বিতর্কিত ১০ মহানায়ক

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৮
পেলে-টেন্ডুলকারদের মতো নিষ্কলুষ, বিতর্ক থেকে শত হাত দূরে থাকা কিংবদন্তীরা এই ক্রীড়াবিশ্বে রাজত্ব করেছেন, করছেন। তবে তাদের উল্টো পিঠে ক্রীড়া বিশ্বের এক বিশাল অংশ জুড়েই আছেন ও ছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে বিতর্কপ্রিয় ক্রীড়াবিদ। মুখের কথায়, আচার-আচরণে যারা জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে বুঝিয়ে দিয়েছেন নিয়মতান্ত্রিক দুনিয়াকে থোড়াই পরোয়া করেন তারা। মজার ব্যাপার হলো, এই নিয়ম মানতে না চাওয়া, জীবনে-যৌবনে শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করতে চাওয়া ক্রীড়াবিদরা আবার শেষ বিচারে অধিক জনপ্রিয় বলে দেখা গেছে। চলতি বিশ্বকাপে লুইস সুয়ারেজের আরও একটা কামড় কাণ্ড কিংবা সাকিব আল হাসানের আরও কিছু বিতর্কিত ঘটনা আবার এইসব বিতর্কের মহানায়ক ক্রীড়াবিদদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সেই আদিকাল থেকে ক্রীড়াবিশ্বে দাপট চালিয়ে যেতে থাকা এই নায়ক বা খলনায়কদের ভেতর থেকে দশ জনকে বেছে নেওয়াটা সহজ কাজ নয়। তারপরও পরিচিতি, বিতর্কিত কাজের সীমা ও দাপট বিবেচনা করে বিশ্বের সর্বকালের সেরা দশ বিতর্কের সম্রাটকে স্মরণ করছি আমরা। ববি ফিশার :চ্যাম্পিয়ন অব চ্যাম্পিয়নস তিনি নজরুলের মতো খামখেয়ালি, মোত্জার্টের মতো শিল্পী, হিটলারের মতো ইহুদিবিদ্বেষী এবং মোহাম্মদ আলীর মতো চ্যাম্পিয়ন। তিনি রবার্ট জেমস ফিশার বা ববি ফিশার—দাবার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়! নিয়মতান্ত্রিক এই দুনিয়ার প্রতি অনিয়মের এক প্রবল পরিহাস। শুধু ফিশারের সাফল্য আর সৃষ্টির কথা বলতে গেলেই শেষ হয়ে যাবে এ লেখা। মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিশ্বসেরা, বরিস স্পাসকিকে হারালেন আইসল্যান্ডে। সেই থেকে শুরু করে জীবনে আর কখনও কোনো প্রতিযোগিতামূলক দাবা টুর্নামেন্টে হারেননি ফিশার। এখনও বহু বিশ্বরেকর্ডই রয়েছে ফিশারের নামে। কিন্তু এইসব সাফল্যে ফিশারকে চেনা যাবে না। ফিশার হলেন তিনি, যিনি খেতাবি লড়াই লড়তে বসে একের পর এক টালবাহানা করে খেলা বাতিল করে দেওয়ার ভয় দেখান—বোর্ডটা খুব চকচকে, চোখে লাগছে; বদলে দাও। ক্যামেরা কেন? বের করে দাও। ওর পায়ে খসখস শব্দ হচ্ছে! সমস্যা শুধু খেলা নিয়ে নয়, ধর্মে প্রবল আপত্তি। ইহুদিদের দুচোখে দেখতে পারতেন না, দীর্ঘকাল আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় রেডিওতে নিজের সাবেক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলায় উত্সাহ দিতেন, গরীবদের ঘৃণা করতেন, মনে করতেন সব মহিলা দুনিয়ার পাপের উত্স! ব্যাংক ডাকাতি, দেশদ্রোহিতা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসে যুক্ত থাকা—শত শত অভিযোগ তার নামে। কিন্তু ফিশারভক্তরা শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ ভুলে একটা কথাই মনে রাখেন—ফিশার আজন্ম চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ডিয়েগো ম্যারাডোনা :ঈশ্বরের বেয়াড়া পুত্র ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দুটো গোল করেছিলেন—একটা হাত দিয়ে, আরেকটা সাত ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সর্বকালের সেরা গোল। ম্যারাডোনা ওই ফিফা স্বীকৃত সর্বকালের সেরা গোল নিয়ে খুব একটা গর্ব করেন না। বারবার নিজেই হাতের গোলটার কথা তোলেন, ‘ওটা ছিল হ্যান্ড অব গড। ডাকাতের ওপর বাটপারি করতে দরকার ছিল।’ এই হচ্ছেন ম্যারাডোনা যার কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে ইংল্যান্ড মানেই আজীবনের ‘ডাকাত রাষ্ট্র’! ম্যারাডোনার অর্জন নিয়ে আলোচনা করা বাতুলতা মাত্র। ফিফার জরিপে সর্বকালের সেরা ফুটবলার তিনি। নাপোলির মত অখ্যাত ক্লাবকে তলানি থেকে টেনে তুলে ইতালিয়ান লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন। আর্জেন্টিনার ক্ষীণশক্তির এক দলকে নিয়ে পরপর দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে একটা কাপ জিতেছেন। কিন্তু এই ম্যারাডোনার চেয়ে দামী ফুটবলার আপনি পাবেন। পাবেন না ম্যারাডোনার মতো চরিত্র, যিনি বুশের হাতে ইরাকীদের রক্ত বলে তার মেয়ের সঙ্গে হাত মেলান না; তিনিই ম্যারাডোনা। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বন্ধু; হুগো শ্যাভেজ, ইভো মোরালেসদের মার্কিনবিরোধী লাতিন জোটের যোদ্ধা তিনি। ফিফার দুর্নীতি, অসততার বিপক্ষে উচ্চকিত কণ্ঠ ম্যারাডোনা। আবার অন্ধকার অধ্যায়ও আছে। মাদক নিয়ে বিশ্বকাপ আসর চলা অবস্থায় নিষিদ্ধ, কর ফাঁকি দেওয়া, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা, স্ত্রী-বান্ধবীদের সঙ্গে প্রতারণা; কী করেননি তিনি! এতো কিছু করার পরও ভক্তদের কাছে তিনি ঈশ্বরপুত্র—একটু বিগড়ে যাওয়া পুত্র আর কী! মাইক টাইসন :শতাব্দীর সেরা অপচয় নিঃসন্দেহে তাকে সর্বকালের সবচেয়ে বিগড়ে যাওয়া ক্রীড়াবিদ বলা চলে। কী অর্জন করেননি? হেভিওয়েট বক্সিংয়ের কিংবদন্তী বলা চলে। এখনও সবচেয়ে কম বয়সে ডব্লুবিসি, ডব্লুবিএ ও আইবিএফ-এর তিনটি বিশ্ব শিরোপা জয়ের রেকর্ড তার। জীবনে ৫৮টি গেমসে অংশ নিয়ে ৫০টিতেই জিতেছেন। জীবনের প্রথম ১৯টি বক্সিং প্রতিপক্ষকে নকআউট করে জিতেছেন; এর মধ্যে ১২টিই প্রথম রাউন্ডেই ছিটকে দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে। প্রথম বক্সার হিসেবে তিন ভিন্ন ঘরানার বক্সিং বিশ্ব শিরোপা জিতেছেন। শিরোপা হারিয়ে আবার উদ্ধার করা কিংবদন্তীদের পাশে, মানে মোহাম্মদ আলীর পাশে নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু এই টাইসন নন; আমাদের আলোচ্য ‘ব্যাড বয়’ টাইসন, যে টাইসন বক্সিং রিংয়ে প্রতিপক্ষ হলিফিল্ডের কান কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিলেন; যে টাইসন ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় ধর্ষণের অভিযোগে ছয় বছরের জন্য জেলে গিয়েছিলেন; যে টাইসন বক্সিং রিংয়ের যুদ্ধকে প্রতিপক্ষের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন বন্দুক হাতে; যে টাইসন ব্যাংক প্রতারণার দায়ে আদালতে দাঁড়ান। তবে টাইসনের এই সব কুকীর্তি বোধহয় ক্ষমা পেয়ে যায় এই জীবনে তার উপলব্ধিতে। এই শেষ বয়সে এসে বলছিলেন, ‘কী অর্জন করলাম জীবনে? ট্রফি-শিরোপা দিয়ে কিচ্ছু হয় না। মানুষের মন জিততে পারিনি। আমার সারাটা জীবন একটা অপচয় ছাড়া কিচ্ছু না।’ জন ম্যাকেনরো :ভয়ঙ্কর শিশু জিমি কনর্স, বিয়ন বর্গ বা ইভান ল্যান্ডালসের যোগ্য প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন। ওপেন যুগের অন্যতম সেরা টেনিস খেলোয়াড় ছিলেন। ৫টি উইম্বলডন ও ৪টি ইউএস ওপেন জিতেছেন। তবে ম্যাকেনরোকে লোকেরা মনে রেখেছে কোর্টে তার ভয়াবহ বাজে আচরণের কারণে। কিছুতেই নিজের বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ হতো না। আম্পায়ারদের গালিগালাজ করা, তেড়ে যাওয়া, এমনকি মারতে উদ্যত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে সরাসরি গালিগালাজ করেছেন। খেলার পরেও রেশ ধরে রেখে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের যাচ্ছেতাই বলতেন। বিয়ন বোর্গের মতো ভদ্র মানুষের সঙ্গেও বন্ধুত্ব টেকেনি ব্যবহারের কারণে। ব্যক্তি জীবনেও সদাচারী ছিলেন না। নানারকম কেচ্ছাকাহিনীর জন্ম দিয়েছেন সবসময়। অবসর জীবনেও লাগাম ছাড়া কথাবার্তা আর জীবনাচরণ সঙ্গী হয়েছে তার। উইম্বলডন জয়ের পরও অল ইংল্যান্ড ক্লাবের সদস্যপদ পাননি এই আচরণের জন্য। তা নিয়ে একটুও ক্ষোভ ছিল না। নিজেই পাত্তা দিতেন না এসব আনুষ্ঠানিক ব্যাপার স্যাপারকে। সতীর্থরাই বলতো সেরা কথা—ম্যাকেনরো হলো এক এনফ্যান্তে তেরিবল; ভয়ঙ্কর এক শিশু! মারিও বালোতেল্লি :সবসময় আমিই কেন! ভক্তরা আদর করে ডাকে—সুপার মারিও। আদর করাটা অন্যায় নয়। খেলোয়াড় হিসেবে নিজের দক্ষতার প্রমাণ তো রেখেছেনই। চারটে ইতালিয়ান লিগ জিতেছেন, একটা ইংলিশ লিগ জিতেছেন। ক্লাব দলের হয়ে আরও ট্রফি কম জেতেননি। প্রায় তার জাদুতেই গত ইউরোতে ফাইনালে উঠেছিল ইতালি। আরও গুণ আছে মারিওর। বর্ণবাদের বিপক্ষে অসাধারণ এক কণ্ঠস্বর। যেখানেই বর্ণবাদী আক্রমণ হয়, সেখানেই মারিও বালোতেল্লি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন—বুঝান, কথা বলেন। কিন্তু এসব দিয়ে কী আর বালোতেল্লিকে চেনা যায়! বালোতেল্লি এমন এক মানুষ, যাকে তার গুরুও হজম করতে পারেননি। বর্তমান পৃথিবীর সেরা কোচদের একজন হোসে মরিনহোর সঙ্গে চরম গোলমাল করে পুরোনো গুরু রবার্তো মানচিনির কাছে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেখানে এমন কাণ্ডকারখানা করলেন যে, তাকে আবিষ্কার করা মানচিনি বলতে বাধ্য হলেন—মারিওকে সামলানো কোনো কোচের কাজ নয়। কী করেন বালোতেল্লি। হোটেলে আগুন ধরানো, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, পুলিশের সঙ্গে বিতণ্ডা, ধুমপান করে জরিমানা, নিয়মিত দলের আইন ভাঙা, বেফাঁস কথা বলা, ফিফা-উয়েফার আইন ভেঙে জরিমানা দেওয়া ও নিষিদ্ধ হওয়া, ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে গণ্ডগোল, কোচদের সাথে হাতাহাতি; বালোতেল্লি করেননি এমন কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বলা হয়, বিতর্কই বালোতেল্লিকে খুজে নেয়! শেন ওয়ার্ন :বিশ্বসেরা ও বিতর্কসেরা হয়তো ক্রীড়া বিশ্বের আরও অনেক নামজাদা বিতর্কিত তারকার তুলনায় শেন ওয়ার্ন একটু ভদ্রলোকই বটে; অন্তত এই তালিকায় তার থাকা উচিত না। রোমারিও, তেভেজ, আনা কুর্নিকোভা, ডেনিস রডম্যানকে রেখে তাকে কেন নিলাম আমরা? কারণ, আমাদের কাছে শেন ওয়ার্নের পরিচিতি। শেন ওয়ার্ন কতোবড় ক্রিকেটার, সেটা তো কাউকে বুঝিয়ে বলা লাগবে না। ৭০৮টি টেস্ট উইকেট, ২৯৩টি ওয়ানডে উইকেট—এই দুটি পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন বলা হয়। ক্ষুরধার ক্রিকেট বোদ্ধা হিসেবেও তরুণ বয়স থেকে সমাদৃত ছিলেন। মনে করা হতো অস্ট্রেলিয়ার সেরা অধিনায়ক হবেন তিনি। কিন্তু কখনই অধিনায়কত্ব পাননি। কারণ ভাবমূর্তি। হ্যাঁ, এই ভাবমূর্তি ব্যাপারটার একেবারে কেলেঙ্কারি করে ছেড়েছেন ওয়ার্নি। জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি কেলেঙ্কারি হলো বাজিকরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিষিদ্ধ হওয়া এবং ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়া। দুবার নিষেধাজ্ঞার ওপর দিয়ে পার পেয়েছেন। তবে এই দুটো হাইলাইট হলে তার জীবন এমন কীর্তিতে ভরপুর। কখনও অজুর্না রানাতুঙ্গাকে নিয়ে অশালীন কথা, কখনও বান্ধবীর সঙ্গে প্রতারণা, কখনও যৌন হয়রানির মতো কাজে জড়ানো। শেন ওয়ার্ন আলোচনাতেই থাকেন এবং ছিলেন। এই তো আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর বিগ ব্যাশেও প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে গোলমাল করে জরিমানা দিলেন। টাইগার উডস :এক অন্ধকার জীবন কয়েক বছর আগেও টাইগার উডসের নাম এই তালিকায় দেখলে চমকে উঠতেন সবাই। শুধু বিশ্বের সেরা গলফার, সবচেয়ে বেশি আয় করা ক্রীড়াবিদই ছিলেন না; টাইগার খুবই ভদ্র ভাবমূর্তির একজন খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালের শেষ দিকে এসে বেরিয়ে গেল যে টাইগারেরও একটা অন্ধকার জগত আছে। টাইগার উডস সর্বকালের সফলতম ক্রীড়াবিদদের একজন। নিজের সময়ে বছরের পর বছর বিশ্বের শীর্ষ ধনী ক্রীড়াবিদ ছিলেন। টানা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে র্যাংকিংয়ের এক নম্বর, মোট সবচেয়ে বেশি সময় র্যাংকিংয়ের এক নম্বর, সবচেয়ে বেশি মেজর ওপেন জয়—এসব রেকর্ড তো ছিলই। তবে সমস্যার শুরু ২০০৯ সালের শেষ দিকে। জানা গেল, এক নাইটক্লাবের ম্যানেজার ভদ্রমহিলার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আছে তার। সংবাদকর্মীদের এড়াতে সেই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে পালাতে গিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটানোয় বেরিয়ে এলো খবর। পরপরই প্রকাশ হতে থাকল গৃহপরিচারিকা থেকে অ্যাথলেট—বহুজনের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখে চলেছেন টাইগার। এই অন্ধকার জগত খুলে যেতেই আরও অনেক কেলেঙ্কারি বেরিয়ে এলো। ফর্ম হারালেন টাইগার উডস; পতন হলো স্বর্গ থেকে। ল্যান্স আর্মস্ট্রং :প্রতারণায় সবার ওপরে ল্যান্স আর্মস্ট্রংয়ের ব্যাপারটাও খানিকটা টাইগার উডসের মতো। এই আরেক সর্বকালের সেরা ক্রীড়াবিদও সারাজীবন নিজেকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত করে গেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তারও। একটা ট্যুর ডি ফ্রান্স জয়ই সাইক্লিংয়ের জগতে অনেক বড় অর্জন। সেখানে আর্মস্ট্রং টানা সাতটা ট্যুর ডি ফ্রান্স জিতেছিলেন বিশ্বরেকর্ড করেই। তাও আবার কীভাবে? কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ে মৃত্যুর কাছে চলে গিয়েছিলেন। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেহে। সেখান থেকে ফিরে এই বিশ্বজয়। ফলে আর্মস্ট্রং ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। কিন্তু তাকে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেকদিন ধরেই অভিযোগ করছিলেন যে, আর্মস্ট্রং অত্যন্ত আধুনিক কোনো একটা ড্রাগ ব্যবহার করেন শক্তি বাড়ানোর জন্য। বছরের পর বছর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। অবশেষে ২০১২ সালে ওয়ার্ল্ড অ্যান্ডি পোডিং এজেন্সি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে সংরক্ষিত রক্ত ও মূত্র আধুানক উপায়ে পরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত হয়েছে আর্মস্ট্রং চিরকালই ড্রাগ নিয়েছেন। আরও কিছুদিন অস্বীকারের পর অপরাহ উনফ্রেহ শোতে ভেঙে পড়ে আর্মস্ট্রং স্বীকার করেন বছরের পর বছর ধরে একাধিক ভয়ঙ্কর ড্রাগ নিয়েছেন তিনি, প্রতারণা করেছেন, মিথ্যে বলেছেন। তিনি নিজেই বলেন, ‘ড্রাগ না নিয়ে সাতটা ট্যুর ডি ফ্রান্স জেতা সম্ভব না।’ কেড়ে নেওয়া হয় আর্মস্ট্রংয়ের জীবনের সব পদক, পরিণত হন অনুপ্রেরণা থেকে এক কলঙ্কিত নায়কে। লুইস সুয়ারেজ :কামড়াতে পারেন একটা গুঞ্জন আছে, সুয়ারেজকে কেনার পর বার্সেলোনা তার চুক্তিতে একটা ধারা যোগ করেছে—সুয়ারেজ কাউকে কামড়ালে তার বেতন থেকে ৩ মিলিয়ন ইউরো কেটে নেওয়া হবে! একজন খেলোয়াড় কাউকে কামড়াবেন কেন! কামড়াতে পারেন, পারেন বলেই সুয়ারেজ বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত, বিতর্কিত ফুটবলার। মাঠে সুয়ারেজের পারফরম্যান্স নিয়ে কোনো কথা নেই। এই যুগের সেরা নিখুঁত ফিনিশারদের একজন তিনি। এই তো ভয়ানক ইনজুরি নিয়েই বিশ্বকাপ খেলতে নেমে জোড়া গোল করে উরুগুয়েকে ম্যাচ জেতালেন। কিন্তু পরের ম্যাচেই স্বভাবটা ফিরে এলো। কামড়ে ধরলেন জর্জিও কিয়েল্লিনিকে। সেই কামড়ের জের ধরে নয় ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হলো, মাথে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবলীয় কর্মকাণ্ড, এমনকি স্টেডিয়ামে প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হলো। কিন্তু সুয়ারেজের কামড় কীর্তি এই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৩ সালে লিভারপুলে থাকতে চেলসির ইভানোভিচকে কামড় দিয়ে ১০ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। তারও আগে, ২০১০ সালে আয়াক্সে থাকতে কামড় দিয়েছিলেন অটম্যান বাকালকে; তাতে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন। এই কিয়েল্লিনিকেই আগে একবার কামড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। এ ছাড়া বারবার আঘাত পাওয়ার অভিনয়ে শাস্তি পেয়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন হাত দিয়ে বল ধরে। প্যাট্রিক এভরাকে বর্ণবাদী গালি দিয়েও শাস্তি পেয়েছেন। এতোকিছুর পরও সুয়ারেজ কিন্তু উরুগুইয়ানদের কাছে হিরো; তবে একটু অন্যরকম হিরো। জর্জ বেস্ট :সেরাদের সেরা তিনি নিজে বলেছিলেন, ‘আমার গায়ের রং কালো হলে পেলের নাম কেউ জানতো না। কারণ, আমি দেখতে এতো সুন্দর না হলে ফুটবলে হয়তো আরেকটু মন দিতাম।’ মন কম দিয়েছেন না বেশি, সেটা পরের কথা। তবে জর্জ বেস্ট যে ‘বেস্ট’ ছিলেন, সে ব্যাপারে পেলে-ম্যারাডোনা সবাই একমত। অনেকের মতেই সর্বকালের সেরা ফুটবলার আসলে এই আইরিশ ফুটবলার। তবে বেস্ট বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন তার উদ্দাম জীবনযাপনের জন্য। নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে জেগে থাকা অবস্থায় একটা কয়েক মিনিট মদ ও নারীসঙ্গ ছাড়া ছিলাম। জীবনের সবচেয়ে বাজে কয়েকটা মিনিট ছিল ওটা।’ এটাই বেস্ট। সারা জীবন এই মদ্যপান করে করে গেলেন। এই মদ্যপান ও অধিক নারীপ্রিয়তার কারণে অনেক অঘটনও ঘটিয়েছেন। অসংলগ্ন কথাবার্তা ছিল তার জীবনের সঙ্গী। একাধিকবার সাজা পাওয়া, হেনস্থা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে জীবনে। হাসপাতাল ছিল নিয়মিত জায়গা। সারাজীবন নিয়মটাই কখনই মানতে চাননি। মাত্র ২৭ বছরে বয়সে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অবসর নিয়ে ফেলেছিলেন। পরে অবশ্য ফিরেও এসেছিলেন। কিন্তু এই বাইরের উদ্দাম জীবন কখনওই ফুটবলে নিজের প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রকাশটা ঘটাতে দেয়নি।