সিরিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:২৬
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অসহনীয় ব্যর্থতার দায়ে জাতিসংঘের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদকে অভিযুক্ত করিয়াছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার নাভি পিল্লাই। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার প্রদত্ত বক্তব্যে দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলার জন্যও নিরাপত্তা পরিষদের তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন বিদায়ী এই কমিশনার। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান হইতেছে পনেরো সদস্য বিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের প্রাথমিক দায়িত্ব। জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য তথা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এবং সাধারণ পরিষদ হইতে দুই বত্সর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত দশটি দেশকে লইয়া এই পরিষদ গঠিত হয়। বর্তমানে অস্থায়ী সদস্য দেশগুলি হইতেছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, চাঁদ, চিলি, জর্দান, লিথুনিয়া, লুক্সেমবার্গ, নাইজেরিয়া, রিপাবলিক অফ কোরিয়া ও রুয়াণ্ডা। অস্থায়ী সদস্য দেশগুলি নিরাপত্তা পরিষদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হইলেও মূলত শক্তিমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যরাই মূল ভূমিকা পালন করে বলিয়া বাস্তবে প্রতিভাত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার কমিশনার যেই অভিযোগ আনিয়াছেন তাহা কেবলই একজন ব্যক্তির ক্ষোভের তাত্ক্ষণিক উদ্গীরণ নহে। বরং এই বক্তব্যের মধ্যে নির্জলা সত্য নিহিত রহিয়াছে। গত কয়েক বত্সরে শান্তিকামী বিশ্ব সিরিয়ায় কী প্রত্যক্ষ করিতেছে? তাহারা প্রত্যক্ষ করিতেছে যে, সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীপক্ষ নিয়মিত বিরতিতে পাল্লা দিয়া বেসামরিক নাগরিকদিগের প্রাণহানি ঘটাইতেছে, কিন্তু এহেন দুষ্কর্মের জন্য কোন পক্ষকেই তেমন কোন বিঘ্নের মধ্যে পড়িতে হইতেছে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের একটি কুকর্ম ঘটাইয়া ফেলিবার পরের কয়েক দিন কিছু নিন্দা-মন্দ চলিতে থাকে। জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অপর দুই-একটি শক্তিমান রাষ্ট্র কিছু শক্ত বাক্য উদ্গীরণ করে। অতঃপর আলোচনা থামিয়া যায়; দুই পক্ষ নতুন উদ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণ লইয়া খেলা করিতে শুরু করে। তাহাদের মিত্ররা দেখিয়াও না দেখিবার ভান করে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের এহেন নিষ্ক্রিয়তায় উভয়পক্ষই বুঝিয়া ফেলিয়াছেন যে, মানবতার বিরুদ্ধে অন্যায় সংঘটিত করিবার জন্য তাহাদিগকে কোন শাস্তি পাইতে হইবে না। পিল্লাই ঠিক এই ব্যাপারটি লইয়াই তীব্র আপত্তি প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি এই “আন্তর্জাতিক বিবশতার” মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলির নিজ-নিজ জাতীয় স্বার্থের প্রতিযোগিতাকে দায়ী করিয়াছেন, যাহার পরিণতিতে এখন অবধি সরকারি হিসাবেই সিরিয়ায় গত তিন বত্সরে প্রায় দুই লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হইয়াছে। তবে প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলিয়া মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। চলতি সপ্তাহেই সিরিয়া বিষয়ে অধিকতর পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত লইয়া নিরাপত্তা পরিষদে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস হইয়াছে। এহেন সিদ্ধান্ত অতীতে একাধিকবার গৃহীত হইয়াছে; কোন কাজ হয় নাই। এইবার হইবে কিনা তাহা সময়ই বলিয়া দিবে। কিন্তু নাভি পিল্লাইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করিলে বলা যায় যে, “স্বল্প-মেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা” এবং “সঙ্কীর্ণভাবে বিশ্লেষিত জাতীয় স্বার্থ” দ্বারা পরিচালিত হইয়া সিরিয়ার জন্য কোন উত্তম কার্য সম্পাদন করিতে পারিবে না নিরাপত্তা পরিষদ। বরং এই ধরনের অবস্থান আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসাবে বিরাজ করিতেই থাকিবে। আক্ষেপের বিষয় এই যে, সিরিয়ায় মানবতার আর কত বিপর্যয় দেখিলে নিরাপত্তা পরিষদ যথার্থভাবে উদ্যোগী হইয়া উঠিবে তাহা এখনই বলা যাইতেছে না।