অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ তোবার পাঁচ কারখানা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৯
তোবা গ্রুপের পাঁচটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ দিয়েছে মালিক পক্ষ। গত সোমবার কারখানার গেটে বন্ধের এই নোটিশ টানানো হয়। শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী শ্রমিকদের ধর্মঘটকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর ফলে তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানা বুকশান গার্মেন্টস, তোবা ফ্যাশন, তোবা টেক্সটাইল, তাইফ ডিজাইন ও মিতা টেক্সটাইল আপাতত আর চালু হচ্ছে না। গতকাল ইত্তেফাককে কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিকরা গত জুনের ১০ তারিখ থেকে ধর্মঘটে যাওয়ায় উত্পাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অনশন করার সময়ে মেশিনের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়। এই অবস্থায় কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। কারখানা বন্ধের নোটিশ এখনো অনেক শ্রমিক জানেন না। যারা নোটিশ সম্পর্কে জেনেছেন হতাশায় পড়েছেন তারা। সুমন নামে বুকশান গার্মেন্টসের এক শ্রমিক জানান, ‘নোটিশ টানানোর খবর আমি পেয়েছি। এই মুহূর্তে কোন কারখানা কাজে নিচ্ছে না। চরম হতাশার মধ্যে আছি।’ এদিকে কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলনকারী শ্রমিক সংগঠনগুলো। এর প্রতিবাদে আজ রাজধানীর বাড্ডায় শ্রমিক সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কারখানা বন্ধের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলবে। ইতিমধ্যে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ১৩ (১) ধারায় কারখানা বন্ধের মত কোন ঘটনা অনশনকালীন সময়ে ঘটেনি। তিনি বলেন, কারখানা যদি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয় সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের সব পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। সেই সঙ্গে অন্য কারখানায় এসব শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কারখানা মালিক দেলোয়ারের জামিন বাতিলেরও দাবি জানান তিনি। শ্রম আইন অনুযায়ী, কোন কারখানায় উত্পাদন বন্ধ, ভাংচুর, সম্পদের ক্ষতির ক্ষেত্রে জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানার মালিক ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন। কারখানা বন্ধের নোটিশে তোবা গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘শ্রমিকদের একটি অংশ এবং কিছু সংখ্যক বহিরাগত কারখানায় অবস্থান করে মালামাল লুট করে। উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক ও বহিরাগতদের অপতত্পরতায় কারখানার বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি হয়। এটি অবৈধ ধর্মঘটের শামিল। এই অবস্থায় কারখানা চালুর পরিস্থিতি নেই। এই অবস্থায় শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী কারখানা অনর্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো। এই আদেশ ১১ জুন, ২০১৪ থেকে কার্যকর হবে।’ কালাম নামে এক শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কারখানা বন্ধের কোন খবর এখনো জানি না’। কোথাও কাজের জন্য চেষ্টা করেছেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি জায়গায় চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোবা’র শ্রমিক হওয়ায় কোন কারখানা কাজে নিতে চাচ্ছে না।’ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা শ্রমিকরা। এছাড়া যে সব নারী শ্রমিকের বয়স চল্লিশোর্ধ তারাও অন্য কোন কারখানায় কাজ না পাওয়ার আশংকায় রয়েছেন। কারখানা বন্ধের নোটিস সম্পর্কে জানেন না বিজিএমইএ’র নেতৃবৃন্দও। গতকাল যোগাযোগ করা হলে সংগঠনের সহ-সভাপতি এস এম মন্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, কারখানা বন্ধের নোটিস সম্পর্কে কিছু জানি না। তবে মালিক আইনগতভাবে বন্ধ করতে চাইলে বিজিএমইএ’র সমর্থন থাকবে বলে জানান তিনি। বকেয়া বেতনের দাবিতে গত জুনের ১০ তারিখ থেকে কারখানায় কাজ বন্ধ করে ধর্মঘট পালন করে আসছিল তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানার প্রায় ১ হাজার ৫শ’ শ্রমিক। গত ৭ আগস্ট পুলিশ তোবা’র কারখানায় প্রবেশ করে আন্দোলনকারীদের বের করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের উপর হামলা চালিয়েছে। নানা নাটকীয়তার পর বিজিএমইএ’র মধ্যস্থতায় তোবা’র সাড়ে ১৪শ’ শ্রমিক তিন মাসের বেতন পান। তবে বোনাস পাননি। এরপর থেকে কারখানা খুলে দেয়ার দাবি করে আসছিলেন শ্রমিকরা। অন্য একটি কারখানা বন্ধ সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষের মুখে আশুলিয়ায় একটি সোয়েটার কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আশুলিয়ার শিমুলতলা এলাকায় সোনিয়া ফাইন নিট সোয়েটার নামক পোশাক কারখানায় এই ঘটনা ঘটে। কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফুজ্জামান মঞ্জু জানান, নিটিং শাখার ১৪৪ জনের মতো শ্রমিক অযৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। কয়েকদিনের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্দোলনকারী শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ চার দফা দাবি না মেনে শ্রমিকদের কৌশলে বের করে কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করেছে। চার দফা দাবি হলো- শ্রমিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং জোরপূর্বক ছাঁটাই করা যাবে না। ছাঁটাই করলে শ্রম আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করতে হবে, কারখানায় কাজ না থাকলেও প্রত্যেক শ্রমিককে ‘এ’ গ্রেড অনুযায়ী বেসিক দিতে হবে, বেসিক সমপরিমাণ ঈদ বোনাস দিতে হবে এবং বার্ষিক ছুটির টাকা অনতিবিলম্বে দিতে হবে। শিল্প পুলিশ ১ এর পরিচালক মো: মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ কোন সমাধানে না আসায় গার্মেন্টস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে মালিক পক্ষ। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।