোরালোভাবে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হইল, এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় ইতিমধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছে। ক্রয় করা হইয়াছে আবশ্যিক কিছু সাজ-সরঞ্জাম। পাশাপাশি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক দল গড়িয়া তোলার প্রস্তুতিও চলিতেছে দেশব্যাপী। সর্বশেষ কিন্তু সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ বিষয়টি হইল, জাপানি ‘রেট্রোফিটিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলিকে ভূমিকম্প-সহনশীল করিয়া তোলার উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় গৃহীত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, সরকারি হাসপাতাল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহূত ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনগুলিকে ভূমিকম্প-সহনশীল করা হইবে। ঝুঁকিপূর্ণ পোশাক কারখানাগুলিকেও এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হইবে পর্যায়ক্রমে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম এবং সিলেটেও সমপ্রসারিত হইবে এই কার্যক্রম। স্বস্তির বিষয় হইল, বিদ্যমান কাঠামো অক্ষত রাখিয়াই সংস্কার কাজ পরিচালিত হইবে এবং ইহা অতিমাত্রায় ব্যয়বহুলও নহে। জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রকৌশলীরা শুধু যে এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন শুরু করিয়াছেন তাহাই নহে, একইসাথে অন্য প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও গ্রহণ করিয়াছেন। সব মিলাইয়া, ইহা যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োচিত একটি উদ্যোগ তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহার পরও নিরুদ্বিগ্ন থাকিবার উপায় কোথায়? উদ্বেগের কারণ অনেক। তন্মধ্যে সমস্যার ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতার তুলনায় অত্যাধুনিক সাজ-সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগহীনতা, বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভৌগোলিক অবস্থানগত বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান যে গুরুতর ভূমিকম্প-ঝুঁকির মধ্যে তাহা প্রমাণিত। সর্বোপরি, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা যে অমূলক নহে ইতিমধ্যে তাহার কিছু কিছু আলামতও লক্ষ করা গিয়াছে। প্রস্তুতিহীনতা কতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হইতে পারে আইভরি কোস্টের সামপ্রতিক ভূমিকম্পে তাহা অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করিতে হইয়াছে বিশ্ববাসীকে। অতএব, হেলাফেলার কোনো অবকাশ নাই। ভূমিকম্প আমরা ঠেকাইতে পারিব না, কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলার উপযুক্ত প্রস্তুতি থাকিলে দুর্যোগে প্রাণ ও সম্পদহানির মাত্রা যে অনেকাংশে কমাইয়া আনা যায়—তাহা আমাদের চাইতে অধিক আর কে জানে!