এক লোমহর্ষক অপহরণ কাহিনী

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৯
তিন মাস আটকে ছিলেন, অপহূত হয়েছিলেন। বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমানের বয়ানে সেই লোমহর্ষক কাহিনী গত ৪ মে দেশব্যাপী গুম-হত্যার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে দলীয় কর্মসূচি শেষে সিলেটে ফিরছিলাম। পথে টুকেরবাজার নামক স্থানে পুলিশ আমার গাড়ি থামায়। রাস্তায় তখন দু’টি পুলিশের গাড়ি। সেখানে পাঁচজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। পুলিশ আমার চালকের লাইসেন্স দেখতে চায়। লাইসেন্স দেখালে পুলিশ তা ভুয়া দাবি করে। কর্মসূচি শেষ করে ফেরায় ঘুম ঘুম ভাব ছিল তাই পুলিশের সঙ্গে আমি কোন তর্কে জড়াইনি। তারা আমার গাড়িচালক রেজাউল হক সোহেলকে নিয়ে যায়। আমার কাছে গাড়ির কাগজ চাইলে আমি তাদের জানাই গাড়ির কাগজ আমার সিলেট নগরীর বাসায়। তখন তারা আমাকে বলে যে আমাকে গাড়িসহ থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। পরে বাসা থেকে কেউ কাগজ নিয়ে গেলে পুলিশ ড্রাইভার দিয়ে গাড়িসহ আমাকে বাসায় পৌঁছে দেবে। এসব কথা বলেই দু’জন পুলিশ আমার গাড়িতে ওঠে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে এ ঘটনা। গাড়ির পেছনে বসা ছিলাম আমি। পুলিশের একজন ড্রাইভিং সিটে অন্যজন ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। গাড়িতে উঠেই পাশের জন বলেন, গন্ধ লাগছে। এয়ার ফ্রেশনার দাও। অন্য পুলিশ সদস্য পেছনের দিকে আমাকে লক্ষ্য করে কিছু একটা স্প্রে করেন। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি অচেতন হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমার হাতে হ্যান্ডকাফ, পা ও চোখ বাঁধা। মেঝেতে পড়ে আছি।পুরো শরীরে খুব ব্যথা করছিলো। আমি শব্দ করে আমার অবস্থান জানতে চাই। সাথে সাথে পাশ থেকে কেউ একজন ধমকের সুরে বলে, শাটআপ বাস্টার্ড, উই উইল কিল ইউ...! একদম চিত্কার করবি না, বলে আরেকজন আমাকে সজোরে লাথি মারে। কখন যে দিন হতো বা কখন রাত হতো তা আমি বুঝতে পারতামনা। তবে যদ্দুর মনে পরে জ্ঞান ফেরার প্রায় আট ঘণ্টা পর ফজরের নামাজ শুনেছিলাম। ওই সময়েই তারা আমাকে খাওয়ার জন্য রুটি-কলা দেয়। বন্দিবস্থায় একাধিকবার আমি পানি খেয়ে জ্ঞান হারিয়েছি। আমার ধারণা ওরা আমার খাবার পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতো। প্রথম দিকে ভাত খেতে না পারলেও পরে ওরা আমাকে ভাত খেতে দিতো। সাথে দেওয়া হতো আলু ও বেগুন ভর্তা এবং গরু ও খাসির মাংস। খাওয়ার সময়ও ওরা চোখের বাঁধন খুলে দিতোনা। হ্যান্ডকাফ হাত বাঁধা অবস্থাতেই খেতে হতো। খাওয়ার সময় অপহরণকারীদের একজন প্লেট মুখের কাছে তুলে ধরতো। নিয়মিত গোসলও করতে দেয়নি ওরা। বন্দি অবস্থায় ১০ থেকে ১২ দিন পর পর গোসল করতে দিতো। বন্দি থাকা অবস্থায় তিন বার স্থান পরিবর্তন করা হয়। প্রথমবার মনে আছে প্রায় ২০/২৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে ওরা আমাকে নতুন জায়গায় নিয়ে যায়। স্থান পরিবর্তনের সময় ওরা আমাকে কাঁধে করে গাড়িতে তুলতো। তখন বুঝতাম, স্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে। সব সময় ওরা আমার চোখ বেঁধে রাখতো। টয়লেট এমনকি গোসলের সময়ও চোখের বাঁধন খুলতো না। এ অবস্থায় অপহরণকারীদের যে কোন একজনকে ধরে বাথরুমে যেতে হতো। হাতের ছোঁয়ায় যতোটুকু বুঝেছি অপহরণকারীদের চুল খুব ছোট করে ছাটা। শারীরিক গঠন বেশ লম্বা এবং সবাই সুঠাম দেহের অধিকারী। ওরা সবসময় ইংরেজি ও পরিষ্কার বাংলায় কথা বলতো। তারা নিজেদের কাউকে স্যার বলে সম্বোধন করতো। রমজানে আমাকে যেখানে রাখা হয় সেখানে সেহরির সময় মসজিদের মাইক থেকে ঘুম ভাঙানোর জন্য ডাকা হতো। একাধিক মসজিদের আজানের শব্দ কানে আসতো। প্রায়ই রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাইকের আওয়াজ পেতাম। ঘুমানোর জন্য ফ্লোরে একটি বালিশ দিতো ওরা। অপহরণের পর থেকে মোবাইলফোন, ঘড়ি ও মানিব্যাগ আর খুঁজে পাইনি আমি। পাহারায় সবসময় থাকতো অন্তত চার-পাঁচ জন। অপহরণের প্রথম দিকে ওরা অনেক বেশি মারধোর করেছে আমাকে। যখনই জ্ঞান ফিরতো ওরা আমাকে লাঠি দিয়ে পিটাতো। জানতে চাইতো বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে। মুক্ত হওয়ার পাঁচ-সাত দিন আগে ওরা আমাকে নিয়ে শেষবারের মতো স্থান পরিবর্তন করে। গত সোমবার ওরা আমাকে আন্ডারওয়ার পরতে বলে। পোশাক পরে তৈরি হতে বলা বলে। ভেবেছিলাম আর হয়তো বাঁচবো না। কোথাও নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। এমনটি মনে করে কালেমা পড়ে তৈরি হই। মুখে তখন ট্যাপ লাগানো হয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই আমাকে বোরকা পরানো হয়। অপহরণকারীরা সিঁড়ি দিয়ে হাঁটিয়ে নামিয়ে গাড়িতে তুলে প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরে গাজীপুর এলাকায় ফেলে রেখে যায়। আমার মনে হয়, ইচ্ছা করেই ভুল ধারণা দেয়ার জন্য গাড়িতে করে এক ঘণ্টা ঘোরানোর পর ছেড়ে দেয়া হয়। ছেড়ে দেয়ার সময় শুধু হাত থেকে হ্যান্ডকাফ খুলে নিয়ে যায় তারা। তাত্ক্ষণিকভাবে চোখ খুলে পাশেই তার গাড়িচালক সোহেলকে দেখতে পাই একই অবস্থায়। দু’জনে বোরকা খুলে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে টঙ্গীতে পৌঁছাই। সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে গুলশানের বাসায় যাই। পথিমধ্যে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারের সামনে নেমে যায় গাড়িচালক সোহেল। এ সময় সোহেলকে এক হাজার টাকা দেই আমি। ছাড়া পাওয়ার পর প্যান্টের পকেটে ৫৫০০ টাকা পাই আমি। অপহরণকারীরাই ছেড়ে দেয়ার আগে এই টাকা দেয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে যখন ছেড়ে দেয় তখনও মনে হয়েছিল আর বুঝি বাঁচবো না। কিন্তু কিছু সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারি আমি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছি। ফিরে পেয়েছি জীবন। গ্রন্থনা : দিব্যজোতি দত্ত