একদিকে বন্যা অন্যদিকে নদী ভাঙ্গনে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দেশের কয়েক লাখ মানুষ। পদ্মায় পানি বাড়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার দোহার ও ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় কমপক্ষে ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ইতিমধ্যে প্লাবিত বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, এনায়েতপুর, চৌহালী ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা মিলছে না। এছাড়া তিস্তার ভাঙ্গনে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ঘর-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য পরিবার। জামালপুরে যমুনার ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে বাঁধ।
দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার নারিশা, মাহমুদপুর, নয়াবড়ি, বিলাশপুর ও সীমান্তবর্তী ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার চৌধুরীডাঙ্গী, চর ঝাউকান্দিসহ নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ২৫ গ্রামের প্রায় সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গবাদিপশু ও পরিবার নিয়ে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কাজ হারিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে অধিকাংশ মানুষের। পানিবন্দী পরিবারগুলো ঘরের ভিতর মাচা বানিয়ে বসবাস করছে। টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নদীর পানি পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে।
এছাড়া বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে এসব এলাকার প্রায় ১৫ হেক্টর জমির ফসল। চৌধুরীডাঙ্গী গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাড়ি-ঘর ও ক্ষেতের ফসল তলিয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের অভাবে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এখন পর্যন্ত তারা কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।
গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় তিস্তার ভাঙ্গনে গতকাল পর্যন্ত কমপক্ষে শতাধিক পরিবারের বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শুধু ব্যাংকপাড়া এলাকাতেই ৬০ পরিবারের বাড়ি-ঘর নদীতে গেছে। ভাঙ্গন এলাকায় মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত কয়েকদিনের ভাঙ্গনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংকপাড়ার মার্জিনাল ডাইক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাউবো কর্তৃপক্ষ আগে-ভাগে কাজ করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। ভাঙ্গনের শিকার পরিবারগুলো বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যাংকপাড়া এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছে।
এছাড়া লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ এলাকার ১০ পরিবারের বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান। নদীভাঙ্গা পরিবারগুলো উঁচু জায়গায় কিংবা বাঁধের ধারে ঘর তুলে কোনোরকমে দিন পার করছে।
এদিকে তিস্তার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। গজঘণ্টা ইউনিয়নে চালাপাক এলাকায় ৬’শ পরিবার ভাঙ্গন হুমকির মুখে পড়েছে। গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের ধামুর ও নোহালী ইউনিয়নের বৈরাতি এলাকায় উপ-বাঁধের ১’শ ফুট এলাকা ধসে গেছে। পাউবো কর্তৃপক্ষ ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বালির বস্তা ও জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেছে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানি ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলায় নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এদিকে ইসলামপুরে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদী ভাঙন। পানির প্রচণ্ড চাপে গুঠাইল হার্ড পয়েন্টের আরো ১০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে হার্ড পয়েন্টের প্রায় ২০০ মিটার নদীতে বিলীন হলো। গত ৩ জুলাই হার্ড পয়েন্টের ৫০ মিটার বিলীন হলে স্থানীয় প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পাউবো’র রহস্যজনক ভূমিকার কারণে দুই মাসেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি অপরিবর্তিত থাকলেও সারিয়াকান্দিতে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্যায় উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪৫ গ্রামের ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভা করলেও বন্যা দুর্গতদের মধ্যে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারেনি।
কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, এখানকার ৮টি ইউনিয়নের ৭৫টি গ্রামের ২০ হাজার পরিবারের অন্তত ১ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে কষ্টে দিনযাপন করছেন। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় ভুক্তভোগী মানুষগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। দুস্থ ও দিনমজুরদের কাজ না থাকায় অনেকে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে বন্যার পানিতে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদী সংলগ্ন জেলার এনায়েতপুর ও চৌহালী উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। এতে এসব এলাকার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। পাশাপাশি বেড়েছে নদী ভাঙ্গন। চৌহালীতে ব্যাপক ভাঙ্গনে গত ২ দিনে বিলীন হয়েছে কয়েকশ ঘরবাড়ি। এনায়েতপুর স্পারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধসের বিস্তৃতি ঠেকাতে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় হুমকির মুখে রয়েছে খাজা ইউনুছ আলী মেডিক্যাল কলেজসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, শত শত একর জমির সদ্য রোপা আমন। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বন্যা কবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। জরুরি ত্রাণ হিসেবে বিশেষ জিআর এর ৩০ হাজার টাকা ও ৩০ মে: টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, দুধকুমার, শংকোস ও ফুলকুমার নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দু’কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। উপজেলার রায়গঞ্জ, ভিতরবন্দ, বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী, কালীগঞ্জ, নুনখাওয়া, কচাকাটা, কেদার, বল্লভেরখাস ও নারায়নপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে গেছে। পানি ঢুকে পড়ায় এসব এলাকার প্রায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত এবং ২৫ হেক্টর বীজতলা প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হায়াত্ মো. রহমতুল্লা বলেন, সরকারিভাবে বন্যা দুর্গতদের মাঝে এ পর্যন্ত ৯ মে.টন চাল বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
