আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যাকারীরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২২
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করে তারা গণতন্ত্র, রাজনীতি, সংবিধান, আইনের শাসন ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। আর যাদের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য নেই তারা দেশ ও জাতিকে কী দেবে? তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতা দখলকারী একটি দল। মানুষের রক্তের সে াতের ওপর পাড়া দিয়েই তারা ক্ষমতায় এসেছে। জনসমর্থন না থাকায় বিএনপি রক্তের ওপর দিয়েই ক্ষমতায় যেতে চায়। তাই রক্ত নিয়ে হোলি খেলা তাদের পছন্দ। মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে তারা উল্লসিত হয়। অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে এমন খেলা তারা করেছে। আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত যাতে আর ভয়াল তাণ্ডব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সজাগ ও স্বোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত ‘বিএনপি জামায়াতের তাণ্ডব: রক্তাক্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক ফটো অ্যালবামের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কত রক্ত ঝরবে? আর কত বোন বিধবা হবে? আর কত পিতা-মাতা সন্তান হারা হবে? কত সন্তান পিতা হারা হবে? তিনি বলেন, বাংলাদেশে এভাবে বার বার হায়নার আঘাত আসবে, এভাবে রক্তাক্ত হবে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মাটি তা আমরা চাই না। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করতে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো বর্বর তাণ্ডব চালিয়েছে। পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে। তাদের তাণ্ডবে পুলিশের ১৭ জন সদস্য, দু’জন বিজিবি ও সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার দু’জন সদস্যসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ নিহত হন। কেউ কেউ আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। মূলত বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে জনগণ ছিল না। তাই তারা লাশ নিয়ে খেলতে চায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলাম। দেশের মানুষ শান্তি ও স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু নির্বাচন বন্ধ করতে বারবার আঘাত কেন? কাকে খুশি করার জন্য, কাদের স্বার্থে এ আঘাত করা হচ্ছে? তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি, করবে না এ ব্যাপারে সকলের নিজস্ব দলীয় সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচন ঠেকাতে হবে একথা বলে মানুষের ওপর এ ধরনের হামলা, আন্দোলনের নামে পুড়িয়ে মানুষ মারা, যারা দায়িত্ব পালন করছে সেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা, এটা কোন ধরনের রাজনীতি? বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, রাজনীতি করতে চাইলে করেন। কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। মানুষের জীবন অন্ধকারে ঠেলে দেবেন না। লাশ নিয়ে উল্লসিত হবেন না। কারণ মানুষ হত্যা করা কোন আন্দোলন হতে পারে না। মানুষের রক্ত নিয়ে হোলি খেলা বন্ধ করে বিএনপিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আর কোন সহিংস ঘটনা বাংলার মাটিতে না ঘটে সেজন্য দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর সেনাবাহিনীতে ১৯টির মতো ক্যু হয়েছে। আর এসব ক্যু’তে হাজার হাজার অফিসার ও সৈনিককে হত্যা করা হয়। আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যারা স্বজন হারিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য সব সময় কাজ করে যাব। অন্তত আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন করবো। কারণ স্বজন হারানোর বেদনা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানেন না। আমি একদিনেই পরিবারের সবাইকে হারিয়েছিলাম। আমি হয়তো তাদের স্বজনকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। তবে তাদের কাছে সান্ত্বনা হিসেবে দাঁড়াতে পারবো। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবে হতাহতের শত শত ঘটনা আমাকে শুনতে হয়, দেখতে হয়। তাই তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আমি আর এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। দেশের মানুষও চায় শান্তি। তিনি বলেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বারবার হায়েনার আঘাত এসেছে। এটা আর হতে দেয়া যায় না। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু কাজ করেছিলেন। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা চাই মানুষ শান্তিতে বসবাস করুক। তিনি বলেন, ক্ষমতার কোন মোহ আমার নেই। ভোগবিলাসে আমরা বিশ্বাস করি না। ক্ষমতা আমার কাছে ভোগ-বিলাসের বস্তু নয়। জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব-এটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতির পিতা জীবন দিয়েছেন। তার চেতনা নিয়েই আমরা কাজ করে যাব। আর কেউ তা রুখতে পারবে না। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বার বার সেই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা কেন? বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতাকে পাকিস্তানি হানাদারদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে তো একটা বিদেশি সেনাবাহিনী ছিলো আমাদের দেশে। তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, দেশীয় কিছু দোসর তাদের সহযোগিতা করেছে। একাত্তরে তারা গণহত্যা চালিয়েছে, একইভাবে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। আমার এখনো মনে আছে ঢাকায় বস্তিতে তারা আগুন দিয়েছে। মানুষ যখন সে আগুন থেকে বাঁচার জন্য বেরিয়ে এসেছে তখন তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে হানাদার বাহিনী এভাবে মানুষ মেরেছে। ঠিক একই কায়দায় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ টি ইমামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত দেশজুড়ে যেভাবে মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, তা একাত্তরের হানাদারদের বর্বরতার সঙ্গে মিল রয়েছে। তিনি বলেন, আজ যে ফটো অ্যালবাম প্রকাশ করা হচ্ছে সেখানে সব আলামত ও ছবি জায়গার অভাবে ঠাঁই পায়নি। তবে একটা ছবি যে হাজারো মানুষের কথা বলে, এই ফটো এ্যালবাম তার প্রমাণ। আলোচনা শেষে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পিত ভয়াল ও নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি এই প্রামাণিক ফটো অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। আর পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা ও প্রমাণ্যচিত্রের ধারা বর্ণনা দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ১৫ মিনিট ৪০ সেকেন্ড সময়ের তৈরি বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের ভয়াল সন্ত্রাস ও তাণ্ডবের তথ্যচিত্র ও হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে ছেলে-মেয়ে, স্বামী-পিতা হারানো পরিবারের সদস্য, অগ্নিদগ্ধ, হাত-পা হারানো পঙ্গুত্বের শিকার অসহায় প্রায় ৭০ জন নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চের পেছনে দু’দিকে কোণাকুণিভাবে সিঁড়ির মতো তিনটি ধাপে বসেছিল তারা। বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে এসে প্রথমে দর্শকসারিতে গিয়ে বসেন। এসময় নিভে যায় মিলনায়তনের সকল আলো। নিকোষ অন্ধকারের মধ্যে বিশাল স্ক্রীনে দেখানো শুরু হয় নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের নৃশংস ও ভয়াল তাণ্ডবের ভিডিও চিত্র। এরপর প্রধানমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের সদস্য ও আহতদের কাছে যান। তাদের কথা মনোযোগ সহকারে শোনেন। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং তাকে জড়িয়ে ধরেন। প্রায় ২০ মিনিট এমন হূদয়বিদারক পরিবেশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে মঞ্চে থাকা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সান্ত্বনা দেন। পরে রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার শিকার এসব মানুষ ওই হামলার ঘটনার বর্ণনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে বক্তব্য দিতে গিয়ে মঞ্চেই জ্ঞান হারান ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর রায়ের পর গাইবান্ধার বামনডাঙায় পুলিশ ফাঁড়িতে হামলায় নিহত কনস্টেবল হযরত আলীর স্ত্রী লায়লা খাতুন। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রুদ্ধশ্বাসে লায়লা খাতুন বলেন, মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে বিকাল ৪টায় আমার স্বামী আমাকে ফোন করেছিলেন। ফোন করে আমাকে বলেছিলেন, কিছুক্ষণ আগে একটা মিছিল গেছে। আরেকটি মিছিল আসছে। গণ্ডগোল হচ্ছে। তুমি বাবুকে নিয়ে সাবধানে থেকো। বাইরে যেও না। এর কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম তিনজন পুলিশ মারা গেছে। আমি ঘর থেকে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি ওরা আমার স্বামীকে এমনভাবে হত্যা করেছে যে, আমি লাশ দেখে প্রথমে আমার স্বামীকে চিনতে পারিনি। পরে পোশাকে থাকা নেমকার্ড দেখে চিনেছি...’। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবের শিকারের সেই যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন গাজীপুরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত মনিরের বাবা কাভার্ট ভ্যানচালক রমজান আলী, হেফাজতে ইসলামের ৫ মে’র সমাবেশের দিন অগ্নিদগ্ধ কনস্টেবল পিয়ারুল ইসলাম, ফটিকছড়ির ভুজপুরে জামায়াত-শিবিরের হামলায় মারাত্মক আহত হেলালউদ্দিন পিয়ারু, অগ্নিদগ্ধ আইনজীবী খোদেজা নাসরিন, গাইবান্ধার কুন্তাইল কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম এবং হেফাজতের ৫ মে’র কর্মসূচির দিন বায়তুল মোকাররমে পবিত্র কোরআন শরীফ পোড়ানোর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মিজানুল করিম। তারা বক্তব্যের সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কনস্টেবল পিয়ারুল ইসলাম। ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের আগুনে মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন তিনি। পিয়ারুল ইসলাম সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আগুন লাগানোর পর আমরা জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছি। কিন্তু আমি পড়ে গিয়ে গাড়ির সঙ্গে আটকে যাই। আমি দেখলাম আমার ডানহাত পুড়ে যাচ্ছে। ডান হাত আটকা থেকে খোলার পর দেখলাম বাঁ হাত আটকে আছে। পুড়ে চামড়াগুলো আলাদা হয়ে মনে হয় খসে পড়ছে। আমার পিঠ পুড়ে গেছে। এ সময় তিনি গেঞ্জি উঠিয়ে তার পিঠে পোড়া দাগগুলো দেখান। অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার একটা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়ার সময় সহিংসতার শিকার হন। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা ৬০/৭০ জন এক সঙ্গে যাচ্ছিলাম। পথে গাছ ফেলে রাস্তা অবরুদ্ধ করে রাখা ছিল। অবস্থা বুঝে ২৫/৩০ জন দৌড়ে পালায়। দুর্বৃত্তরা কাছে এসে ভাংচুর ও কোপানো শুরু করে। খুব কাছ থেকে তারা পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। আমার গায়ে আগুন ধরে যায়। তাড়াতাড়ি গা থেকে ব্লেজার খুলে মাটিতে গড়াগড়ি দেই। এরপর একটি বাড়িতে আশ্রয় নিতে গেলে তারা আশ্রয় না দিয়ে বলে আপনাকে আশ্রয় দিলে আমরা ওদের হাত থেকে বাঁচতে পারবো না। তারপর অন্য বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই। সহিংসতার আগুনে তার হাত-মুখ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়।