আমরা সৌভাগ্যবান জাতি—তাই বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি। যিনি প্রথম জীবনে বাবা-মায়ের আদরের খোকা। পরবর্তী সময়ে খোকা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান। পর্যায়ক্রমে শেখ সাহেব। এরপর বাঙালির স্বাধিকারের চেতনাকে আত্মস্থ করে ১৯৬৬ সালে জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা পেশ করেন। বাঙালি বুঝতে পারলো তাদের মুক্তির দিশারী হবেন শেখ মুজিবই। আর একে কেন্দ্র করে শাসকচক্র তাঁকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে অন্যান্য নেতাসহ জেলে বন্দি করে রাখে। বাঙালি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঘটায় গণঅভ্যুত্থান। বের করে আনে শেখ মুজিবকে। তাঁকে উপাধি দেওয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু’। তখন থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু। তিনি ছিলেন আজীবন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে পেলেন বাঙালির অকুণ্ঠ সমর্থন। তাঁর দল আওয়ামী লীগ পেলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা। শাসক হতচকিত হলো বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা দেখে। তাই তো শুরু হলো ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু তা বুঝতে পারলেন। ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রস্ততি নিলেন। শাসকচক্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিলেন। কেননা তিনি ছিলেন শান্তিকামী আর গণতন্ত্রমনা। এরপর ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণ—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...। বাঙালি চূড়ান্ত প্রস্ততির ইঙ্গিত পেলো। আমার মতো হয়তো নতুন প্রজন্মের ভাবনা হয়—এ দিনই কেন তিনি স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা দিলেন না? ভাবি—এখানেই তো নেতার নেতৃত্ব। সেদিন ঘোষণা দিলে শাসকচক্র তত্ক্ষণাত্ সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতো বাঙালির ওপর। মুক্তিযুদ্ধের জন্য তখনও অপ্রস্তুত জাতি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়তো। স্বাধীনতার স্বপ্ন ভূলণ্ঠিত হতে পারতো। ইতিহাস অন্যদিকে মোড় নিতে পারতো। ২৫ মার্চ পৈশাচিক নৃশংসতা ঘটায় পাকিস্তানিরা। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
আমরা কী অভাগা জাতি । স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়। ভাবা হয়েছিল এ হত্যার মধ্য দিয়ে মুজিবকে ভুলে যাবে সবাই। তাঁকে জানার, চেনার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। তালাবন্দি করা হয় তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি। যা এদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এমনকি তাঁর হত্যাকাণ্ডে যেন মানুষ কিছু বলতে না পারে সেজন্য আতঙ্কমাখা পরিবেশ তৈরি করা হয়। দেখানোর চেষ্টা করা হয় তাঁর হত্যায় মানুষ দুঃখিত নয়! স্বজন হারানোর বেদনায় ব্যথিত নয়! এমনকি এ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথও বন্ধ করা হয়েছিল। ভাবনাটা এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছিলো যে স্বাধীনতার জন্য তিনি কী বা করেছেন! এই তো আত্মঘাতী বাঙালি! মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম হিসেবে জানতে পারি যে, মওলানা ভাসানী, মনি সিং প্রমুখের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধিতা থাকলেও তাঁরা মেনে নেন স্বাধীনতার পথে তাঁর নেতৃত্ব।
তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশে যে সব দল গঠিত হয়েছে তাতে তাঁর সঙ্গে তো বিরোধ থাকার কথা নয়। দলগত মতাদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু তিনি তো স্বাধীনতার দিশারী। তাঁকে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত বলতে শোনা যায় না! (অন্যের নিজস্ব মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আমি) যেখানে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃত তিনি। কেননা তিনি বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক যে হয়ে উঠেছেন সময়ের পথ ধরেই।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নরেন্দ্র মোদী মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি সমাধিতে পুষপাঞ্জলি দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ভোটে জেতার পর। শেখ মুজিব কি সমগ্র বাঙালির নন! তিনি কি মহাত্মা গান্ধীর মতো তাঁর সমাধি সৌধে সবার এমন ফুল আর শ্রদ্ধা পেতে পারেন না! তিনি কি সবার হতে পারেন না! একবার তাকাই ফিলিস্তিনি জনগণের দিকে? আবার তাকাই নিজের দিকে? ভাবতে পারি স্বাধীনতা কী সুন্দর! আর যিনি তা নিয়ে আসতে পথ তৈরি করেন তিনি কত্ত বড়...!
গাইবান্ধা
