সেলুলয়েডের আত্মঘাতীরা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৭
তারা প্রায় সকলেই একাধিকবার মরেছেন ক্যামেরার সামনে! আত্মহত্যার অভিনয়ও করেছেন কেউ কেউ। কিন্তু শেষ বেলায় নিজেরাই আত্মঘাতী হলেন। মরিবার যেন হলো তার সাধ। জীবনানন্দের সার্থক রূপায়ন ঘটালেন। লিখেছেন দিব্যজোতি দত্ত তাদের মনভোলানো হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল কতো বেদনা! হলিউডের হাসির রাজা রবিন উইলিয়ামস তার আত্মহত্যার মাধ্যমে সে কথাই প্রমাণ করে গেলেন। হলিউড, বলিউড এবং বাংলাদেশের অনেক সফল তারকা নিজেই পা বাড়িয়েছেন মৃত্যুর পথে। ঢাকাই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া নায়ক ছিলেন সালমান শাহ। কেয়ামত থেকে কেয়ামত দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল তার। ‘অন্তরে অন্তরে’ ‘দেনমোহর’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’সহ অসংখ্য হিট সিনেমার নায?ক সালমান শাহর মতো জনপ্রিয়তা খুব নায়কই পেয়েছেন। অথচ ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে এই সফল নায়ক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার ভক্তদের অনেকেই অবশ্য এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নিতে চায়নি। গুঞ্জন উঠেছিল ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা পারিবারিক অশান্তির জের ধরে তিনি খুন হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাই তার মৃত্যুর কারণ বলে সরকারিভাবে বলা হয়। সালমান শাহ কোনো সুইসাইড নোট লিখে যাননি, তবে দাম্পত্য কলহ এবং সহশিল্পীর সঙ্গে প্রেমই এই করুণ পরিণতির কারণ বলে মনে করা হয়। সূর্যদীঘল বাড়ি’ সিনেমা দৃশ্যে ডলি আনোয়ার। আত্মহত্যা করেছিলেন বাংলাদেশের টিভি ও চলচ্চিত্রের প্রতিভাবান অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার। ১৯৯১ সালের ৩রা জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ঘুমের ওষুধ অথবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন এই অভিমানী শিল্পী। ২০১৩ সালের পহেলা জুলাই আত্মহত্যা করেন টিভির অভিনেত্রী, উপস্থাপক ও একসময়ের জনপ্রিয় মডেল মিতা নূর। সুন্দরী, প্রতিভাময়ী এই শিল্পীর ছিল স্বামী, সন্তান নিয়ে সাজানো সংসার। গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এর কারণ সম্পর্কে সঠিকভাবে বলতে পারেনি কেউ। পারিবারিক অ্যালবামের ছবিতে মিতা নূর, তার স্বামী ও দুই ছেলে। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবিতে সুমাইয়া আজগর রাহা। ২০১৩ সালের ২২শে মার্চ আত্মহত্যা করেছিলেন মডেল ও অভিনেত্রী রাহা। কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেত্রী মহুয়া রায চৌধুরীর মৃত্যু চমকে দিয়েছিল ভক্তদের। ‘দাদার কীর্তি’, ‘কপাল কুণ্ডলা’সহ অনেক ব্যবসাসফল সিনেমার এই নায়িকা ১৯৮৬ সালের ২২শে জুলাই নিজের দেহে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অবশ্য শ্বশুরবাড়ীর লোকেরা তাকে হত্যা করেছে বলে সেসময? জোর গুঞ্জন ওঠে। ‘তুমি অনেক যতন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো দিতে পারোনি’ কিংবা ‘কতদিন পরে এলে একটু বসো’- এমন অনেক হূদয় ছোঁয়া গানের যিনি স্রষ্টা, সেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন ৬৮ বছর বয়সে। তার লেখা অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা। কলকাতার বনেদী পরিবারের সন্তান সফল এই গীতিকার ১৯৯৯ সালে মাঝ গঙ্গায়। একটি লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। নব্বইয়ের দশকে অনেক তরুণ ভক্তের মন ভেঙ্গে গিয়েছিল ভারতীয় নায়িকা দিব্যা ভারতীর মৃত্যু। বলিউডে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘শোলা আউর শবনম’ ছবির মাধ্যমে। এর আগেই তামিল ও তেলেগু ছবিতে সাফল্য পেয়েছিলেন তিনি। দিওয়ানা’র মতো সিনেমার এই অভিনেত্রী অর্থ ও খ্যাতি পেয়েছিলেন বয়সের তুলনায়। মাত্র ১ বছরে ১৪টি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করার রেকর্ড আর কোনো নবাগত শিল্পীর নেই। ১৯৯৩ সালের ৫ই এপ্রিল মাত্র ১৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই সুন্দরী অভিনেত্রীর। দিব্যা ভারতী আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি নাকি পরিকল্পিত দূঘঁটনায় হত্যা করা হয়েছিল, সেই রহস্য মেটেনি। দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী সিল্ক স্মিতার আত্মহত্যা উজ্জ্বল আলোয় ভরা তারকাজীবনের পেছনের অন্ধকারের আরেক বয়ান। পরে তার কাহিনী নিয়ে বিদ্যা বালানের ডার্টি পিকচার তৈরী হয়। আত্মহত্যা করেছিলেন দক্ষিণের আরেক সফল অভিনেতা শ্রীনাথ। ২০১০ সালের ২২ জুলাই ৫৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন সফল এই অভিনেতা। খ্যাতিমান চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিচালক মনমোহন দেশাই আত্মহত্যা করেন ১৯৯৪ সালের পহেলা মার্চ ৫৭ বছর বয়সে। ‘নাসিব’, ‘কুলি’, ‘মার্দ’, ‘অমর আকবর অ্যান্থোনি’র মতো ব্যবসাসফল ছবির পরিচালক মনমোহন দেশাই তার ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তার মৃত্যু আত্মহত্যা কি না তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি। ম্যারিলিন মনরো। সর্বকালের সেরা আবেদনময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর মৃত্যু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আত্মহত্যা। জন্মের সময় ছেড়ে যান বাবা। শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য ও অনাদরে। নাম ছিল নর্মাজিন মার্টিনসন। নিরাশ্রয় দারিদ্রপীড়িত সেই মেয়েটি একসময়। মেরিলিন মনরো নামে হয়ে ওঠে পুরো বিশ্বে যৌন আবেদনের প্রতীক। ‘জেন্টেলমেন ‘সেভেন ইয়ার ইচ’, ‘সাম লাইক ইট হট’, ‘অল এবাউট ইভ’সহ অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবির তারকা তিনি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের গ্ল্যামারকুইন ছিলেন তিনি। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। ১৯৬১ সালে তৃতীয় স্বামী লেখক আর্থার মিলারের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। মদ ও মাদকে আসক্তি ছিল। ১৯৬২ সালের ৫ অগাস্ট মাত্রাতিরিক্ত বারবিচুরেট সেবনের ফলে মৃত্যু হয? তার। আত্মহত্যার কথাই বলা হয় সরকারিভাবে। তবে কোনো কোনো মহলে অভিযোগ ওঠে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে খুন হয়েছেন মনরো। অর্থ, খ্যাতি, জনপ্রিয?তার আড?াল করতে পারেনি তাদের হতাশা, অভিমান ও যন্ত্রণাকে। আর তাই হয়তো নিজ হাতেই এই তারকা নিভিয়ে দিয়েছেন জীবনের আলো।