বলা হয়, ’জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও প্রিয়’। তাই প্রিয় জন্মভূমিকে পাক হায়েনার কবল থেকে মুক্ত করতে বাংলার বীর সন্তানরা হাতে তুলে নেন অস্ত্র। জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুদের ওপর। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শত্রুমুক্ত হয় মাতৃভূমি। ১৯৭২-এর বীর বাঙালিদের একজন মতি মিয়া। সনদবিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৩ সালের ৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলাধীন চারিতাল্লুক গ্রামে। মৃত মোহাম্মদ ছাক্কদ আলীর সন্তান তিনি। কিন্তু কৈশোরেই জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন একই উপজেলার কাঞ্চন ইউনিয়নের (বর্তমানে পৌরসভা) কলাতলী গ্রামে। এ গ্রামেই বিয়ে করে সংসার পাতেন। একে একে দেখেন এক কন্যাসহ চার সন্তানের মুখ। বেঁচে থাকার জন্য করেছেন নানা ধরনের কাজ। কখনো তাঁতের কারিগর; কখনো পাটকলের শ্রমিক; কখনোবা চা-দোকানি; আবার কখনো জেলে।
১৯৭১। উত্তাল দেশ। কাঞ্চন নবারুণ জুট মিলে শ্রমিকের কাজ করতেন তিন সন্তানের জনক মতি মিয়া। ডাক আসে যুদ্ধের। অশীতিপর এ যোদ্ধা বলেন, পরিবার, পোলাপানের কতা (কথা) না ভাইবা দ্যাশ স্বাধীনের লাইগ্যা যুদ্ধে গেছিগা। টানা পনেরো দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন জীবন-মরণ খেলা। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অংশ নেন অনেক সফল অভিযানে। রাতের অন্ধকারে সাঁতরে পাড়ি দিয়েছেন খাল-বিল। কী ঝড় কী বৃষ্টি কত রাত কেটেছে জঙ্গলে। কত দিন কাটিয়েছেন ভুখা। কিন্তু স্বপ্ন যে একটাই ‘স্বাধীন বাংলা’। যে সংগ্রাম শুরু হয় ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো,বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে। তার শেষ ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। স্বাধীন হয় দেশ। বীরের বেশে গাঁয়ে ফেরেন মতি মিয়া। অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে। কথাগুলো বলার সময় গর্েব বুকটা ফুলে ওঠে এ বীর সেনার। কী দৃপ্ত কণ্ঠ এ বয়সেও! কিন্তু ৭১-এর এ বীর পুরুষ জীবন সায়াহ্নে দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে অর্ধাহারে। মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পার হলেও মেলেনি তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতি। উপজেলা থেকে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অনেক দেনদরবার করেও পাননি মুক্তিযোদ্ধা সনদ। সনদের বিনিময়ে কর্মকর্তারা দাবি করেন দশ হাজার টাকা। মতি মিয়া বলেন, দশ পয়সা দেওয়ার ক্ষমতা নাই, দশ হাজার দেই কইত্তে। তাই আশা ছেড়ে দেন সনদের।
লেখকের কাছে সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে জানতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এ বীর সেনানী। এখন স্ত্রী ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলে কামাল হোসেন(৪৫)-কে নিয়ে মতি মিয়ার সংসার। বড় ছেলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন সাভারে। মেজো ছেলে ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা চালক। নিজেরই নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তাই ফুসফুসের সমস্যাসহ নানা বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগা এ মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। রোজগার বলতে বয়স্কভাতার ৯০০ টাকা আর প্রতিবন্ধী ছেলে ভিক্ষা করে যা পায়। ওষুধ ভর্তি একটি পলিথিন বের করে বলেন, এক একটা বড়ি (ট্যাবলেট) বিশ ট্যায়া তিরিশ ট্যায়া আবার গ্যাসও (ইনহেলার) কিনতে অয়। অষুধ কিনলে খাওয়া বন্ধ, খাইতে গেলে চিকিত্সা বন্ধ। বলতে বলতে ছেঁড়া এক টুকরো লুঙ্গি দিয়ে চোখ মোছেন মতি মিয়া। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, শেখ সাহেবের ডাকে যুদ্ধে গেছেন, তাঁর মেয়ে এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ সূর্যসন্তানের আকুতি—মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে নিশ্চিত করা হোক সকল সুযোগ-সুবিধা। মুক্তিযোদ্ধারা সবার কাছে শ্রদ্ধাভাজন। মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। তাই সবারই উচিত অসুস্থ, অবহেলিত, অসহায় মুক্তিযোদ্ধদের পাশে দাঁড়ানো।
ঢাকা কলেজ
