১.
যখন আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘ঢোকানো’ হলো, তখন ঘড়িতে ১২টা ৫৭ মিনিট ১০ সেকেন্ড। সুউচ্চ মেইন গেট। মনে হলো কোনো টিনের বাক্সের ভেতরে প্রবেশ করেছি। কারারক্ষীরা সেকেন্ড গেট খুলে দিলেন। টিনের বাক্স থেকে পা রাখলাম কেন্দ্রীয় কারাগারের লাল চত্বরে। সামনে যতদূর চোখ যায় দু-একটি ছাড়া সব বিল্ডিং লাল লাল। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসা ‘লাল দালান’ শব্দটির মর্মার্থ বুঝার বাকি রইল না।
আমার সামনে ও পেছনে গাঢ় সবুজ রঙের প্যান্ট-শার্ট-ক্যাপ পরা এক ডজন কারারক্ষী। সবার হাতে ডাণ্ডা। ইট বিছানো কারাপথে হেঁটে হেঁটে সামনে এগোচ্ছি। দুপাশে পেরিয়ে যাচ্ছি বন্দীদের দিবা-রাত্রির নিত্যসঙ্গী কারাভবন। মাধবীলতা, কলমিলতা, অপরাজিতা—এ ধরনের চমত্কার নাম দেওয়া হয়েছে ভবনগুলোর। চার-পাঁচ তলার একেকটি ভবনকে ভাগ করা হয়েছে অসংখ্য কারা সেলে। লোহার শিকের ঝালর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সেলের সামনে। প্রতিটি সেলে চাপ চাপ যানজটের মতো হাজতিদের অবস্থা। মধ্যাহ্ন রোদের ঝাঁঝ পেতে লোহার ঝালর ধরে দাঁড়িয়ে আছে শত শত হাজতি। আমাদের হেঁটে যাওয়া দেখে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করছে তারা। দূর থেকে মনে হচ্ছে কোনো ‘মাইম শো’ (মূকাভিনয় শো)। কেউ হাসছে।
যারা কারাগারে থাকেন তাদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়—হাজতি ও কয়েদি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে আদালতের নির্দেশে বা মামলার রায় হওয়ার আগে কেউ আটক বা গ্রেফতার হলে সে হাজতি। আর মামলার রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলো কয়েদি। কয়েদিদের সাদা-কালো ডোরাকাটা পোশাক ও টুপি পরতে হয়।
আদালত অভিযুক্ত আসামিদেরকে দুই ধরনের সাজা দেয়—সশ্রম ও বিনাশ্রম। সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়। যেমন—কারাগারে বাগান পরিচর্যা, রান্নাবান্না করা, কারাভবন ঝাড়ু দেওয়া, ঘাস কাটা, লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব পালন করা।
আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা মুক্ত আকাশ, আলো-বাতাস থেকে একেবারেই দূরে থাকেন। তাদেরকে রাখা হয় কনডেম সেলে। হাঁস-মুরগির খুপরির মতো ঘর। ফাঁসি হওয়ার আগেই পেতে হয় অবর্ণনীয় যন্ত্রণার স্বাদ। ঐতিহ্যানুসারে, কারাগারে আগমনের পর একজন বন্দীকে তিনটি জিনিস দেয়া হয়—থালা, বাটি আর কম্বল। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, কোনো বন্দী ডিভিশন পাওয়ার পর যোগ্য হলে তাকে তুলনামূলক ভালো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। সামনে পা বাড়াতেই মুখোমুখি হলাম বেশ ক’জন হাজতির। মধ্যাহ্ন পানাহারের জন্য বাইরে বেরিয়েছেন। এদের কেউ জানালেন কারাগারে দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা। ছেঁড়া, ছারপোকাওয়ালা কম্বল, স্যাঁতস্যাঁতে ফ্লোর, লবণ ছাড়া ডাল আর পাথর মিশ্রিত ভাতের কথা অকপটে বললেন। কেউ বললেন অবস্থা আগের চেয়ে মোটামুটি ভালো। আরও দশ পা সামনে এগোলাম। হাতের বাম পাশে বিদেশি বন্দীদের সেল। তিনজন নাইজেরিয়ান বন্দীকে দেখে মানবিকতার উদ্রেক হলো। আহা! বিদেশ বিভূঁইয়ে কতই না কষ্ট করছে তারা। বিদেশি বন্দীদের সেল পেছনে ফেলে সামনে পা বাড়ালে জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে হত্যার নীরব সাক্ষী ‘মৃত্যুঞ্জয় ভবন’।
ভবনটি অতিক্রম করে এগোলাম ভিআইপি কারাভবনের দিকে। এখানে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীরা থাকেন। তখন সবেমাত্র অভিশপ্ত ওয়ান -ইলেভেন কয়েকটি মাস পেরিয়েছে। একজন কারারক্ষী একটি ভবনের দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। কানের কাছে মুখ এনে চুপি চুপি বললেন— এই ভবনেই তারেক রহমানকে রাখা হয়েছে। অদূরেই দেখলাম সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে। ক্যাঙারু কোর্টের দেওয়া সশ্রম কারাদণ্ডের অংশ হিসেবে বাগান পরিচর্যার দায়িত্ব পড়েছে তার ওপর। তিনি ফুল গাছে পানি ঢালছেন। ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে চলে এসেছি ডেঞ্জার জোনে, খেয়ালই করিনি। দাঁড়িয়ে আছি কয়েকটি কনডেম সেলের সামনে। গা ছম ছম করা পরিবেশ। চতুর্দিকে ভয়ার্ত আবহ। একজন কয়েদি বললেন, ‘এই সেলেই থাকেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফারুক রহমান, পাশেরটিতে বজলুল হুদা।’ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার আশপাশেই হয়তো ফাঁসির মঞ্চ। আমাকে সেখানে নেওয়া হলো না। কারণ আমি ফাঁসির আসামি নই।
পৃথিবীর বাইরে আরেকটি পৃথিবী যেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক বন্দী আছেন যারা জীবনের বড় অংশটুকুই কাটিয়ে দিয়েছেন কারাগারে। আর যারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যাননি বা যাওয়ার সুযোগ হয়নি, তাদের কাছে এটি তো সীমাহীন কৌতূহলের অনুষঙ্গ।
আবারও কেন্দ্রীয় কারাগারের মেইন গেট। হাত বাড়িয়ে দিলেন ডিআইজি প্রিজন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। ডান হাত চেপে ধরে রাজসিক ঝাঁকুনি দিলেন। বললেন, ‘মানিক, আপনি সেই সৌভাগ্যবান সাংবাদিক, যিনি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সব সাংবাদিকের আগে কারাগার ঘুরে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন।’
মেইন গেটের বাইরে মুক্ত পৃথিবীতে পা রাখলাম। ঘড়িতে তখন বেলা ৩টা ১৭ মিনিট ১০ সেকেন্ড। কারাগারের ভেতরে ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিটের একটি অভিজ্ঞতার স্মারক আজীবনের জন্য যোগ হয়ে রইল জীবনখাতায়।
